কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ফ্যামিলি কার্ডের শুমারিতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের অভিযোগ তুলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতারের অপসারণ দাবিতে বিক্ষোভ ও কার্যালয় ঘেরাও করেছে ছাত্রদল ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্রজনতা। কর্মসূচি চলাকালে ইউএনও কার্যালয়ে প্রবেশের চেষ্টা করলে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। এতে উপজেলা পরিষদ চত্বরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
গতকাল রোববার (৯ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিট পর্যন্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রধান ফটকে অবস্থান নিয়ে ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেন আন্দোলনকারীরা। পরে দুপুর ১টার দিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইউএনওকে অপসারণের আলটিমেটাম দিয়ে তারা উপজেলা পরিষদ চত্বর ত্যাগ করেন।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ফ্যামিলি কার্ডের জন্য উপকারভোগী বাছাইয়ের শুমারি ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে আওয়ামী লীগ এবং তাদের সহযোগীদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তাদের দাবি, জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিতর্কিত ও দলীয়ভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের তালিকা তৈরির কথা থাকলেও কুমারখালীতে সে প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ছাত্রদল ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্রজনতার নেতাকর্মীরা উপজেলা পরিষদ চত্বরে জড়ো হন। পরে তারা ইউএনও কার্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা ইউএনও ফারজানা আখতারের অপসারণের দাবি জানান। তাদের অভিযোগ, প্রশাসনের দায়িত্বশীল পদে থেকে ইউএনও ফ্যামিলি কার্ডের শুমারি ও উপকারভোগী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। আন্দোলনকারীরা ইউএনও কার্যালয়ের গেট খুলে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়।
এ সময় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তি হয়। কিছু সময়ের জন্য উপজেলা পরিষদ চত্বরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সেখানে অবস্থান নেয়। ঘেরাও চলাকালে ইউএনও কার্যালয়ের ভেতরে অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দ্বিতীয় তলায় দাঁড়িয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলেন বলে জানা গেছে। এ সময় নিয়োগপ্রাপ্তদের পুনরায় যাচাই-বাছাই করার আশ্বাস দেওয়া হয়। তবে আন্দোলনকারীরা শুধু পুনরায় যাচাই-বাছাই নয়, ইউএনও ফারজানা আখতারকে অপসারণের দাবিতে অনড় থাকেন। পরে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইউএনওকে অপসারণের আলটিমেটাম দিয়ে তারা উপজেলা পরিষদ চত্বর ত্যাগ করেন।
উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সোহানুর রহমান ও সদস্য সচিব আবু কাউসার অপুর নেতৃত্বে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় কুষ্টিয়া সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি ফরিদা ইয়াসমিনের স্থানীয় প্রতিনিধি সাজেদা পারভিন, পান্টি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কুদরতে নুর, কুমারখালী সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি হৃদয় হোসেন, উপজেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্রজনতা আন্দোলন কমিটির সাবেক মুখপাত্র আশরাফুল ইসলাম তিহা, কুমারখালী পৌর ছাত্রদল নেতা কামরুজ্জামান সোয়াদসহ উপজেলা ও বিভিন্ন ইউনিয়নের ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
আন্দোলনকারীদের ভাষ্য, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রকৃত দরিদ্র ও অসচ্ছল মানুষের কাছে সরকারি সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার কথা। কিন্তু উপকারভোগী বাছাইয়ের প্রাথমিক শুমারিতেই রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে দাবি তাদের। তাদের আরও অভিযোগ, স্থানীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা ইউএনওর অপসারণের দাবিতে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন।
আন্দোলনকারীরা বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কোনো রাজনৈতিক দলের পুনর্বাসনের মাধ্যম হতে পারে না। প্রকৃত সুবিধাভোগীদের যাচাই করে তালিকাভুক্ত করতে হবে এবং রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় কোনো পক্ষকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
ঘেরাও কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ধস্তাধস্তির অভিযোগ অস্বীকার করে কুমারখালী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জামাল উদ্দিন বলেন, “বিক্ষোভকারীদের কয়েকজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের ভেতরে ঢুকে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন। আমরা তাদের কথা বলার সুযোগ দিয়েছি। পরবর্তীতে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়েছে। এদিকে ঘটনাকে কেন্দ্র করে উপজেলা পরিষদ এলাকায় কিছু সময় উত্তেজনা থাকলেও পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার বলেন, কিছু রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী বিক্ষোভ করেছিলেন। পরে তারা আমার সঙ্গে কথা বলে বিক্ষোভ কর্মসূচি ভঙ্গ করে চলে যান। তাঁকে অপসারণের দাবিতে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও বলেন, এ ধরনের দাবি সম্পর্কে আমি অবগত নই। তবে বিক্ষোভ চলাকালে তারা এ ধরনের বক্তব্য দিয়েছিল।
পরবর্তীতে আমি তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা আওয়ামী লীগপন্থী সুবিধাভোগীদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। আমি তাদের কাছে আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে যাদের নাম তালিকাভুক্ত রয়েছে, সেই তালিকা চেয়েছি। তারা তালিকাটি দিলে আমি তা যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। এ ঘটনায় আন্দোলনকারীদের দেওয়া ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম এবং পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে কুমারখালীতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।









