কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

গোল্ডেন বেঙ্গলের সিগারেট কারখানায় জব্দের হিসাব নিয়ে গরমিল

১০ হাজার নাকি ১ লাখ ৩০ হাজার শলাকা

 

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার মিরপুরে বেঙ্গল সিগারেট তৈরির কারখানা গোল্ডেন বেঙ্গল সিগারেট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে প্রশাসনের অভিযানে জব্দ করা সিগারেটের পরিমাণ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। উপজেলা প্রশাসনের দাবি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা ১০ হাজার প্যাকেট সিগারেট জব্দ করেছেন। কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগের উপকমিশনার বলছেন, জব্দ করা হয়েছে ১০ হাজার শলাকা। অন্যদিকে, অভিযানসংশ্লিষ্ট একটি বিশ্বস্ত সূত্রের দেওয়া তথ্যে ১ লাখ ৩০ হাজার সিগারেট, ৮৪০ কেজি তামাক, দুই হাজার ট্যাক্স স্ট্যাম্প এবং তিনটি সচল সিগারেট তৈরির মেশিন জব্দের কথা বলা হয়েছে। 

 

গত ২ নভেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার বারুইপাড়া ইউনিয়নের মশান-কেউপুর এলাকায় অবস্থিত কারখানাটিতে অভিযান পরিচালিত হয়। উপজেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তারাও অংশ নেন। অভিযানের পর কারখানাটির উৎপাদন কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র উপস্থাপন এবং পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত উৎপাদন বন্ধ থাকবে বলে জানানো হয়েছে। তবে বিশ্বস্ত একটি সূত্রের দাবি, ঘটনাস্থল থেকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার চলে যাওয়ার পর পুনরায় কারখানাটি চালু করা হয়।

 

অভিযানটি পরিচালনা করেন মিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আফরোজ শাহীন খসরু। এ সময় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মতিয়ার রহমান, পুলিশ ও আনসার সদস্য এবং কাস্টমসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন। অন্য কোনো কোম্পানির পণ্য কারখানাটিতে উৎপাদন করা হচ্ছে—এমন অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হলেও সেখানে অন্য কোনো কোম্পানির পণ্য উৎপাদনের নমুনা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

 

তবে সিগারেটের প্যাকেটে ব্যবহৃত রাজস্ব ব্যান্ডরোলের সত্যতা নিয়ে অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি যাচাই করা হয়। একপর্যায়ে তিন ধরনের ব্যান্ডরোল পাওয়া যায়। এসব ব্যান্ডরোল ভারত থেকে আসে বলে সেসময় সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ব্যান্ডরোলের উৎস ও সত্যতা যাচাইয়ের জন্য কাস্টমসের সংশ্লিষ্ট টিমকে ঘটনাস্থলে ডাকা হয়। তাদের উপস্থিতিতে ব্যান্ডরোলসহ অন্যান্য সামগ্রী জব্দ করা হয়। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তিন ধরনের মোট ৬০টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব নমুনা পরীক্ষাগারে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর প্রকৃত অবস্থা জানা যাবে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

 

অভিযানের পর জব্দ করা সিগারেটের পরিমাণ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে গরমিল দেখা দিয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফরোজ শাহীন খসরু জানিয়েছেন, এনবিআরের কর্মকর্তারা ১০ শলাকাবিশিষ্ট ১০ হাজার প্যাকেট সিগারেটসহ বিভিন্ন মালামাল জব্দ করেছেন। এ হিসাবে মোট সিগারেটের পরিমাণ দাঁড়ায় এক লাখ শলাকা। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো মালামাল জব্দ করা হয়নি। জব্দের পুরো প্রক্রিয়া এনবিআরের কর্মকর্তারা নিজেদের মতো করে পরিচালনা করেছেন।

 

অন্যদিকে, কুষ্টিয়া কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগের উপকমিশনার মো. নুরুল বাসির জানিয়েছেন, ১০ শলাকাবিশিষ্ট এক হাজার প্যাকেটের সমপরিমাণ ১০ হাজার শলাকা সিগারেট একটি কার্টনে পাওয়া যায়। ওই কার্টনটি অভিযানকারী দল কার্যালয়ে নিয়ে এসেছে। জব্দ করা মালামাল সিজার করার সময় উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন বলেও তিনি জানান।

 

এদিকে অভিযান সংশ্লিষ্ট একটি বিশ্বস্ত সূত্রের দেওয়া তথ্যে জব্দের পরিমাণ আরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সূত্রের তথ্যমতে, অভিযানে বেঙ্গল ও ভিআইপি ব্র্যান্ডের মোট ১ লাখ ৩০ হাজার সিগারেট, ৮৪০ কেজি প্রক্রিয়াজাত ও অপ্রক্রিয়াজাত তামাক, আট রোল টিপিং পেপার, অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল, দুই হাজার জাল ট্যাক্স স্ট্যাম্প এবং তিনটি সচল ‘মোলিনস মার্ক ৮’ সিগারেট তৈরির মেশিন জব্দ করা হয়েছে। ৮৪০ কেজি তামাক দিয়ে প্রায় ১২ লাখ সিগারেট উৎপাদন সম্ভব বলেও ওই সূত্রে দাবি করা হয়েছে।

 

কারখানাটিতে ব্যবহৃত রাজস্ব ব্যান্ডরোলের সত্যতা নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগের উপকমিশনার মো. নুরুল বাসির বলেন, “প্রাথমিকভাবে সন্দেহের ভিত্তিতে কিছু নকল ব্যান্ডরোল জব্দ করা হয়েছে। বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার জন্য ইতোমধ্যে নমুনা সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসে পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার পর অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে এ বিষয়ে ফৌজদারি মামলা করার বিধান রয়েছে।”

 

তিনি আরও বলেন, কারখানায় দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার উপস্থিতিতে উপজেলা প্রশাসনের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর তাঁকে ফোন করে বিষয়টি জানায় এবং কাস্টমসের লোক পাঠাতে বলে। পরে তাঁদের লোকজন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। জব্দ করা মালামাল সিজার করার সময় উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন বলেও জানান তিনি।

 

উপকমিশনারের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে কিছু ব্যান্ডরোল নকল বলে সন্দেহ করা হলেও পরীক্ষার ফলাফল না আসা পর্যন্ত সেগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসের পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

 

কারখানাটির উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ও কাগজপত্র যাচাই করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফরোজ শাহীন খসরু। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যাচাইয়ে ছয়টি অনুমোদিত কাগজপত্র পাওয়া গেছে। এ ছাড়া কিছু কাগজপত্র অনুমোদনের অপেক্ষায় এবং কিছু আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

 

তবে কোন কোন কাগজপত্র অনুমোদিত, কোনগুলো অনুমোদনের অপেক্ষায় এবং কোন আবেদন প্রক্রিয়াধীন—সে বিষয়ে বিস্তারিত তালিকা পাওয়া যায়নি। 

 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, তাঁদের কাছে যেসব উপাদান সন্দেহজনক মনে হয়েছে, সেগুলোর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ফলাফল জানানোর জন্য সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে। কারখানায় পাওয়া কিছু কার্টন দেখে তাঁদের মনে হয়েছে, সেগুলো স্টার সিগারেটের মূল কার্টন নয়। তাঁর ধারণা, কার্টনগুলো দুই থেকে তিনবার ব্যবহার করা হয়েছে। টিপিং পেপার ব্যবহার করে স্টার সিগারেটের প্যাকেট তৈরি করা সম্ভব নয় বলেও তাঁদের মনে হয়েছে। 

 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরও বলেন, কারখানাটির ব্যান্ডরোল সংগ্রহ ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে এনবিআরের অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর জানা মতে, প্রতিষ্ঠানটিকে ‘বেঙ্গলি স্পেশাল’ ও ‘ভিআইপি’ নামে ব্যান্ডরোল কেনার অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। কোনো প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্রে অসংগতি থাকলে এনবিআর সাধারণত ব্যান্ডরোল কেনার অনুমতি দেয় না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

 

তবে অভিযানের সময় উপজেলা প্রশাসন কাস্টমসের কোনো কর্মকর্তাকে আগে থেকে অবহিত করেনি বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এনবিআরের কর্মকর্তারা নিজেরাই পুরো বিষয়টির দায়িত্ব নিয়ে নেন। অভিযানের সময় সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। নির্ধারিত নিয়মে আবেদন করা হলে ব্যান্ডরোল আসল না নকল, সে বিষয়ে জানাতে পারবে বলে তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

 

এ বিষয়ে কাস্টমস বিভাগের উপকমিশনারের বক্তব্য অনুযায়ী, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ফোন পাওয়ার পর তাঁদের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান। দুই পক্ষের বক্তব্যে অভিযানের সময় কাস্টমস কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ও দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়ে কিছু পার্থক্য রয়েছে। 

 

প্রসঙ্গে কথা বলতে কারখানাটির মালিক আতিয়ার রহমান ও রাজু আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

 

Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর