খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই জুলাই ২০২৬, ২:৭ এএম

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ জাতীয় সংসদের মতো সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তথ্যগত ভুল করলেন কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আমির হামজা। দি পাবলিক এক্সামিনেশন অফেন্স (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬-এর ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকায় “কুষ্টিয়ার মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রশ্নফাঁসের ঘটনার প্রসঙ্গ টানেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কুষ্টিয়া জেলায় কোনো মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ই নেই। তিনি যে ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন, সেটি মূলত কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ের অধীনে ১১৫টি পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বহুল আলোচিত ঘটনা।
সংসদে বক্তব্যের শুরুতে বিলটির উদ্দেশ্য ও কারণের সঙ্গে একমত পোষণ করেন আমির হামজা। তিনি বলেন, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি আইন জনগণের মতামতের জন্য সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো উচিত। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ওপর হঠাৎ করে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। এরপর পাবলিক পরীক্ষায় নকল ও প্রশ্নফাঁস রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, তাঁর নির্বাচনী এলাকা কুষ্টিয়ার “মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের” একটি প্রশ্নফাঁসের ঘটনা আট মাস আগে ঘটলেও এখনও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি সিভিল সার্জন কার্যালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছেন, তদন্তে একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকসহ আরও কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ সময় তিনি শিক্ষামন্ত্রীর কাছে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান। সংসদ সদস্যের বক্তব্যের এই অংশটি পরে “হঠাৎ করে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ দেওয়া ঠিক হবে না: আমির হামজা” শিরোনামে একটি টেলিভিশন চ্যানেলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজেও প্রচারিত হয়।
তবে ভিডিওটি প্রকাশের পর অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, কুষ্টিয়ায় যখন কোনো মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ই নেই, তখন তিনি কোন প্রতিষ্ঠানের কথা বলেছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এমপি যে ঘটনার কথা সংসদে তুলে ধরেছেন, সেটি আসলে ২০২৫ সালের ২৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ের অধীনে ১১৫টি শূন্য পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা। ওই ঘটনায় পরীক্ষা শুরুর আগের রাতেই প্রশ্ন বাইরে চলে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে এবং বিষয়টি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরবর্তীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তদন্ত শুরু করে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র ও সে সময় প্রকাশিত বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসে, প্রশ্নপত্র প্রণয়নের সময় নিয়োগ কমিটির কয়েকজন সদস্য নিয়ম ভেঙে মোবাইল ফোন নিয়ে প্রশ্ন তৈরির কক্ষে প্রবেশ করেছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রশ্ন তৈরির কক্ষের সিসিটিভি ক্যামেরাও আগে থেকেই খুলে রাখা হয়। তদন্তে কুষ্টিয়ার তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক), স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব এবং সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) একজন কর্মকর্তাসহ একাধিক ব্যক্তির নাম আলোচনায় আসে।
এছাড়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) হোসেন ইমাম ও তাঁর ভাই উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (স্যাকমো) হাসান ইমাম নান্নুর বিরুদ্ধেও প্রশ্নফাঁসে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। তদন্তের অংশ হিসেবে দুদক সিসিটিভি-সংক্রান্ত তথ্য, হাতে লেখা প্রশ্নপত্র এবং একাধিক মোবাইল ফোন জব্দ করে। তদন্তে প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথাও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সে সময় জানিয়েছিলেন। কিন্তু ঘটনার প্রায় আট মাস পার হয়ে গেলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এমন তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
একই সঙ্গে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে বিতর্কিত ওই নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল করে নতুন নিয়োগ পরীক্ষার তারিখও এখন পর্যন্ত ঘোষণা করা হয়নি। ফলে চাকরিপ্রত্যাশী শত শত প্রার্থী এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, সংসদ সদস্য আমির হামজা মূল ঘটনাটি তুলে ধরতে চাইলেও প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ভুলভাবে “মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়” হিসেবে উল্লেখ করায় বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফোরামে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই করে বক্তব্য দেওয়া জরুরি বলেও তারা মনে করেন। তবে একই সঙ্গে এমপির বক্তব্যে উঠে আসা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও সামনে এসেছে।
সেটি হলো বহুল আলোচিত প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় তদন্তের অগ্রগতি দৃশ্যমান না হওয়া এবং অভিযোগে নাম আসা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময়েও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ। এ কারণে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, তদন্ত দ্রুত শেষ করে দোষীদের আইনের আওতায় আনা এবং বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে সরকারকে দ্রুত স্পষ্ট সিদ্ধান্ত জানানো উচিত। এ বিষয়ে কথা বলতে আমির হামজার মুঠোফোনে যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য