খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ই জুন ২০২৬, ৩:৩১ এএম

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ ভারতের ফারাক্কা বাঁধের নেতিবাচক প্রভাব থেকে বাংলাদেশের কৃষি বাঁচাতে আশির দশকের শুরুতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় পদ্মা নদীর ওপর ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। সেসময় (১৯৮০ সালের ২৭ ডিসেম্বর) তার একজন মন্ত্রী গঙ্গা ব্যারাজ নামের ওই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করেন। প্রাথমিক কাজও শুরু হয়। কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ায় প্রকল্পের কাজ আর অগ্রসর হয়নি। এছাড়া ব্যারাজ নির্মাণে ভারতের বিরোধিতা ছিল। এ কারণে আর কোনো সরকার এটি বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেয়নি। বর্তমানে সেই গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পের পুরো জায়গা দখল হয়ে গেছে।
প্রকল্প এলাকায় নির্মিত রেস্টহাউজ আর ভিত্তিপ্রস্তরটি এখনো জরাজীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। প্রকল্পের বিভিন্ন সামগ্রী গোপন নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। যদিও এসব তথ্য নেই কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন, ভেড়ামারা উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড কার্যালয়ে। জানা যায়, ১৯৭৫ সালে ভারত ফারাক্কা বাঁধ চালু করলে বাংলাদেশের পদ্মা ও এর শাখা নদীগুলোয় শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমতে শুরু করে। এর বড় প্রভাব পড়ে কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, সাতক্ষীরা ও বরিশাল অঞ্চলে। একসময়ের খরস্রোতা নদীগুলো শুকিয়ে যেতে থাকে। কৃষিতে দেখা দেয় পানির সংকট।
দক্ষিণাঞ্চলে বাড়তে থাকে লবণাক্ততা। সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য নিয়েও তৈরি হয় উদ্বেগ। এ কারণেই ভেড়ামারায় গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ নেন জিয়াউর রহমান। ১৯৮০ সালের ২৭ ডিসেম্বর তৎকালীন বিদ্যুৎ, পানিসম্পদ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী কাজী আনোয়ার-উল হক কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার বাহিরচরে পদ্মার তীরে গঙ্গা ব্যারাজের প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রকল্পের জন্য ক্রয় করা হয় ১২ বিঘা জমি। সেখানে নির্মাণ করা হয় রেস্টহাউজ। প্রাথমিক কাজ শুরু করতে আনা হয় বিভিন্ন সামগ্রী। পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি সূত্র জানায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ১৩১ কোটি টাকা। সেসময় প্রকল্পের পেছনে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ও করা হয়। গঙ্গা ব্যারাজের দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬ হাজার ৯৯০ ফুট। ভারতের ফারাক্কার বিকল্প বাঁধ বা অ্যান্টি ফারাক্কা হিসাবে গঙ্গা ব্যারাজে গেটের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয় ১০০টি।
৬০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩৫ ফুট প্রস্থবিশিষ্ট এসব গেটে পানির নির্গমন ক্ষমতা ধরা হয়েছিল ২৫ লাখ কিউসেক। একই সঙ্গে বিশাল জলধারা সৃষ্টি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। কয়েকদিন আগে ওই প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রকল্প বাস্তবায়নে নদীর তীরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের যে জমি নেওয়া হয়েছিল, তা প্রচীর দিয়ে ঘেরা। মাঝামাঝি স্থানে ১৯৮০ সালে স্থাপন করা গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তরটি জ্বলজ্বল করছে। ভিত্তিপ্রস্তরের পাশেই সেসময় ‘গঙ্গা ব্যারাজ’ নামে নির্মাণ করা রেস্টহাউজটি জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। আর পুরো জায়গা বেদখল হয়ে গেছে। সেখানে প্রায় ৬০টি পরিবার বাড়ি করে বসবাস করছে। ব্যারাজ এলাকায় বসবাস করা হিরা ও রেহেনা নামের দুই নারী বলেন, ‘এ জায়গায় জিয়াউর রহমান এসেছিলেন। তিনি এখানে ব্যারাজ তৈরি করতে চেয়েছিল। কিন্তু পরে আর ব্যারাজ তৈরি করা হয়নি। তাই এ জায়গার নাম ব্যারাজপাড়া।
আমরা ভূমিহীন গরিব মানুষ। প্রায় ২৫ বছর ব্যারাজের সরকারি জায়গায় বসবাস করছি।’ এদিকে ৪৬ বছর পর জিয়াউর রহমানের সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন তার ছেলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে এটি হবে জিয়াউর রহমানের গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরত্বে পাংশার হাবাসপুরে। নাম হবে পদ্মা ব্যারাজ। কিন্তু এতে খুশি নয় কুষ্টিয়াসহ এ অঞ্চলের মানুষ। তাদের দাবি, ব্যারাজটি ভেড়ামারায়ই হোক। ভেড়ামারার সাবেক স্কুলশিক্ষক আইয়ুব আলী বলেন, ‘জিয়াউর রহমান গঙ্গা ব্যারাজ বাস্তবায়ন করতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। একবার তিনি এখানে এসেছিলেন।
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর ব্যারাজ নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ তিনি চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর বিপথগামী কিছু সেনা কর্মকর্তার হাতে নিহত হন। এরপর প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়ে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় এ অঞ্চলের মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিল যে, এবার তার বাবার স্বপ্নের গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে। কিন্তু কয়েকদিন আগে যখন শুনতে পেলাম এখানে হচ্ছে না ব্যারাজ। তাই একজন ক্ষুদ্র মানুষ হিসাবে খুব কষ্ট পেয়েছি।’ গঙ্গা ব্যারাজ বাস্তবায়ন কমিটির তৎকালীন সভাপতি সাবেক সংসদ-সদস্য ও বর্তমান জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন বলেন, ‘বাংলাদেশে ফারাক্কা বাঁধের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। এজন্য তিনি কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার বাহিরচরে এসেছিলেন।
তার মৃত্যুর পর ব্যারাজ নির্মাণকাজ থেমে যায়। তবে আমরা গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণ করতে আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে গেছি। সেই আন্দোলনের ফসল হলো বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের সাহসী পদক্ষেপ।’ কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুর রহমান বলেন, ১৯৮০ সালে ভেড়ামারায় গঙ্গা বাঁধ নামে একটি প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেসময় একটি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল বলেও শুনেছি। তবে ওই প্রকল্পের কোনো নথি বা তথ্য এখানে নেই।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য