কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

এতিমখানায় নেই এতিম শিশু  

তদন্তের পর পুনঃতদন্ত

 

 

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার বিল কাটিয়া এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের নিবন্ধন আবেদন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমাজসেবা কার্যালয়ের প্রথম তদন্তে প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো এতিম শিশু পাওয়া যায়নি। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সুযোগ-সুবিধা না থাকা এবং এলাকার অসহায় মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে অবদান না রাখার বিষয়ও উঠে এসেছে তদন্ত প্রতিবেদনে। এসব কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে নিবন্ধন না দেওয়ার সুপারিশ করেন তদন্ত কর্মকর্তা।

 

তবে ওই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিনই নতুন করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। লিখিত আবেদন ছাড়াই প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে পুনঃতদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কুষ্টিয়া জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো: আব্দুল লতিফ সেখ। এ নিয়ে তদন্ত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও কমিটির সদস্য নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

 

উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরেজমিনে পরিদর্শনের সময় প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো এতিম শিশু পাওয়া যায়নি। শিশু আইন, ২০১৩-এর ৮১ ধারায় উল্লেখিত ১৬ ধরনের সুবিধাবঞ্চিত শিশুর মধ্যেও কাউকে পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নেই। প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্পর্কে স্থানীয়ভাবে সন্তোষজনক মন্তব্যও পাওয়া যায়নি। এসব বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানটিকে নিবন্ধন না দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

 

প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা কুমারখালী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, সরেজমিনে গিয়ে যা পেয়েছেন, তা-ই প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, এতিমখানায় গিয়ে কোনো এতিম শিশু পাইনি। সংস্থাটির কার্য এলাকার অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নেও কোনো অবদান পাওয়া যায়নি। এসব বিষয়ই তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছি।

 

মিজানুর রহমান আরও বলেন, শুনেছি, ১৭ অক্টোবর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি এবং ওই দিনই পুনরায় তদন্ত দেওয়া হয়েছে। কেন পুনঃতদন্ত দেওয়া হয়েছে, তা আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানেন।

 

এ বিষয়ে এতিমখানার সেক্রেটারি বাবুল চেয়ারম্যান বলেন, প্রথম তদন্তের সময় হঠাৎ করেই তদন্ত দল প্রতিষ্ঠানটিতে আসে। সে সময় এতিমখানার শিশুরা গোসল করতে যাওয়ায় তাদের পাওয়া যায়নি।

তদন্ত প্রতিবেদন প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে যাওয়ার পর পুনরায় তদন্তের আবেদন কবে করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তিন থেকে চার দিন পর তাঁরা আবেদন করেছেন।

 

তবে ১৭ তারিখে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া এবং একই দিনে নতুন তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি কীভাবে সম্ভব এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেননি এবং পুনরায় তদন্তের আবেদন পত্র দেখাতে পারেননি।

 

পরবর্তীতে তিনি কুমারখালী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শত্রুতার কারণে তদন্ত প্রতিবেদন বিপক্ষে দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। তবে কী কারণে বা কী ধরনের শত্রুতার জেরে এমন প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি।

 

জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক বলেন, প্রথম তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ আপত্তি জানায়। পরে তিন সদস্যের নতুন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির প্রধান করা হয় খোকসা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা জহুরুল ইসলামকে।

পুনঃতদন্তের জন্য প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ লিখিত আবেদন করেছিল কি না, জানতে চাইলে উপপরিচালক বলেন, ‘না, আমার কাছে ফোন করে বলেছিল।

 

তিনি জানান, প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের অভিযোগ ছিল, তাদের না জানিয়ে তদন্ত করা হয়েছে। এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই নতুন কমিটি গঠন করা হয়। তবে তদন্তের আগে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে জানানো বাধ্যতামূলক কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ধরনের বাধ্যবাধকতা নেই।

 

নতুন তদন্ত কমিটির সদস্যদের একজন জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের অফিস সহায়ক নাঈম শাহরিয়ার লিকু। একজন অফিস সহায়ককে তদন্ত কমিটিতে রাখার কারণ জানতে চাইলে উপপরিচালক স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি।

 

কমিটির আরেক সদস্য শহর সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, কেন পুনঃতদন্ত করা হয়েছে, তা তাঁর জানা নেই। তদন্ত কমিটির সদস্য হিসেবে তাঁরা প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেছেন।

 

প্রথম তদন্ত প্রতিবেদন বাতিলের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলতে পারবেন।

 

তদন্তের আগে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল কি না, জানতে চাইলে আরিফুল ইসলাম বলেন, আমি জানাইনি। হয়তো তদন্ত কমিটির প্রধান জানিয়েছিলেন। তিনি আগেই সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। আমাদের যেতে একটু দেরি হয়েছিল।

 

তদন্ত কমিটিতে অফিস সহায়ককে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে তিনি বলেন, কমিটি তো আমরা তৈরি করিনি। আমাদের ডিডি স্যার করেছেন। তিনি কেন করেছেন, তা আমরা জানি না।

 

তদন্তের বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে আরিফুল ইসলাম বলেন, এটা সত্য নয়, আমরা কোনো সুবিধা নিইনি।

 

তদন্ত কমিটির আরেক সদস্য নাঈম শাহরিয়ার লিকু বলেন, প্রতিষ্ঠানটিতে এতিম শিশু রয়েছে কি না এবং কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য সঠিক কি না, তা যাচাই করাই ছিল তাঁদের কাজ। তিনি দাবি করেন, তাঁরা সেখানে সবকিছু ঠিকঠাক পেয়েছেন।

 

শিশুদের প্রত্যয়নপত্র যাচাইয়ের বিষয়ে তিনি বলেন- যাদের প্রত্যয়নপত্র ছিল, তাদের সঙ্গে কথা বলে তথ্য মিলিয়েছি। তবে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে যাচাই করা হয়নি।

 

এদিকে পুনঃতদন্ত কমিটির প্রধান খোকসা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা জহুরুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

 

প্রথম তদন্তে এতিম শিশু না পাওয়া এবং প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে অসংগতির কথা উল্লেখ করে নিবন্ধন না দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে, পুনঃতদন্ত কমিটির সদস্যরা প্রতিষ্ঠানটিতে সবকিছু ঠিকঠাক পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন। লিখিত আবেদন ছাড়াই পুনঃতদন্তের সিদ্ধান্ত এবং তদন্ত কমিটিতে অফিস সহায়ককে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর