খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২ই জানুয়ারি ২০১৫, ২:৫১ পিএম

দক্ষিণ এশিয়ার স্থানীয় সরকার পরিচালনার ইতিহাসে জেলা বোর্ড ও পরবর্তীতে জেলা পরিষদের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমল এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর কুষ্টিয়া অঞ্চলে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে জেলা বোর্ড একটি প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। কুষ্টিয়া অঞ্চলের প্রশাসনিক পরিকাঠামো, জনপথ উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বিস্তারে জেলা বোর্ডের পূর্বতন চেয়ারম্যানগণ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকে শুরু করে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত কুষ্টিয়া জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে বিভিন্ন সময়ে প্রথিতযশা প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সিএসপি (CSP) ও ইপিসিএস (EPCS) ক্যাডার এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ দায়িত্ব পালন করেছেন। তৎকালীন সময়ে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠানে আমলাতান্ত্রিক নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের এক মিশ্র ধারা লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে পাকিস্তান আমলে জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগের প্রবণতা বেশি ছিল, যা পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সংসদ সদস্যদের অংশগ্রহণে পরিবর্তিত হয়।
নিচে ১৯৪৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত কুষ্টিয়া জেলা বোর্ড বা জেলা পরিষদের দায়িত্ব পালনকারী চেয়ারম্যানগণের নাম ও কার্যকালের কালানুক্রমিক বিবরণ সারণী আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক নং | চেয়ারম্যানের নাম | কার্যকাল (হते – পর্যন্ত) |
| ১ | জনাব সামসুজ্জোহা | ১৫-৭-১৯৪৭ – ১৩-৭-১৯৬০ |
| ২ | জনাব আবদুল হান্নান | ১৫-৭-১৯৪৭ – ১৩-৭-১৯৬০ |
| ৩ | জনাব নওজেশ আহমেদ | ১৫-৭-১৯৪৭ – ১৩-৭-১৯৬০ |
| ৪ | জনাব সাদ আহমেদ | ১৫-৭-১৯৪৭ – ১৩-৭-১৯৬০ |
| ৫ | এ.জেড.এ. তৈমুরী (সি.এস.পি) | ১৪-৭-১৯৬০ – ৬-৯-১৯৬০ |
| ৬ | এম.এ. নুর মহম্মদ (সি.এস.পি) | ৭-৯-১৯৬০ – ১০-১১-১৯৬১ |
| ৭ | কিউ,জি আহাদ (স্কয়ার) | ১১-১১-১৯৬১ – ৩১-৫-১৯৬৪ |
| ৮ | এস.এস. আহমেদ (স্কয়ার সি.এস.পি) | ১-৬-১৯৬৪ – ১৪-৭-১৯৬৬ |
| ৯ | এম. আজিজুল জলিল (স্কয়ার সি.এস.পি) | ১৫-৭-১৯৬৬ – ১৭-৯-১৯৬৭ |
| ১০ | এ.এফ.এম. ইয়াহিয়া (সি.এস.পি) | ২৯-৯-১৯৬৭ – ১৭-১০-১৯৬৮ |
| ১১ | এস.এ. রহমান (সি.এস.পি) | ১৮-১০-১৯৬৮ – ২৭-১১-১৯৬৯ |
| ১২ | মোঃ সামসুল হক (ইপি.সি.এস) | ৬-১২-১৯৬৯ – (অনির্দিষ্ট/চলমান) |
| ১৩ | কাজী জাহিদুর রহমান | ১৬-৫-১৯৭১ – ১৫-২-১৯৭২ |
| ১৪ | এম.এস. হক | ১৭-১২-১৯৭২ – ১৬-২-১৯৭২ |
| ১৫ | হাফিজ আহমেদ মজুমদার | ১৭-২-১৯৭২ – ২৪-৯-১৯৭২ |
| ১৬ | এম.এ. নুর | ২৫-৯-১৯৭২ – ২৬-৯-১৯৭৪ |
| ১৭ | আবদুল হাই | ২৭-৯-১৯৭৪ – ১৯-১২-১৯৭৪ |
| ১৮ | আবুল হাসনাত মোফাজ্জেল করিম | ২০-১২-১৯৭৪ – ২০-১-১৯৭৫ |
| ১৯ | কে.জি. মনসুর | ২৫-৯-১৯৭৫ – ০২-৩-১৯৭৬ |
| ২০ | তাজুল হক | ০৩-৩-১৯৭৬ – ১১-৩-১৯৭৮ |
| ২১ | আব্দুল মান্নান ভুঁইয়া | ১২-৩-১৯৭৮ – ১৮-৬-১৯৮২ |
| ২২ | এ.কে.এম. ফজলুল হক মিয়া | ১২-৬-১৯৮২ – ১৫-৬-১৯৮৫ |
| ২৩ | এ.এফ.এম. জিয়া উদ্দিন আহমেদ | ২৭-৬-১৯৮৫ – ০২-৯-১৯৮৮ |
| ২৪ | আলহাজ্ব এ. করিম | ২১-৫-১৯৮৮ – ১১-১০-১৯৮৮ |
| ২৫ | মোঃ কোরবান আলী (জাতীয় সংসদ সদস্য) | ১২-১০-১৯৮৮ – ০৭-৮-১৯৮৯ |
| ২৬ | আহসান হাবিব লিংকন (জাতীয় সংসদ সদস্য) | ০৮-৮-১৯৮৯ – ১০-১২-১৯৯০ |
কুষ্টিয়া জেলার সামগ্রিক প্রশাসনিক ও সামাজিক ভিত্তির পেছনে রয়েছে এক সমৃদ্ধ ইতিহাস। প্রশাসনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি এই অঞ্চলের প্রাচীন ঐতিহ্য যেমন টেগর লজ এবং ঐতিহাসিক গোপীনাথ জিউর মন্দির কুষ্টিয়ার কৃষ্টি, সাহিত্য ও সংস্কৃতির আত্মিক পরিচায়ক হিসেবে যুগ যুগ ধরে টিকে রয়েছে। স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশ এবং সামাজিক মেলবন্ধনে এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ও স্থানগুলোর পরোক্ষ ঐতিহাসিক যোগসূত্র রয়েছে।
টেগর লজ: কুষ্টিয়ার সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি ঐতিহাসিক স্থান, যা স্থানীয় সমাজ গঠনে ভূমিকা রেখেছে।
গোপীনাথ জিউর মন্দির: এই অঞ্চলের ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন, যা প্রাচীন কুষ্টিয়ার জনপদ বিন্যাসের সাক্ষ্য দেয়।
জেলা বোর্ড বা বর্তমান জেলা পরিষদ মূলত গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, স্থানীয় রাস্তাঘাট নির্মাণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও দাতব্য চিকিৎসালয় পরিচালনা এবং জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করে থাকে। কুষ্টিয়ার পূর্বতন চেয়ারম্যানবৃন্দের কার্যকাল বিশ্লেಷণে দেখা যায় যে, ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে প্রশাসনিক আমলারা (যেমন সিএসপি কর্মকর্তারা) জেলা বোর্ডের নির্বাহী ক্ষমতা ও চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করতেন, যা পরবর্তীতে ১৯৭০-এর দশকের পর থেকে রাজনৈতিক ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে স্থানান্তরিত হয়। আশির দশকে জাতীয় সংসদ সদস্যদের জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার ও কেন্দ্রীয় রাজনীতির মধ্যকার মেলবন্ধন আরও সুদৃঢ় হয়েছিল।
কুষ্টিয়া অঞ্চলে স্থানীয় সরকার ও গ্রামীণ উন্নয়নের স্বার্থে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল থেকেই জেলা বোর্ড সক্রিয় ছিল, যার ধারাবাহিকতা ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর আরও সুসংহত হয়।
পাকিস্তান আমলের প্রশাসনিক কাঠামোগত নিয়মানুযায়ী অনেক সময় সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান (CSP) বা ইপিসিএস (EPCS) পদমর্যাদার দক্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের জেলা বোর্ডের প্রশাসনিক ও নির্বাহী প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হতো।
১৯৮০-এর দশকের শেষভাগে, বিশেষ করে ১৯৮৮ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে মোঃ কোরবান আলী এবং আহসান হাবিব লিংকনের মতো সম্মানিত জাতীয় সংসদ সদস্যগণ কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তালিকা অনুযায়ী, ১৯৪৭ সালের জুলাই মাস থেকে ১৯৬০ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় তের বছর যৌথ ও এককভাবে জনাব সামসুজ্জোহা, আবদুল হান্নান, নওজেশ আহমেদ এবং সাদ আহমেদ এই বোর্ডের নীতিনির্ধারণী দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
মন্তব্য