বিশেষ প্রতিনিধি ॥ মাঠের পর মাঠ সবুজ বোরো ধান। অথচ পানির অভাবে সেই সবুজ পাতাগুলো ধীরে ধীরে হলদেটে হয়ে আসছে। সেচের পানির জন্য হাহাকার করছেন কৃষকরা। কিন্তু পাম্পে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ডিজেল। জ্বালানি তেলের এই তীব্র সংকটে কুষ্টিয়ার বিস্তীর্ণ বোরো ধানের মাঠে এখন শুধুই হতাশার চিত্র।
দৌলতপুর উপজেলার আংদিয়া গ্রামের কৃষক আশরফ আলীর চোখেমুখে এখন কেবলই দুশ্চিন্তার ভাঁজ। চলতি মৌসুমে আড়াই বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছেন তিনি। নিয়ম অনুযায়ী একদিন পরপর তার চার লিটার ডিজেল প্রয়োজন। অথচ সপ্তাহজুড়ে তিনি পাচ্ছেন মাত্র দুই লিটার! তেলের জন্য পাম্পে গেলে লাইনে দাঁড়িয়েই কেটে যাচ্ছে তার পুরো দিন।
আক্ষেপের সুরে আশরফ আলী বলেন, আড়াই বিঘা ধানের জমিতে একদিন পরপর পানি দেওয়া লাগে। কাতলামারী, আমলা, মিরপুর সব পাম্প ঘুরেও তেল পাইনি। বাধ্য হয়ে কুষ্টিয়া থেকে ৩ লিটার তেল এনে কোনোমতে ধানের জান বাঁচিয়েছি। চার লিটারের জায়গায় দুই লিটার দিয়ে আর কতদিন চলবে? এভাবে চলতে থাকলে ধান মরে মাঠ সাদা হয়ে যাবে। এই হাহাকার শুধু আশরফ আলীর একার নয়। মিরপুর উপজেলার কচুবাড়িয়া গ্রামের রুকমান হোসেনের গল্পটাও একই রকম। পাঁচ বিঘা জমিতে বোরো চাষ করা এই কৃষকের প্রতিদিন পাঁচ লিটার তেল প্রয়োজন। কিন্তু পাম্পে গেলে জুটছে মাত্র ২০০ টাকার তেল।
রুকমান হোসেন বলেন, টিভিতে দেখছি দেশে তেল আছে, কিন্তু আমরা কৃষকরা তো পাম্পে গিয়ে তেল পাচ্ছি না। পানি দিতে না পারলে ধান মরে যাবে, আর ধান মরলে আমরা কৃষকরাও একদম মরে যাব।
একই গ্রামের জাহিদুল ইসলামের প্রয়োজন ১০ লিটার, কিন্তু পাচ্ছেন জনপ্রতি বরাদ্দকৃত মাত্র ২ লিটার। তার ওপর তেলের লাইনে দাঁড়িয়েই পেরিয়ে যাচ্ছে পুরো দিন, ফলে কৃষিকাজের অন্যান্য দিকও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কৃষকদের এই হাহাকারের বিপরীতে পাম্প কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা নিজেরাই পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছেন না। সরবরাহ কম থাকায় বাধ্য হয়েই কৃষকদের চাহিদার তুলনায় অনেক কম তেল দিতে হচ্ছে তাদের। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, কুষ্টিয়ায় সেচ ব্যবস্থার একটি বড় অংশ এখনো পুরোপুরি ডিজেল চালিত পাম্পের ওপর নির্ভরশীল।
জেলায় বর্তমানে ২৫ হাজার ৭৫৫টি অগভীর, ২২৬টি গভীর এবং ২৯৭টি এলএলপি পাম্প রয়েছে। এসব পাম্পের মধ্যে ২২ হাজার ৭৭টি পাম্পই চলে ডিজেলে, আর বাকি ৪ হাজার ২০১টি বিদ্যুৎ চালিত। এই বিশাল সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে জেলার মোট ৮৮ হাজার ৭৪৮ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হয়, যা ডিজেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের ওপর দারুণভাবে নির্ভরশীল।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে কৃষকদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে স্থানীয় প্রশাসন। কুষ্টিয়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শওকত হোসেন ভুঁইয়া জানান, কৃষকদের সেচ সুবিধা নিশ্চিতে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। কৃষকরা যাতে সেচের জন্য পর্যাপ্ত ডিজেল পান, সেজন্য আমরা তৎপর রয়েছি এবং জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তাছাড়া কুষ্টিয়ার বেশিরভাগ এলাকা জিকে (গঙ্গা-কপোতাক্ষ) সেচ প্রকল্পের আওতায় থাকায় শ্যালো বা বৈদ্যুতিক পাম্পের ওপর নির্ভরতা তুলনামূলক কম।
প্রশাসনের আশ্বাস আর সরকারি পরিসংখ্যানের মাঝেও মাঠের বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। ডিজেল সংগ্রহের এই প্রতিদিনের সংগ্রাম আর ধানের শুকিয়ে যাওয়া পাতা কুষ্টিয়ার বোরো চাষিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর করছে। দ্রুত তেলের এই সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে কৃষকের স্বপ্ন যে মাঠেই শুকিয়ে যাবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।









