কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

মিজানুর রহমান নয়ন, কুমারখালী ॥ করোনা, গোখাদ্যের দাম বৃদ্ধি ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে প্রায় পাঁচ-ছয় বছর কোরবানির গরু পালন বন্ধ করে শুধু গাভী পালন করছিলেন কুষ্টিয়ার কুমারখালীর গৃহিণী রোকসানা আক্তার (৩০)। তবে পরিস্থিতি অনুকুলে থাকায় আবার তিনি শুরু করেছেন কোরবানির জন্য পশুপালন। আসন্ন ঈদের জন্য তিনি ৮-৯ মণ ওজনের একটি ষাঁড় প্রস্তুত করেছেন। তিনি লাভের আশায় শেষ মূহুর্তে লালন -পালনে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।

রোকসানা উপজেলার সদকী ইউনিয়নের দরবেশপুর গ্রামের আমিরুল ইসলামের স্ত্রী। সংসাওে স্বামী ছাড়াও দুই স্কুল পড়ুয়া ২ মেয়ে আছে। তিনি বলেন, স্বামী দিনমজুর। সংসারের বাড়তি আয়ের জন্য বাড়িতে একটি ছোট খামার আছে। এতোদিন সেখানে গাভী পালন করে আসছিলাম। তবে গাভীর পাশাপাশি বছরখানেক আগে প্রায় ৯০ হাজার টাকা দিয়ে ফ্রিজিয়ান মিশ্র জাতের একটি ষাঁড় কিনেছিলাম। লালন – পালনে প্রায় ৫০ – ৬০ হাজার টাকা খরচ লেগেছে।

দুই লাখ ৪০ হাজার টাকায় বিক্রির প্রত্যাশা তাঁর। এবার কাঙ্খিত লাভ হলে সামনের ঈদে খামারে গরু বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন তিনি। একই গ্রামের খামারি আত্তাব ফকির (৭০) প্রায় ২০ বছর ধরে পশু পালন করে আসছেন। তিনি রমজানের ঈদে ১০ টি ষাঁড় প্রায় ২০ লাখ টাকায় বিক্রি করে পাঁচ লাখের মতো লাভ করেছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে খামারে ১১টি গরু আছে। ঈদে ৮ টি বিক্রি করবেন। প্রতিটি গরুর ওজন প্রায় ছয় থেকে আট মণের ওপরে।

এক একটি গরু দুই থেকে আড়াই লাখ টাকায় বিক্রির প্রত্যাশা করছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, বছর গেলেই গোখাদ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। সেজন্য লালন – পালনে খরচ বাড়ায় লাভ কম হচ্ছে। কুমারখালীতে কোরবানির ঈদ সামনে রেখে ৩ হাজার ৫৯৭টি খামারে প্রস্তুত করা হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার ৫৫৯ পশু। উপজেলায় পশুর চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩ হাজার বেশি। একই সংখ্যক খামারে ৮ হাজার ১৫৯টি পশু বেশি পালন করেছেন খামারিরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাংসের দাম , চাহিদা ও লাভ বৃদ্ধি পাওয়ায় পশু পালনে আগ্রহ বাড়ছে খামারিদের। সংসারে বাড়তি আয়ের জন্য খামারি ছাড়াও কৃষক, ব্যবসায়ী, চাকুরীজীবীসহ নানান শ্রেণি পেশার মানুষ করছেন পশু পালন। প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে জানা যায়, পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়নের খামারে ষাঁড় ১৭ হাজার ৭০৪, বলদ ৩৮ , ছাগল ১২ হাজার ৭৮৪, ভেড়া ৩১৩ ও মহিষ ১৭টি পালন হয়েছে। এবার পশুর চাহিদা ১৮ হাজার হলেও গত বছর ছিল ১৫ হাজার।

সোমবার সকাল থেকে উপজেলার সদকী, জগন্নাথপুর, যদুবয়রা, শিলাইদহ, চাপড়া ও পান্টি ইউনিয়ন ঘুরে জানা গেছে, অনেক খামারি ঈদুল আজহা সামনে রেখে পশু লালন-পালনে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করেছেন। ঈদে এসব বিক্রি করে মোটা অংকের টাকা লাভের প্রত্যাশা করছেন তাঁরা। যদুবয়রা ইউনিয়নের জোতমোড়া গ্রামের খামারি হান্নান মোল্লা বলেন, আগের বছর ৯টি ষাঁড় বিক্রি করে খরচ বাদে প্রায় তিন লাখ টাকা লাভ হয়েছিল।

এবছর আটটি ষাঁড় আছে। বছরখানেক আগে প্রতিটি গরু আকার ভেদে ৭০ থেকে এক লাখ ১০ হাজার টাকায় কেনা ছিল। নিজের জমিতে নেপিয়ার ঘাঁস ও ধানের বিছালী আছে। সেজন্য প্রতিটি গরুতে পরিচর্চা খরচ পড়েছে ১৮ – ২০ হাজার টাকা। পাঁচ থেকে ছয় মণ ওজনের গরু গুলো আকার ভেদে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা দামে বিক্রির প্রত্যাশা করছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, গোখাদ্যের দাম গতবছরের মতোই আছে। জগন্নাথপুর ইউনিয়নের জোতপাড়ার মৃত আকবর আলী মোল্লার ছেলে বাতেন মোল্লা (৬০) প্রায় ২১ বছর ধরে পশু পালন করছেন।

তাঁর খামারে বর্তমানে ২৭ টি পশু রয়েছে। আসন্ন ঈদের জন্য তিনি ১৭টি ষাঁড় প্রস্তুত করেছেন। খামারের ব্যবস্থাপক বাতেন মোল্লার ভাগ্নে মো. আকাশ বলেন, সাত – আট মাস আগে তিন লাখ ২০ হাজার থেকে চার লাখ টাকা দরে গরু গুলো কেনা হয়েছিল। গরু প্রতি পরিচর্যা খরচ পড়েছে প্রায় ৯০ হাজার টাকা। ১৫ থেকে ২৫ মণ ওজনের গরু গুলো ৬ থেকে ৮ লাখ টাকা দরে বিক্রির আশা করছেন তিনি। পশু মোটাতাজা করার জন্য ছাল, ছোলা, খেসারি, খুদ, গুঁড়া, খৈল, অ্যাংকর ডাল, খড় খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়।

স্টেশন বাজারসংলগ্ন ছালপট্টি বাজার সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম জিলাল বলেন, দুইমাস আগে ৩৯ কেজির বস্তা খুদ ১ হাজার ৫৫০ টাকা, ৫৫ কেজির বস্তা ছাল ২ হাজার ৪৫০ থেকে ৭০০ টাকা, খেসারী প্রতিমণ ২ হাজার ৪০০ – ৬০০ টাকা, গম প্রতিমণ এক হাজার ৫৫০ – ৮০০ বিক্রি হয়েছে। যা বর্তমানে আরও কম দামে বিক্রি হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, গত বছরের তুলনায় এবার বস্তা প্রতি ১৫০-২৫০ টাকা দাম কম। প্রাকৃতিক উপায়ে এবং স্বাস্থ্যসম্মতভাবে এলাকায় পশু মোটাতাজা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন।

তিনি বলেন, মাংসের দাম ও চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় পশু পালন বেড়েছে। রমজানের ঈদেও অনেক পশু বিক্রি হয়েছে। এবারও ভালো দাম পাবেন খামারিরা। ইউএনও ফারজানা আখতার বলেন, পশু বিক্রির জন্য চারটি সাপ্তাহিক হাট রয়েছে। অনলাইনেও চলে বেচাকেনা। গোখাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত বাজার মনিটারিং করা হয়েছে। ঈদের বাজারও তদারকির ব্যবস্থা করা হবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।