খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ই জুলাই ২০২৬, ২:৯ এএম

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ নেই সরকারি অনুমোদন, অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও কর-সংক্রান্ত নিবন্ধন ছাড়াই ‘স্কাই বাইট’ নামে একটি রুফটপ রেস্টুরেন্ট পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। শহরের পাঁচ রাস্তার মোড়ে পালকি রেস্টুরেন্টের ভবনের ছাদে গড়ে ওঠা এ রেস্টুরেন্টের বিরুদ্ধে বৈধ ট্রেড লাইসেন্স, ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র, ভ্যাট (মূসক) নিবন্ধন, খাদ্য নিরাপত্তা নিবন্ধনসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। অভিযোগ রয়েছে, এর ফলে একদিকে জননিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে, অন্যদিকে ভ্যাট নিবন্ধন ছাড়া বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার কারণে সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, তিন তলা ভবনের ছাদে গড়ে ওঠা রেস্টুরেন্টটিতে প্রতিদিনই ক্রেতার সমাগম হচ্ছে। ছাদের একপাশে রান্নাঘর বা কিচেন স্থাপন করা হলেও সেখানে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, ফায়ার অ্যালার্ম কিংবা অন্যান্য জরুরি নিরাপত্তা সরঞ্জাম চোখে পড়েনি। পুরো ভবনে জরুরি পরিস্থিতিতে বের হওয়ার জন্য কার্যত একটি মাত্র সিঁড়ি বা এক্সিট ব্যবহার করা হচ্ছে। নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের মতে, অগ্নিকাণ্ড বা অন্য কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে এই একমাত্র নির্গমন পথ বড় ধরনের প্রাণহানির ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, রেস্টুরেন্টটি চালুর পর থেকেই প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো তদারকি নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আলী আহসান মুজাহিদ ও কয়েক জন মিলে রেস্টুরেন্টটি গড়ে তুলেছেন। একসময় তিনি স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। সেই প্রভাব ব্যবহার করেই প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
আরেক বাসিন্দার ভাষ্য, ক্ষমতা ও অর্থের প্রভাবেই এখানে নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করা হচ্ছে। কোনো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে এত মানুষের নিরাপদে বের হওয়ার সুযোগ থাকবে না। কিন্তু ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে সাহস পান না।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া ফায়ার সার্ভিসের ওয়্যারহাউস ইন্সপেক্টর কাজী আরিফুল ইসলাম বলেন, বিধি অনুযায়ী এই রেস্টুরেন্টের কোনো ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন নেই। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কুষ্টিয়া পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান বলেন, পৌরসভার আওতাধীন প্রত্যেকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, হোটেল ও রেস্টুরেন্টকে বৈধ ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা পরিচালনা করলে তাকে অবৈধ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং পৌর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রেস্টুরেন্টটির ম্যানেজার মো. রোকন বলেন, আগামী ২৫ তারিখে রেস্টুরেন্ট চালুর দুই মাস পূর্ণ হবে। লাইসেন্সের বিষয়ে মালিকরাই ভালো বলতে পারবেন। তিনি জানান, রেস্টুরেন্টটির মালিক সুলতান মারুফ তালহা, আলী আহসান মুজাহিদ ও রুদ্র। লাইসেন্স ও অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয় তারাই দেখভাল করেন।
রেস্টুরেন্টের অন্যতম উদ্যোক্তা সুলতান মারুফ তালহা বলেন, আমরা এখনো এটি পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে পরিচালনা করছি। আমি, শাহীন, রাসেল ও রুদ্র মিলে এটি শুরু করেছি। আমি বর্তমানে চীনে অবস্থান করছি। দেশে ফিরে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করব।
তবে রেস্টুরেন্ট চালু থাকা অবস্থায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়া ব্যবসা পরিচালনা কেন করা হচ্ছে—এ প্রশ্নের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারেননি।
সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী, বাংলাদেশে কোনো রেস্টুরেন্ট বা রুফটপ রেস্টুরেন্ট জনসাধারণের জন্য চালু করার আগে একাধিক সরকারি সংস্থার অনুমোদন গ্রহণ বাধ্যতামূলক। ব্যবসা শুরু করার পর অনুমোদন নেওয়ার সুযোগ নেই। অর্থাৎ, সব ধরনের নিবন্ধন, লাইসেন্স ও নিরাপত্তা সনদ সম্পন্ন করার পরই একটি রেস্টুরেন্ট পরিচালনা করা যায়।
একটি রেস্টুরেন্ট পরিচালনার জন্য সাধারণত সংশ্লিষ্ট পৌরসভা থেকে বৈধ ট্রেড লাইসেন্স, বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ফায়ার সেফটি লাইসেন্স, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে ভ্যাট (মূসক) নিবন্ধন (BIN), বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন, বাংলাদেশ হোটেল ও রেস্তোরাঁ আইন-২০১৪ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অনুমোদন, কর্মচারীদের স্বাস্থ্য সনদ, প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি পর্যাপ্ত জরুরি নির্গমন পথ, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, ফায়ার অ্যালার্ম ও নিরাপদ বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা থাকতে হয়।
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, ভ্যাট নিবন্ধন ছাড়া কোনো রেস্টুরেন্ট নিয়মিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করলে সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। একই সঙ্গে এটি প্রচলিত কর আইন লঙ্ঘনের শামিল। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে।
অন্যদিকে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, রুফটপ রেস্টুরেন্টে অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা ঘটলে পর্যাপ্ত নির্গমন পথ, কার্যকর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষিত কর্মী না থাকলে হতাহতের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। তাই অনুমোদনহীন ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে পরিচালিত এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল কুষ্টিয়া শহরের সব রুফটপ রেস্টুরেন্টে ট্রেড লাইসেন্স, ফায়ার লাইসেন্স, ভ্যাট (মূসক) নিবন্ধন, খাদ্য নিরাপত্তা নিবন্ধন, ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা এবং অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা যাচাইয়ে জেলা প্রশাসন, পৌরসভা, ফায়ার সার্ভিস, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এ ধরনের অভিযান পরিচালিত হলে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব ফাঁকিও রোধ করা সম্ভব হবে।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য