কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স
প্রকাশ: ১১ই আগস্ট ২০২৬, ১:৩৫ এএম

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ায় বৈধ কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকার পরও এক মোটরসাইকেল চালককে হয়রানি ও মামলা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে ট্রাফিক পুলিশের সামনে স্যালো ইঞ্জিনচালিত একটি অবৈধ যান আটক করার পর সেটি ছেড়ে দেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। একই সময়ে বৈধ মোটরসাইকেল চালকের বিরুদ্ধে মামলা ও অবৈধ যান ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় ট্রাফিক পুলিশের আইন প্রয়োগের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহলের অনেকে।
সম্প্রতি কুষ্টিয়ার দাদাপুর সড়কে ধারণ করা একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, দুই ট্রাফিক পুলিশ সদস্য মোটরসাইকেলে করে এসে স্যালো ইঞ্জিনচালিত একটি যান আটক করছেন। কিছু সময় পর ওই যানটি ছেড়ে দেওয়া হয় এবং পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। অভিযোগ রয়েছে, যানটি আটকের পর এর চালক একজন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যের হাতে একটি মুঠোফোন দেন। এর কিছুক্ষণ পর যানটি ছেড়ে দেওয়া হয়।
তবে মুঠোফোন দেওয়ার সঙ্গে যান ছেড়ে দেওয়ার কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। প্রশ্ন ওঠে, অবৈধ যানটি যদি আইন লঙ্ঘনের কারণে আটক করা হয়ে থাকে, তাহলে পরে সেটি কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় ছেড়ে দেওয়া হলো। এর পরের দিনই কাগজপত্র দেখাতে বিলম্বের অভিযোগে একটি মোটরসাইকেল আটক করার ঘটনা সামনে আসে। ওই মোটরসাইকেল চালকের অভিযোগ, ট্রাফিক সার্জেন্ট সুব্রত পাল প্রথমে তার হাতে একটি আটক স্লিপ দেন। সেখানে ‘অনটেস্ট’ এবং ‘ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই’ লেখা ছিল।
চালকের দাবি, তার মোটরসাইকেলের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রয়েছে এবং তার বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্সও আছে। কিন্তু আটকের সময় এসব কাগজপত্র সঙ্গে না থাকায় তাকে বলা হয়, বাড়ি থেকে কাগজপত্র এনে ট্রাফিক অফিসে দেখালে মোটরসাইকেলটি ছাড়িয়ে নিতে পারবেন। পরে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে ট্রাফিক কার্যালয়ে গেলে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয় বলে অভিযোগ করেন ওই চালক।
তার ভাষ্য, সেখানে ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) তাকে ১২ হাজার টাকার বেশি জরিমানা করার কথা জানান। পরে বিভিন্নভাবে সুপারিশ করার পর তাকে একটি মামলা নিতেই হবে বলে জানানো হয়। এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হলে তাকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের কাছে পাঠানো হয় বলে জানান তিনি।
অভিযোগকারীর দাবি, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ট্রাফিক সার্জেন্ট সুব্রত পালকে ডেকে ঘটনার বিষয়ে জানতে চান। পরে ২ হাজার ৬০০ টাকার মামলার অর্ধেক নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু এরপরও সমস্যার সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ ওই মোটরসাইকেল চালকের। তার দাবি, ট্রাফিক কার্যালয়ে গিয়ে নির্ধারিত অর্ধেক টাকা দিতে চাইলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। তাকে বিভিন্নভাবে ঘোরানো হয়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ট্রাফিক কার্যালয়ে অবস্থান করার পর শেষ পর্যন্ত ২ হাজার ৬০০ টাকা পরিশোধ করে মোটরসাইকেলটি নিয়ে যেতে সক্ষম হন তিনি। এ ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে আটক স্লিপে লেখা তথ্য নিয়ে।
চালকের হাতে থাকা স্লিপে ‘ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই’ উল্লেখ করা হলেও তিনি যে লাইসেন্স দেখিয়েছেন, সেটির তথ্য অনুযায়ী লাইসেন্সটি ৮ মার্চ ২০২৬ তারিখে ইস্যু করা হয়েছে। এর মেয়াদ রয়েছে ৭ মার্চ ২০৩৬ সাল পর্যন্ত। তাহলে বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকার পরও কেন আটক স্লিপে ‘ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই’ লেখা হলো-এ প্রশ্নের উত্তর চান সংশ্লিষ্টরা। শুধু তাই নয়, জরিমানার অর্থ নিয়েও তৈরি হয়েছে প্রশ্ন।
প্রথমে ১২ হাজার টাকার বেশি জরিমানার কথা বলা, পরে ২ হাজার ৬০০ টাকার মামলা এবং শেষ পর্যন্ত ২ হাজার ৬০০ টাকা পরিশোধ করার ঘটনায় প্রকৃত জরিমানার পরিমাণ কত এবং কোন বিধি অনুযায়ী টাকা নেওয়া হয়েছে, তা নিয়েও স্বচ্ছতা দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীর ভাষ্য, তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বিরোধে যেতে চান না। তার প্রশ্ন হলো-যদি তার কাগজপত্রে কোনো ত্রুটি থাকে, তাহলে আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট ধারায় মামলা বা জরিমানা করা হোক।
কিন্তু বৈধ লাইসেন্স থাকার পরও ‘লাইসেন্স নেই’ উল্লেখ করা এবং পরে একাধিকবার তাকে ট্রাফিক কার্যালয়ে ঘোরানো কেন হলো, সেটিই তার অভিযোগ। অন্যদিকে দাদাপুর সড়কে স্যালো ইঞ্জিনচালিত যান আটকের পর ছেড়ে দেওয়ার ভিডিওটি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কুষ্টিয়ার বিভিন্ন সড়কে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ যান চলাচল করছে। এসব যান দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ানোর পাশাপাশি সড়কে যান চলাচলেও সমস্যা তৈরি করছে।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কুষ্টিয়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক শাহারিয়া ইমন রুবেল বলেন, কুষ্টিয়ায় প্রতিনিয়ত অবৈধ যান চলাচলের কারণে দুর্ঘটনায় মানুষের জানমালের ক্ষতি হচ্ছে। মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা উপেক্ষা করে কীভাবে থ্রি-হুইলার যান মহাসড়কে দাপিয়ে বেড়ায়, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার। তিনি বলেন, পাশাপাশি বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও একজন মোটরসাইকেল চালককে হয়রানির অভিযোগ অত্যন্ত দুঃখজনক।
একই আইনের আওতায় বৈধ ও অবৈধ যানবাহনের ক্ষেত্রে যদি ভিন্ন আচরণ করা হয়, তাহলে মানুষের মধ্যে পুলিশের আইন প্রয়োগের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। তার মতে, দুটি ঘটনারই নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এতে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসার পাশাপাশি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থাও বাড়বে।
অভিযোগের বিষয়ে ট্রাফিক সার্জেন্ট সুব্রত পাল বলেন, আমি তাকে মামলা দিইনি। গাড়িটি আটক করে পিং স্লিপ দিয়েছি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে ট্রাফিক অফিসে যোগাযোগ করে গাড়িটি ছাড়িয়ে নিতে বলেছি। তিনি বলেন, গাড়িটির কোনো কাগজপত্র ছিল না। এ ছাড়া চালকের কাছে ড্রাইভিং লাইসেন্স ও হেলমেটও ছিল না। আমি আইন মেনেই দায়িত্ব পালন করেছি।
ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে টিআই অ্যাডমিন গাজী হাসানুজ্জামান বলেন, আমার ট্রাফিক সদস্য আইন মেনেই গাড়িটি আটক করেছেন। গাড়ি চালানোর সময় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র অবশ্যই চালকের সঙ্গে থাকতে হবে এবং চালককে হেলমেট পরিহিত থাকতে হবে। তিনি আরও বলেন, বাড়ি থেকে কাগজপত্র এনে দেখানোর সুযোগ নেই। তবে আটক করা গাড়ির কাগজপত্র ট্রাফিক অফিসে এনে দেখিয়ে নিয়ম অনুযায়ী গাড়ি ছাড়িয়ে নেওয়া যাবে। দাদাপুর সড়কে স্যালো ইঞ্জিনচালিত নসিমন আটকের পর ছেড়ে দেওয়ার ভিডিও প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গাজী হাসানুজ্জামান বলেন, কোন সদস্য বা কারা এ কাজ করেছে, আমি জানি না। তবে আমি এমন কিছু পেলে সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক সদস্যের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেব।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য