খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই ফেব্রুয়ারি ২০১৫, ৪:৪০ পিএম

উত্তরের পলিমাটিধৌত পদ্মা নদীর অববাহিকা এবং বাংলার বাউল সাধনা ও সাহিত্য সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিচিত কুষ্টিয়া জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বরেণ্য প্রশাসনিক অঞ্চল। সাহিত্য, শিল্প, কৃষি এবং বাণিজ্যের এক সমৃদ্ধ মেলবন্ধন এই জেলাটিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এক বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করেছে।

কুষ্টিয়া জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা বিভাগের অধীন একটি জনবহুল জেলা। এর উত্তরে পাবনা ও নাটোর জেলা, দক্ষিণে ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গা জেলা, পূর্বে রাজবাড়ী জেলা এবং পশ্চিমে মেহেরপুর জেলা ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য অবস্থিত। নদীবেষ্টিত এই জেলার মোট আয়তন প্রায় ১,৬০৮.৮০ বর্গকিলোমিটার।
কুষ্টিয়া জেলার নামকরণের ইতিহাস নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে নানা মত রয়েছে। প্রচলিত মতে, একসময় এই অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে ‘কুষ্টি’ বা পাট চাষ হতো এবং পাট ব্যবসার একটি প্রধান কেন্দ্র বা ‘কুঠি’ গড়ে উঠেছিল। আবার অনেকের মতে, ফার্সি শব্দ ‘কুশতহ’ (যার অর্থ পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া বা নদীর ভাঙনকবলিত পলিভূমি) কিংবা স্থানীয় ‘গোসাঁইটেক’ বা ‘কোশরাজ্য’ থেকে পরিবর্তিত হয়ে ‘কুষ্টিয়া’ নামের উৎপত্তি হয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে নদীপথে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটলে ব্রিটিশ আমলে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপ-বিভাগে এবং পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনিকভাবে মোট ৬টি উপজেলা, ৫টি পৌরসভা, এবং বিভিন্ন ইউনিয়নে বিভক্ত। জেলাটির প্রধান উপজেলাগুলো হলো:
কুষ্টিয়া সদর উপজেলা
কুমারখালী উপজেলা
খোকসা উপজেলা
মিরপুর উপজেলা
ভেড়ামারা উপজেলা
দৌলতপুর উপজেলা
পদ্মা, গড়াই, কুমার, কালিনগঙ্গা এবং মাথাভাঙ্গা নদীর জালের মতো ছড়িয়ে থাকা অববাহিকা কুষ্টিয়ার ভূপ্রকৃতিকে অত্যন্ত উর্বর করে তুলেছে। গঙ্গা-কপোতক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্পের কারণে এখানকার কৃষিব্যবস্থা অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
প্রধান ফসল: ধান, গম, পাট, ভুট্টা এবং পেঁয়াজ।
অর্থকরী ফসল: তামাক চাষের জন্য কুষ্টিয়া জেলা দেশজুড়ে বিশেষ পরিচিতি বহন করে। এছাড়া কলা, আম এবং বিভিন্ন শীতকালীন শাকসবজির ব্যাপক ফলন হয় এই অঞ্চলে।
ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে কুষ্টিয়ায় অসংখ্য দর্শনার্থী ও পর্যটকদের আকর্ষণ করার মতো বিখ্যাত স্থান রয়েছে:
ফকির লালন সাঁইজির মাজার (ছেউড়িয়া): বাউল সম্রাট লালন সাঁইজির আখড়া এবং তাঁর মাজার কুষ্টিয়ার আধ্যাত্মিক সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে প্রতিবছর হাজার হাজার ভক্ত ও পর্যটকের সমাগম ঘটে।
রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ী (শিলাইদহ): বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর জমিদারি দেখাশোনার জন্য কুমারখালীর শিলাইদহে যে ঐতিহাসিক কুঠিবাড়ীতে অবস্থান করেছিলেন, সেখানে তাঁর অনেক বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম রচিত হয়।
হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও লালন শাহ সেতু: পদ্মা নদীর ওপর ব্রিটিশ আমলে নির্মিত ঐতিহাসিক রেলসেতু হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এবং আধুনিক লালন শাহ সেতু কুষ্টিয়ার অন্যতম প্রকৌশলগত ও দৃশ্যগত নিদর্শন।
মথুরাপুর দেউল: দৌলতপুর উপজেলায় অবস্থিত প্রাচীন স্থাপত্যকলার এক অনন্য ও রহস্যময় নিদর্শন।
শিক্ষানবিস ও সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের কাছে কুষ্টিয়া একটি অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: এখানে রয়েছে বিখ্যাত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ সীমানায় অবস্থিত), কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ, এবং সরকারি মহিলা কলেজের মতো শীর্ষস্থানীয় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
যোগাযোগ ব্যবস্থা: সড়কপথ এবং রেলপথে ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সাথে কুষ্টিয়ার অত্যন্ত উন্নত ও সুদৃঢ় যোগাযোগ নেটওয়ার্ক রয়েছে। পোড়াদহ রেলওয়ে জংশন এই অঞ্চলের একটি ঐতিহাসিক রেল যোগাযোগের হাব।
স্বাস্থ্যসেবা: আধুনিক সদর হাসপাতাল এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মাধ্যমে জেলাবাসীর দোরগোড়ায় চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়া হয়।
কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের শেকড় অনেক গভীরে। বাউল গান, যাত্রাপালা এবং লোকসাহিত্যের চর্চা এখানকার মানুষের জীবনযাত্রার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।
বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁই (সাধক ও আধ্যাত্মিক কবি)
মীর মশাররফ হোসেন (প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার, ‘বিষাদ সিন্ধু’র রচয়িতা)
কাঙাল হরিনাথ মজুমদার (সাংবাদিক ও সমাজ সংস্কারক, ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’র সম্পাদক)
বাউল মরমী কবি পাঞ্জু শাহ
কুষ্টিয়ার মিষ্টি ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের খ্যাতি দেশজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। এর মধ্যে খাঁকার তিলের খাজা (Tiler Khaja) এবং সুস্বাদু মালাই চমচম খাদ্যপ্রেমীদের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত। এছাড়া এখানকার গ্রামীণ মেলা, বাউল উৎসব এবং বৈশাখী আয়োজন কুষ্টিয়ার লোকজ সংস্কৃতিকে চিরকাল জীবন্ত করে রেখেছে।
কুষ্টিয়া জেলার অর্থনীতি মূলত কৃষিভিত্তিক হলেও এর অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক বাণিজ্যে বৃহৎ হাট-বাজারগুলো প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ছড়িয়ে থাকা উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে:
পোড়াদহ কাপড়ের হাট: মিরপুর উপজেলার এই হাটটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্ববৃহৎ পাইকারি বস্ত্র ও শাড়ির মোকাম।
আইলচারা ও বালিয়াপাড়া পশু হাট: গবাদিপশু বেচাকেনার জন্য জেলার অন্যতম বৃহৎ ও রাজস্বসমৃদ্ধ হাট।
খালিশাকুন্ডি হাট: দৌলতপুর উপজেলার তামাক, পেঁয়াজ ও পশুপালনের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র।
পান্টি ও বাঁশগ্রাম বাজার: কুমারখালী উপজেলার বৃহত্তম গ্রামীণ ও পাইকারি বাণিজ্য হাব।

কুষ্টিয়া জেলা জেলা নিয়ে করা আমাদের নিচের সকল আর্টিকেল এই সাইটে পাবেন।
মন্তব্য