রঞ্জুউর রহমান ॥ দেশের কোথাও না কোথাও প্রতিদিনই ঘটছে অগ্নিদুর্ঘটনা। এতে প্রাণহানির পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষতিও হচ্ছে। দেশের ৪৭ শতাংশ মানুষ ননব্র্যান্ডেড (নিম্নমানের নকল ও অনুমোদনবিহীন) বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও লাইট ব্যবহার করছে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে। বর্তমান দেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আগুন লাগছে বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে। এর পেছনে রয়েছে নকল ও নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরও বেশির ভাগ অগ্নিকান্ডের জন্য নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জামকেই দায়ী করছে। বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য ক্যাবলের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি হলেও নিম্নমানের ক্যাবলের কারণে জনজীবন হুমকিতে পড়েছে। বৈদ্যুতিক ক্যাবল তৈরিতে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় তামা, এলুমিনিয়াম এবং প্লাস্টিক। তামা অথবা এলুমিনিয়ামের তারের ওপর প্লাস্টিক ইন্সুলেশন করে তৈরি করা হয় ক্যাবলস্ বা তার। কপারের স্থায়িত্ব এবং প্লাস্টিকের স্থায়িত্ব সমান করতে হলে তারের জন্য বিশেষ মানের প্লাস্টিক কাঁচামাল ব্যবহার করতে হয়। নাহলে আগেই ইন্সুলেশন নষ্ট হয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। শুধু নিম্নমানের কাঁচামাল দিয়ে তৈরি তার ব্যবহার করার কারণে শর্টসার্কিট হয়ে অগ্নিকান্ডে জানমালের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা অনেক বেশি। অন্য সরঞ্জামে স্টিকার, বডি বা গ্যারান্টি-ওয়ারেন্টির বিষয় থাকলেও বৈদ্যুতিক তারের ক্ষেত্রে নেই এসবের বালাই।বড় বড় কোম্পানির সিল দিয়ে দেদার বিক্রি হচ্ছে এসব তার। কুষ্টিয়া শহরের সবচেয়ে বেশি বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বেচা-কেনা হয় কুষ্টিয়া এন এস রোডের চাঁদ সুপার মার্কেট ও কুষ্টিয়া বড় বাজার সেখানে দোকানগুলোতে নামি-দামি ব্র্যান্ডের স্টিকার লাগানো বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম পাওয়া যায় সাশ্রয়ী মূল্যে। ফ্যান, মাল্টিপ্লাগ, চার্জার ফ্যান, সুইচ-সকেট, এলইডি লাইট কি নেই ওখানে। তবে সবচেয়ে বেশি যে পণ্য বিক্রি হয় তা হচ্ছে বৈদ্যুতিক তার।এছাড়া ,৬০ থেকে ১০০ টাকায় যেসব এলইডি লাইট বিক্রি হচ্ছে, তা কোনো ধরনের মানদন্ড ও বিএসটিআই অনুমোদিতা সিল নিশ্চিত ছাড়াই এই মার্কেটে কারিগর দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। প্রতিটি লাইটে ৫-৬টি ছোট আকারে এলইডি লাইট, একটি এলোমুনিয়াম আইসি ও মাদারবোর্ড যুক্ত করে ২০- ৩০ টাকা খরচে তৈরি করা হয়। এরপর বিক্রি হচ্ছে কয়েকগুণ বেশি দরে। কিছুদিন ব্যবহারের পর এসব লাইট নষ্ট হয়ে যায়। এতে ক্রেতার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। পাশাপাশি নিম্মামানের এসব পণ্যের কারণে বড় ধরনের বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের আশঙ্কাও থাকে। বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের বেশির ভাগই আমদানি করা। বাজারে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ সুইচ, সার্কিট ব্রেকার, বৈদ্যুতিক তার বিএসটিআইয়ের সনদহীন। আবার আমদানিতে ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক থাকলেও তা সঠিকভাবে মানা হচ্ছে না। অসাধু ব্যবসায়ীরা নিম্নমানের পণ্য আমদানি করে দেদার বিক্রি করছেন। বিএসটিআইও এ বিষয়ে তেমন নজরদারি করছে না। বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের প্যাকেটে বিএসটিআইয়ের মানচিহ্ন থাকার নিয়ম থাকলেও অধিকাংশ পণ্যে তা নেই। চাঁদ সুপার মার্কেটে ক্রেতা সাদিয়া জাহান সাথী বলেন, আমাদের বাড়িতে একটি নতুন ঘর নির্মাণ হচ্ছে সেই ঘরের জন্য কিছু বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও তার কেনার প্রয়োজন ছিল তাই চাঁদ সুপার মার্কেটে থেকে কিছু বৈদ্যুতিক তার ও সার্কিট বোর্ড, লাইট সহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কিনেছিলাম কিন্তু যে তার দিয়ে ঘরের ওয়ারিং করা হয়েছিল ওয়ারিং এর ১০ দিনের মাথায় তার গলে নষ্ট হয়ে গেছে। বাকি যে সকল ইলেকট্রনিক পণ্য এই মার্কেট থেকে কিনেছিলাম তা প্রথম পর্যায়ে খুব ভালোই চলছিল কিন্তু ১০-১৫ দিন পরে সে সকল বৈদ্যুতিক পণ্যর কার্যকর ক্ষমতা কমে যায় এবং ধীরে ধীরে সেগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিএসটিআই আঞ্চলিক কার্যালয় কুষ্টিয়া এর উপপরিচালক (রসায়ন) প্রদীপ কুমার মালো বলেন, কোন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা অবশ্যই অভিযান পরিচালনা করব এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনা অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করব। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর কুষ্টিয়া এর সহকারী পরিচালক সুচন্দন মন্ডল বলেন, এই বিষয়ে আমরা কোন অভিযোগ পেলে বিএসটিআই ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করা হবে।
