বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় বাউল সাধক ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী উৎসব শেষ হয়েছে।
গতকাল সোমবার (১৯ অক্টোবর) বিকেলে লালন আখড়ায় উৎসবের শেষ দিনে আলোচনা সভা ও লালনসংগীতের আয়োজন করা হয়। এবারের উৎসবের প্রতিপাদ্য ছিল ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় লালন একাডেমি এ উৎসবের আয়োজন করে। শেষ দিনের অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা লালনভক্ত, সাধু-ফকির ও দর্শনার্থীরা অংশ নেন। তবে বিকেলে আলোচনা সভা চলাকালে দূরদূরান্ত থেকে আসা অনেক ভক্তকে বাড়ির উদ্দেশে ফিরে যেতে দেখা যায়।
শেষ দিনের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এমপি। মূল আলোচক ছিলেন প্রাবন্ধিক অধ্যাপক ড. আহমেদ শাকিল হাসমী। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংরক্ষিত মহিলা আসন-৩০৬-এর সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিন, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম, কুষ্টিয়া-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রাগিব রউফ চৌধুরী এবং জেলা বিএনপির সদস্যসচিব ইঞ্জিনিয়ার জাকির হোসেন সরকার।
আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. খালেদ উজ্জামান। স্বাগত বক্তব্য দেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) উপসচিব মিজানুর রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান।
এসময় প্রধান অতিথি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বাউল সাধক ফকির লালন সাঁইয়ের দর্শন মানুষে মানুষে বিভেদ দূর করে মানবিক, অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যভিত্তিক সমাজ গঠনের শিক্ষা দেয়। লালন তাঁর গান ও সাধনার মধ্য দিয়ে মানুষের প্রকৃত পরিচয় খুঁজেছেন। ধর্ম, বর্ণ, জাতপাত কিংবা সামাজিক অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করাই ছিল তাঁর দর্শনের মূল কথা। তিনি আরো বলেন, লালনের গান শুধু বিনোদনের বিষয় নয়, তাঁর গান মানুষের আত্মোপলব্ধি, মনন ও মানবিক চেতনা জাগ্রত করার শক্তি রাখে। লালন সাঁইয়ের দর্শন কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, সম্প্রদায় কিংবা গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর গান ও বাণী সব মানুষের জন্য। বিভেদ, বিদ্বেষ ও সংকীর্ণতার পরিবর্তে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সম্প্রীতির চর্চা করতে হলে লালনের জীবনদর্শন থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
অনুষ্ঠানের সভাপতি বলেন, প্রতিবছর লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস উপলক্ষে ছেঁউড়িয়ায় এ উৎসবের আয়োজন করা হয়। লালনের গান ও দর্শনের মধ্য দিয়ে মানবতা, সাম্য এবং অসাম্প্রদায়িকতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য। লালন তাঁর গানে জাতি, ধর্ম ও বর্ণের বিভেদ অতিক্রম করে মানুষের পরিচয় ও আত্মঅন্বেষণের কথা বলেছেন। তাঁর দর্শনে মানুষের মর্যাদা ও মানবতাই প্রাধান্য পেয়েছে। এবারের উৎসবেও সেই দর্শনের টানে ছেঁউড়িয়ায় জড়ো হন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও ধর্মের মানুষ। লালনসংগীত, সাধনা ও দর্শনকে ঘিরে তিন দিন ধরে মুখর ছিল আখড়া ও মাজার প্রাঙ্গণ।
উল্লেখ্য, লালন সাঁই তাঁর গান ও দর্শনের মধ্য দিয়ে জাতি, ধর্ম ও বর্ণের বিভেদ অতিক্রম করে মানবতার কথা বলেছেন। তাঁর সাম্যবাদী ও মানবতাবাদী দর্শন লাখো মানুষকে অনুপ্রাণিত করছে। মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’ বাউল সাধক লালন সাঁইয়ের আত্ম অন্বেষণের এই অমেয় বাণীর মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে মানবজীবনের সব সাধনার উৎস। মানবাত্মার প্রকৃত মুক্তির পথ। সেই পথ ধরে যারা আজও জ্ঞান সাধনায় রত, তারাই মিলিত হয়েছিলেন তিন দিনের লালন তিরোধান দিবসে। ভক্তদের ভিড়, সাধকের সাধনা, জ্ঞানের অন্বেষণ আর লালনের গানে মুখরিত হয়ে উঠেছিল লালনের স্মৃতি বিজড়িত কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার লালনের আখড়া। দেশি-বিদেশি পর্যটক, বাউল, সাধক আর ভক্তদের মিলন মেলায় পরিণত হয়েছিল আখড়া প্রাঙ্গণ। লালনের আত্ম অন্বেষণের দীক্ষা নিয়েই যেন তারা বাড়ি ফিরেছেন। ধর্ম-বর্ণ, শ্রেণি-পেশা, ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এই উৎসবে অংশ নেন। উৎসবে এসে লালন সাঁইয়ের মর্মবাণীই বারবার ধ্বনিত হয়েছে তাদের অন্তরে।









