বিশেষ প্রতিনিধি ॥ ২ হাত-পায়ে ছড়িয়ে পড়েছে একজিমার মতো চর্মরোগ। চিকিৎসা নিতে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রত্যন্ত চরাঞ্চল চিলমারি থেকে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে এসেছেন ৬২ বছর বয়সী রাহেলা খাতুন। কিন্তু টিকিট কাউন্টার থেকে তাকে জানানো হয়, বহির্বিভাগে এ রোগের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না।
পাঁচ টাকার টিকিট কেটে হাসপাতালের বারান্দায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন তিনি। চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে গেলে যাতায়াতের খরচটাই বৃথা যাবে—এই আশায় অপেক্ষা করছিলেন বয়স্ক এই নারী।
হাসপাতালের বারান্দায় কথা হয় রাহেলা খাতুনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ বাবা। ১০০ টাকা খরচ কইরে আসছি। এখন ডাক্তার না দেখায়ে ফিরে গেলে সবটাই লস হবে। এত বড় হাসপাতাল, আর আমার এই রোগের চিকিৎসা নাই’রাহেলার মতো চিকিৎসা নিতে এসে ভোগান্তিতে পড়ছেন অনেক রোগী।
কুষ্টিয়াসহ আশপাশের কয়েকটি জেলার মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসা এই হাসপাতালটিতে এখন চিকিৎসক সংকট তীব্র। ৭৮ জন চিকিৎসকের প্রয়োজন থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র ৩৩ জন। তাদের মধ্যেও অনেকে নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ সংকটে নাক-কান-গলা, চক্ষু এবং চর্ম ও যৌন রোগের চিকিৎসা বিভাগ বন্ধ হয়ে গেছে।শুধু বিশেষায়িত বিভাগ নয়, জরুরি বিভাগেও চিকিৎসক সংকট প্রকট। হাসপাতালের অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী, জরুরি বিভাগে আটজন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন মাত্র একজন। এতে জরুরি অস্ত্রোপচার করার সুযোগ নেই।
পাশাপাশি তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সংকটেও ব্যাহত হচ্ছে হাসপাতালের কার্যক্রম।চিকিৎসক না পেয়ে ভরসা নার্স-ওয়ার্ড বয়হাসপাতাল ঘুরে রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভর্তি থাকা রোগীরাও ২৪ ঘণ্টায় চিকিৎসকের দেখা পান দিনে মাত্র একবার।
অন্য সময় চিকিৎসাসেবা পেতে তাদের নির্ভর করতে হয় নার্স ও ওয়ার্ড বয়দের ওপর। বহির্বিভাগেও চিকিৎসক দেখাতে এসে দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে রোগীদের। হাসপাতালের বড় অংশের চিকিৎসাসেবা চলছে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দিয়ে।
দৌলতপুর থেকে চার বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন কাকলি খাতুন। তিনি বলেন, মঙ্গলবার দুপুরে ছেলেকে হাসপাতালে এনেছেন। তার প্রচণ্ড জ্বর ছিল। বুধবার বেলা ১১টা পর্যন্তও কোনো চিকিৎসা পাননি তারা। পরে আগের দিন সন্ধ্যায় ছেলের বাবাকে দিয়ে একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক দেখিয়ে এনেছেন। সেই চিকিৎসাতেই চলছে শিশুটির চিকিৎসা।
কাকলি খাতুনের মতো অনেক রোগী ও স্বজনের অভিযোগ, হাসপাতালে চিকিৎসক দেখাতে এসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। কখনো চিকিৎসকের দেখা না পেয়েই ফিরতে হয়। চিকিৎসক সংকটের কারণে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদেরও নিয়মিত চিকিৎসা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসকের অনুমোদিত ও প্রয়োজনীয় পদের বিপরীতে বড় ঘাটতি রয়েছে। প্রয়োজনীয় ৭৮ জন চিকিৎসকের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩৩ জন। অর্থাৎ ৪৫টি চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে।
এর মধ্যে জরুরি বিভাগে আটজন চিকিৎসকের প্রয়োজন হলেও দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র একজন।চিকিৎসকের পাশাপাশি তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরও সংকট রয়েছে। হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ১২টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র চারজন। এতে হাসপাতালের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনায় চাপ তৈরি হচ্ছে।
একসময় কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল এক হাজারের বেশি রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিয়েছে। তবে বর্তমানে চিকিৎসক ও জনবল সংকটে হাসপাতালটির সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে তিনটি বিভাগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট রোগীদের চিকিৎসা পেতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
চিকিৎসক সংকটের কারণ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালহাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ইকবাল হাসান বলেন, চিকিৎসক সংকটের মধ্যেও অনেক কষ্টে সেবা কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এরপরও তিনটি বিভাগ পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হয়েছে। তিনি জানান, পাশের কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসকেরা চলে যাওয়ায় ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে সংকট তীব্র হয়েছে। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডা. শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, একসময় কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জেনারেল হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করতেন। মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চালু হওয়ার পর তারা সেখানে চলে গেছেন। এ ছাড়া জেনারেল হাসপাতালের অনেক চিকিৎসক পদোন্নতি পেয়ে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যোগ দিয়েছেন। এতে জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট তৈরি হয়েছে।তবে চিকিৎসক সংকট থাকলেও কর্মরত চিকিৎসকদের সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে পরিস্থিতি অনেকটাই সামাল দেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন সিভিল সার্জন।
তিনি বলেন, ‘আগে জেনারেল হাসপাতাল অনেক চাপ নিয়েছে। কিন্তু এখন তো পাশেই মেডিকেল আছে। জটিল রোগের চিকিৎসা সেখানেই হচ্ছে। জেনারেল হাসপাতালে এত চাপও থাকার কথা না। চিকিৎসক সংকট আছে, তবে যা আছে তার সঠিক ব্যবহার করা গেলে সংকট অনেকটাই মোকাবিলা করা সম্ভব।’
শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চিকিৎসক নিয়োগের পরামর্শজেনারেল হাসপাতালের ওপর চাপ কমাতে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে চিকিৎসক নিয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন সিভিল সার্জন ডা. শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন।
তিনি বলেন, কুষ্টিয়ার বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিআরবি গ্রুপে চিকিৎসক নেই। শুধু বিআরবি নয়, অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতেও চিকিৎসক নিয়োগ নেই বলে তার দাবি। কুষ্টিয়ায় দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও সেখানেও চিকিৎসক নিয়োগের বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।সিভিল সার্জন বলেন, চিকিৎসক সংকটের কথা বলার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।তবে চিকিৎসক সংকটের কারণে তিনটি বিভাগ বন্ধ হয়ে যাওয়া, জরুরি বিভাগে প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসকের স্বল্পতা এবং রোগীদের দীর্ঘ অপেক্ষার বাস্তবতায় কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের সেবা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।









