ছেঁউড়িয়ায় লালন স্মরণোৎসব শুরু
কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ মরমি সাধক ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস আজ ১৭ অক্টোবর (১ কার্তিক)। এ উপলক্ষে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেউড়িয়ায় ‘বারামখানা’খ্যাত সাঁইজির বিখ্যাত আখড়াবাড়িতে তিন দিনব্যাপী আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও লালন মেলার আয়োজন করেছে লালন একাডেমি। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় আয়োজিত এ অনুষ্ঠান সফল করতে ইতোমধ্যে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন আয়োজকরা। বসছে সাধুর হাট; লালনভক্ত ও পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণ।
আজ বিকেল ৩টায় আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করবেন সংস্কৃতিবিষয়ক বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। সম্মানিত অতিথি থাকবেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন হাসানের সভাপতিত্বে মূখ্য আলোচক থাকবেন প্রাবন্ধিক প্রফেসর ড. রশিদুন নবী। অনুষ্ঠানমালা চলবে আগামী সোমবার মধ্যরাত পর্যন্ত। গতকাল শুক্রবার বিকেলে প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি মো. তৌহিদ বিন হাসান। এদিন সন্ধ্যা ৫টায় লালন সংগীতানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। স্বাগত বক্তব্য দেবেন লালন সাধক হৃদয় শাহ ও মিঠু আসমা খান।
আগামীকাল রবিবার (১৮ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় আলোচনা অনুষ্ঠান হবে। প্রধান অতিথি থাকবেন খুলনা বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল্লাহ হারুন। অতিথি হিসেবে থাকবেন বিশিষ্ট কবি, লেখক ও চিত্রকর ফরহাদ মজহার। প্রধান আলোচক প্রাবন্ধিক প্রফেসর ড. শেখ খালিদ হাসান।
এদিন বিশেষ অতিথিদের মধ্যে রয়েছেন ডিআইজি খুলনা রেঞ্জের মো. রেজাউল করিম, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মো. আমিনুল ইসলাম, কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিনসহ অন্যরা। আলোচনা করবেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক প্রফেসর ড. রশিদুজ্জামান।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় সমাপনী আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। প্রধান অতিথি থাকবেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জনাব অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, এমপি। প্রধান আলোচক প্রাবন্ধিক প্রফেসর ড. আহমেদ শফিকুল হাসমী।
বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মো. আমিনুল ইসলাম, সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরী এবং কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্য সচিব জাকির হোসেন সরকার। আলোচক হিসেবে থাকবেন নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. খালেদ উজ্জামান।
এদিকে ফকির লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবসকে কেন্দ্র করে সপ্তাহখানেক আগে থেকেই হাজারো লালনভক্ত-অনুসারী ছেঁউড়িয়ায় ভিড় জমিয়েছেন। কালী নদীপাড়ের মাঠে বসেছে গ্রামীণ মেলা। সন্ধায় গুরুকার্যের মধ্যদিয়ে শুরু হবে ফকির – সাধকদের অষ্টপ্রহর ব্যাপী সাধুসঙ্গ। এরপর রাখালসেবা ও মধ্যরাতে অধিবাসের পর আগামীকাল রোববার সকালে বাল্যসেবা ও দুপুরে পূর্ণসেবার মধ্যদিয়ে শেষ হবে সাধুসঙ্গ। এ তথ্য জানিয়েছেন আখড়াবাড়ির খাদেম মোহাম্মাদ আলী শাহ।
সরেজমিন দেখা যায়, আখড়াবাড়ির আঙিনায় বাউলভক্ত-অনুসারী তাঁবু গেড়ে আস্তানা তৈরি করেছেন। পৃথক এসব আস্তানার মধ্যে অবস্থান নেওয়া বাউলরা একতারা-দোতারাসহ নানা বাদ্যের তালে গেয়ে চলেছেন লালন সাঁইয়ের রচিত গান। কালী নদীপাড়ের মাঠের দক্ষিণে তৈরি করা হয়েছে মঞ্চ এবং উত্তরে বসেছে নানা পণ্যসামগ্রীর দোকান। এ ছাড়া লালন শাহের সমাধির পাশের উন্মুক্ত শেডের নিচেও বসেছেন দূরদূরান্ত থেকে আসা ভক্ত-অনুসারীরা। সেখানেও চলছে লালনের গান; আলোচনা হচ্ছে ফকির লালনের অমর সব বাণী নিয়ে।
কুমিল্লা থেকে আগত লালন অনুসারী মোমিন সাধু জানান, এবার সাঁইজির ভক্ত হোচেন আল চিস্তি সাধুর (লালন আখড়া-সংলগ্ন) আস্তানায় থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে স্থানীয় ভক্ত-অনুসারীসহ বহিরাগত ভক্ত-অনুসারীরাও যোগ দেবেন। তিনি বলেন, এখানে আসি মূলত নিরিবিলি পরিবেশে সাঁইজির মর্মবাণী চর্চাসহ ভক্তদের উজ্জীবিত করা ও পরস্পর ভাব বিনিময়ের জন্য।
কেন আসেন? কি পেয়েছেন? এমন প্রশ্ন করতেই “ মানুষ ভোজলে সোনার মানুষ হবি” গেঁয়ে উঠেন সিরাজগঞ্জের বেলকুচি থেকে আগত আনান ফকির (৪৫)। তিনি বলেন, ‘ এখানে আসতে কাউকে নিমন্ত্রণ করা লাগেনা। টাকাও দেওয়া লাগেনা। সাঁইজির প্রেমের টানে ছুটে আসে। সাঁইজির মানবধর্মের বাণী প্রচার করেন।
১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর ছেঁউড়িয়ার এই আখড়াবাড়িতে দেহত্যাগ করেন ফকির লালন সাঁই। তাঁর গান ও দর্শন আজও মানুষকে আত্মপরিচয়, মানবতা এবং পরম সত্যের অনুসন্ধানে অনুপ্রাণিত করে। ‘মিলন হবে কত দিনে’, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’ ও ‘জাত গেল জাত গেল বলে’—এমন অসংখ্য গানে তিনি জাত, দেহ, মন, আত্মা, গুরু ও পরম সত্তার সম্পর্ক তুলে ধরেছেন।
লালনের দর্শনের অন্যতম দিক হলো জাতপাত ও ধর্মীয় বিভেদের ঊর্ধ্বে মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। তাঁর অনুসারীদের মতে, হানাহানি ও অসহিষ্ণুতার এই সময়ে সম্প্রীতি ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠায় লালনের দর্শন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।
লালন গবেষক হৃদয় সাহা বলেন, লালনের আধ্যাত্মিক গান আত্মশুদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের পথ দেখায়। বর্তমান সময়ে হানাহানি ও অসহিষ্ণুতা দূর করতে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তাঁর মানবতাবাদী দর্শন সঠিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি। শুধু উৎসবের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে লালনের দর্শন নিয়ে গবেষণা ও চর্চা বাড়াতে হবে।
স্মরণোৎসব উপলক্ষে মরা কালীগঙ্গা নদীর তীরে আখড়াবাড়ির পাশে তৈরি করা হয়েছে বিশাল মঞ্চ। পাশাপাশি বসেছে গ্রামীণ মেলা। সেখানে নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। আগামীকাল শনিবার সন্ধ্যা থেকে মঞ্চে লালনসংগীত পরিবেশনা ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। সাধুসঙ্গ ও মরমি গানের পাশাপাশি মেলাকে ঘিরেও দর্শনার্থীদের মধ্যে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
উৎসব নির্বিঘ্ন করতে আখড়াবাড়ি ও আশপাশের এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা, যানবাহন চলাচল ও সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রস্তুতি নিয়েছে প্রশাসন। আজ শুক্রবার বিকেলে মাজার প্রাঙ্গণ ও মেলার স্থান পরিদর্শন করেন কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম ও জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসান।
জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি তৌহিদ বিন হাসান বলেন, লালনের তিরোধান দিবসের স্মরণোৎসব শুধু কুষ্টিয়ার নয়, বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি, মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এ উপলক্ষে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধু, ভক্ত ও দর্শনার্থীরা লালনধামে সমবেত হন।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে।









