বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া শহর থেকে ঝিনাইদহগামী মহাসড়কটি বটতৈল মোড় পর্যন্ত চারলেন। ঝকঝকে সড়কটির আইল্যান্ডে ফুটে আছে রং-বেরংয়ের বাহারি নানা রকম ফুল। এরই মাঝে বিষফোড়া হয়ে আছে শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিআরবি গ্রুপের সামনের আধা কিলোমিটার সড়ক। এতে নিয়মিত ভোগান্তি ও দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন চলাচলকারীরা।
জানা যায়, ৯৯ শতক জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের জেরে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকায় একপাশের দুই লেন সড়কের কাজ আজও শেষ হয়নি। ফলে ব্যস্ত এই মহাসড়কের ওই অংশে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন লাখো মানুষ। আর ঘটছে ছোট-বড় নানা দুর্ঘটনা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের অন্যান্য অংশে চার লেনের সুবিধায় যানবাহন স্বাভাবিকভাবে চলাচল করছে। কিন্তু বিআরবি কেবলসের সামনে এসে দুই লেনের নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় উভয়মুখী যানবাহনকে একই অংশ দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে হঠাৎ লেন পরিবর্তন এবং মুখোমুখি সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। যানবাহনের চাপ বাড়লেই সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট, ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রী ও চালকেরা।
অসুবিধার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে সড়ক ও জনপথ বিভাগ সেখানে একটি সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড দিয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, দূর থেকে সেটি চালকদের সহজে চোখে পড়ে না। দিনের তুলনায় রাতে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। পর্যাপ্ত আলো, স্পষ্ট লেন বিভাজন ও দৃশ্যমান সতর্কতামূলক ব্যবস্থা না থাকায় যে-কোনো সময় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কের এ অংশে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটে। নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর মধ্যে ২০২৩ সালের ২০ আগস্ট ওই অংশে দুর্ঘটনায় এক যুবক নিহত হন। এরপর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বিআরবি কেবলসের সামনে ট্রাক-লরির ধাক্কায় মোটরসাইকেলের দুই আরোহী গুরুতর আহত হন। পরে তাদের একজন মারা যান। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব তথ্য কেবল নথিভুক্ত দুর্ঘটনার হিসাব। ছোটোখাটো অনেক দুর্ঘটনার কোনো রেকর্ড থাকে না।
এই সড়কে নিয়মিত মোটরসাইকেল চালিয়ে কুষ্টিয়া কোর্টে আসেন মোকাদ্দেস আলী। তিনি বলেন, দ্রুতগতির সড়কে নিয়মিত বিভ্রান্তিতে পড়েন অপরিচিত যাত্রীরা। আর সেই ঝুঁকি এসে পড়ে আমাদের ওপর। জীবন হাতে নিয়ে ওই আধাকিলোমিটার পাড়ি দিতে হয়। এ ছাড়া সড়কের দুইপাশে অবৈধ পার্কিং তো আছেই।
ট্রাকচালক রোকন বলেন, চালকদের জন্য এটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক। এখানে মাঝেমধ্যেই ছোটোখাটো দুর্ঘটনা ঘটতে দেখি।
সেখান খাবারের হোটেল ব্যবসায়ী মোস্তফা কামাল পাশা বলেন, এমন কোনো সপ্তাহ নেই, যে সপ্তাহে দুর্ঘটনাকবলিত মানুষদের উদ্ধার করতে দৌড়াতে হয় না। কত মানুষ যে চোখের সামনে গুরুতর আহত হয়েছে তার ঠিক নেই। এসব দৃশ্য দেখাও কষ্টকর।
সেখানে এক আওয়ামী লীগ নেতা ৯৯ শতক জমির মালিকানা দাবি করে রিট করলে সড়কের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। হাইকোর্টে সর্বশেষ চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল তারিখের আদেশে আগের স্থিতাবস্থার আদেশ আরও ছয় মাসের জন্য বহাল রাখা হয়েছে। ফলে আদেশের মেয়াদ অনুযায়ী চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ওই স্থিতাবস্থা কার্যকর থাকার কথা।
হাইকোর্টের আদেশের কপি অনুযায়ী, কুষ্টিয়ার জগতি এলাকার রেজাউল হক এ বিষয়ে রিট পিটিশন দায়ের করেন। মামলায় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক, সওজের কুষ্টিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী এবং কুষ্টিয়া সদর সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) বিবাদী করা হয়েছে।
রিটে বলা হয়েছে, কুষ্টিয়া সদর থানার জগতি মৌজায় সিএস খতিয়ান ২৭, এসএ খতিয়ান ৩১ এবং আরএস খতিয়ান ৪৪-এর আওতাধীন জমির মধ্যে ৭০৪ ও ৭০৫ নম্বর দাগ এবং আরএস ৭৯৯ নম্বর দাগে থাকা ৯৯ শতক জমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। ওই জমির ওপর দিয়ে ড্রেন নির্মাণের উদ্যোগকে অবৈধ ও স্বেচ্ছাচারী দাবি করে আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়।
তবে এই বিষয়ে রিটকারী রেজাউল হকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কের কাজ বন্ধ থাকায় ক্ষোভ জানিয়েছেন কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্যসচিব ইঞ্জিনিয়ার জাকির হোসেন সরকার। তিনি বলেন, এটা খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত একটি ঘটনা। আমরা সন্দেহ করছি, সেখানে সরকার পক্ষের আইনজীবী সঠিকভাবে কাজ করছেন না। তাদের গড়িমসির কারণেই বার বার মামলার ডেট পিছিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে আমরা বারবার কথাও বলেছি, কিন্তু কোনো সমাধান হচ্ছে না। তারা না পারলে আমাদের বললে আমরা সঠিক আইনজীবী ঠিক করব।
তিনি আরও বলেন, মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সুযোগ নেই। একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের কাজ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় মানুষের দুর্ভোগ ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
জনদুর্ভোগের বিষয়টি স্বীকার করে কুষ্টিয়া সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আনোয়ার পারভেজ বলেন, ‘উচ্চ আদালতের স্থিতাবস্থা বজায় থাকার কারণে তারা গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কের কাজ শেষ করতে পারছেন না। যে ৯৯ শতাংশ জমি নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা চলছে সেটি কুষ্টিয়া জেলা পরিষদ তাদের নিজস্ব জমি বলে দাবি করে আসলেও তার স্বপক্ষে কোন কাগজ-পত্র দেখাতে পারেনি। যে কারণে সরকার পক্ষ পর পর দুবার মামলায় পরাজিত হয়েছে। আবার প্রকল্পটির মেয়াদও অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। করণীয় নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী মহোদয়ের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
তিনি আরও জানান, এছাড়াও নতুন করে মহাসড়কের এ কাজ করতে হলে প্রয়োজনীয় ফান্ড লাগবে। আবার উচ্চ আদালতের চলমান মামলাটির নিষ্পত্তি হতে হবে। সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় বলা যায় জমি অধিগ্রহণ করা ছাড়া বাকি কাজ শেষ করা হয়ত সম্ভব হবে না।









