কুমারখালীতে বাণিজ্যিকভাবে বেড়েছে পাটকাঠির কদর - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুমারখালীতে বাণিজ্যিকভাবে বেড়েছে পাটকাঠির কদর 

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: সেপ্টেম্বর ১, ২০২৪

মোশারফ হোসেন ॥ অর্থকরী পণ্য হয়ে উঠেছে একসময়ের হেলাফেলার পাটকাঠি। পানের বরজ, পার্টিকেল বোর্ড ও চারকোল কারখানায় পাটখড়ির ব্যাপক চাহিদা। বর্তমানে চারকোল বা পাটকাঠির ছাই রফতানিও হচ্ছে। মূলত গত এক দশক ধরেই এই জ্বালানি বস্তুটির বাজার বাড়ছে। শুধু তাই নয়, দেশে উদীয়মান রফতানিপণ্য হিসেবে শিল্পের মর্যাদাও পাচ্ছে পাটকাঠির ছাই। কৃষকরা বলছেন, বাজারে পাট বিক্রি করে কোনো রকম উৎপাদন খরচ ওঠে। কিন্তু পাটকাঠি বিক্রির পুরো টাকাটাই লাভ! অনেকেই পাটকাঠি কেনাবেচাকে ব্যবসা হিসেবে নিয়েছেন। এতে সৃষ্টি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থানও। ঘুরে দাঁড়াচ্ছে দেশের পাটশিল্প। পাটখড়ি এক সময় গ্রামে-গঞ্জে এলোমেলোভাবে পড়ে থাকত। শুধু রান্নার কাজে লাগত। তাও সবসময় নয়। পাটের উপজাত এই পাটখড়ি বা পাটকাঠি গ্রামের গৃহিণীদের কাছে বেশ কদরও ছিল। যেমন কদর ছিল বাঁশ, ধানের তুষ কিংবা কাঠ-খড়। তবে অবহেলায় অনেক পাটখড়ি নষ্ট হয়ে যেত। কখনো পুকুরে আবার কখনো ঝিলের পাড়ে। এখন আর সেই দিন নেই। সময়ের পরিক্রমায় বেড়েছে এর বহুমুখী ব্যবহার। পাটখড়ির কদর বেড়েছে বহু গুণ। চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে পাটকাঠি। বলা যেতে পারে, এই পাটখড়ি সোনালী আঁশ পাটের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে চমক সৃষ্টি করেছে। কারণ এই পাটখড়ি বিশেষ এক চুল্লিতে পুড়িয়ে তৈরি হচ্ছে কার্বন বা চারকোল। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, এই কার্বন বিদেশে রফতানি হচ্ছে।

কার্বন পাউডার বা চারকোল এখন কিনে নিচ্ছে চীনসহ বেশ কয়েকটি দেশ। তারা এই পাটখড়ির কার্বন থেকে কার্বন পেপার, কম্পিউটার ও ফটোকপিয়ারের কালি, আতশবাজি, ফেসওয়াশের উপকরণ, প্রসাধন পণ্য, মোবাইল ব্যাটারি, দাঁত মাজার ওষুধ, খেতের সারসহ অনেক ধরনের পণ্য তৈরি করছে। কুমারখালী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর  বলেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৪ হাজার ৭৮৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ এর লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এবার পাট চাষ হয়েছে ৪ হাজার ৬৪০ হেক্টর জমিতে। যা গত বছরের কম। এবছর তাপদাহ ও পানি না থাকায় পাট চাষ কম হয়েছে। এখানে পাট থেকে বিপুল পরিমাণ পাটকাঠি পাওয়া যায় ।

এক সময় রান্নার জ্বালানি, বেড়া দেওয়াসহ কম গুরুত্বপূর্ণ কাজে পাটকাঠির ব্যবহার ছিল। আর এখন এই পণ্যের বেশ বড় বাজার তৈরি হয়েছে। উপজেলার পাট চাষিরা জানান, এ বছর জেলার পাটের দাম ভালো থাকলেও মৌসুমের শুরুতে তীব্র তাপদাহ ও বৃষ্টি না থাকার কারণে পাট উৎপাদন আশানুরূপ হয়নি। তাছাড়া জলাশয়ের অভাবে পাট পচাতেও বেশ বেগ পেতে হয়েছে তাদের। ফলে অনেকের পাটেই ভালো রং আসেনি। তাই লাভের অঙ্ক হিসাব করতে গিয়ে পাটকাঠিতেই ভরসা করছেন তারা। কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সর্বত্র চলছে পাট পচানো, আঁশ ছাড়ানো ও শুকানোর কাজ। কৃষকরা এখন পাটকাঠিও  শুকাচ্ছেন।

উপজেলার ভবানীপুর, সদকী, যদুবয়রা, মহেন্দ্রপুর সহ বিভিন্ন এলাকায় কৃষক পরিবারগুলো পাট ও পাটকাঠি শুকিয়ে ঘরে তোলার কাজে ব্যস্ত। নন্দুলালপুর ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামের রকমত শেখ বলেন , পাটকাঠি  রান্নার জ্বালানি, ঘরের বেড়া, পানের বরজের ছাউনি ছাড়া আর অন্য কোনো কাজে লাগত না পাটকাঠি। কিন্তু এখন পাটকাঠির ছাই (চারকোল) বিদেশে রফতানি হচ্ছে।  উপজেলার সদকী গ্রামের পাট চাষিরা জানান, দূর-দূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা এসে পাটকাঠি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন, দামও দিচ্ছেন ভালো।

১০০ মোঠা পাটকাঠি বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়, যা এক সময় ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হতো। তারা জানান, পাট আবাদের খরচ পাট বিক্রি করে উঠে আসে। আর পাটকাঠি তাদের লাভের মুখ দেখিয়েছে। কৃষকদের সঙ্গে একমত পোষণ করেন কুমারখালী কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ দেবাশীষ দাস । তিনি বলেন, এখন  বিভিন্ন পারটেক্স বোর্ড কারখানা ও আকিজ গ্রুপের মতো বড় বড় কোম্পানিতে এ পাটকাঠি ব্যবহৃত হচ্ছে। পাটের রুপালি কাঠি এখন কৃষককে আশার আলো দেখাচ্ছে।

পাটকাঠির ব্যবসায় অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। প্রায় ছয় বছর ধরে পাটকাঠির ব্যবসা করেন জেলার দৌলতপুর উপজেলার মমিন শেখ। তার দেখাদেখি এলাকার অনেকেই এখন এই ব্যবসা শুরু করেছেন বলে জানান তিনি। জানা গেছে, চীন ছাড়াও মেক্সিকো, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, ব্রাজিল, তাইওয়ান, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানিসহ ইউরোপের দেশগুলোতে চাহিদা তৈরি হয়েছে।

ইউরোপে ওয়াটার পিউরিফিকেশন প্ল্যান্টে রয়েছে পাটখড়ির কার্বনের ব্যাপক ব্যবহার। আমাদের দেশেও পাটখড়ি থেকে চারকোল তৈরির কারখানার চাহিদা বাড়ছে। জানা যায়, সোনালি আঁশের দেশে সম্ভাবনাময় নতুন এ রফতানি পণ্যটির বিকাশে একটি নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়। নীতিমালায় পাটকাঠির ছাই শিল্পকে একটি উদীয়মান শিল্প হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ বিষয়ে তথ্য জানতে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় থেকে সকল জেলা প্রশাসককে পাটকাঠি পুড়িয়ে ছাই উৎপাদন ও রফতানি বিষয়ে তথ্য পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাট অধিদফতর বলছে, দেশে বছরে প্রায় ৩০ লাখ টন পাটকাঠি উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে ৫০ শতাংশের সঠিকভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে পাটকাঠির ছাইয়ের বার্ষিক উৎপাদন দাঁড়াবে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টন। যা বিদেশে রফতানি করে এ খাতে বছরে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব।