বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়াবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। বৃহত্তর কুষ্টিয়াসহ আশপাশের জেলার মানুষের উন্নত চিকিৎসার অন্যতম বড় ভরসা এই প্রতিষ্ঠান। তবে হাসপাতালটি পুরোপুরি স্বাভাবিক কার্যক্রমে যাওয়ার আগেই এর আশপাশে একের পর এক বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে ওঠায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি দুই হাসপাতালের একেবারে কাছাকাছি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে রোগী ভাগিয়ে নেওয়া, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং চিকিৎসা ব্যয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
এরই মধ্যে কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল ও কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আশপাশে গড়ে ওঠা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান, অনুমোদন ও লাইসেন্স নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের প্রধান গেটের আশপাশে খুব কাছাকাছি একাধিক বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, হাসপাতালের গেট থেকে ১০০ মিটারের মধ্যেই রয়েছে একাধিক প্রতিষ্ঠান। হাসপাতালের সামনের সড়ক ও সংলগ্ন এলাকাতেও গড়ে উঠেছে বিভিন্ন বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান।
এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো দূরত্বের নিয়ম রয়েছে কি না। বিভিন্ন সময়ে সরকারি হাসপাতাল থেকে এক কিলোমিটার এবং বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৫০০ মিটার দূরত্ব বজায় রাখার কথা বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কিন্তু কুষ্টিয়ার বাস্তব চিত্রের সঙ্গে এসব নির্দেশনার সামঞ্জস্য কতটুকু, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালের এত কাছাকাছি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থাকায় রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
হাসপাতালের ভেতর থেকে শুরু করে গেটের বাইরে পর্যন্ত দালালদের মাধ্যমে রোগী ও স্বজনদের বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করার অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার কথা বলে রোগীদের পাশের বেসরকারি ক্লিনিক কিংবা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন কয়েকজন রোগীর স্বজন। একজন রোগীর স্বজন বলেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে অনেক সময় কোন পরীক্ষা কোথায় করানো হবে তা বুঝে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে।
হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পর বিভিন্ন ব্যক্তি এসে নানা পরামর্শ দেন। শেষ পর্যন্ত তাদের কথামতো পাশের কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। সরকারি হাসপাতালকে ঘিরে দালালদের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০২০ সালে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পিপিই পরে চিকিৎসকের পরিচয়ে রোগী দেখার সময় একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এক দালালকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালত কারাদণ্ড দিয়েছিল বলে সে সময় সংবাদ প্রকাশিত হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতেও হাসপাতালটিতে দালালদের দৌরাত্ম্য ও রোগী হয়রানি নিয়ে অভিযান এবং সংবাদ প্রকাশের ঘটনা ঘটে।
এরপরও বিভিন্ন সময়ে হাসপাতালকেন্দ্রিক দালালচক্র নিয়ে অভিযোগ ওঠায় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, অভিযান ও জরিমানার পরও যদি একই পরিস্থিতি থেকে যায়, তাহলে এর স্থায়ী সমাধান কোথায়। শুধু দালাল নয়, সরকারি হাসপাতালের কিছু চিকিৎসকের বিরুদ্ধেও নিজেদের পছন্দের বেসরকারি ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগীদের পরীক্ষা করাতে উৎসাহিত করার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সেবাগ্রহীতা। নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা না করালে চিকিৎসা নিয়ে জটিলতার কথা বলা হয় বলেও কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন। আবার সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কিছু চিকিৎসক হাসপাতালের আশপাশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চেম্বার করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে নির্দিষ্ট চিকিৎসক বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান মানা হচ্ছে কি না, সেটিও কর্তৃপক্ষের নজরদারির বিষয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু জেনারেল হাসপাতাল নয়, কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের আশপাশেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। হাসপাতালের খুব কাছাকাছি ইতোমধ্যে কয়েকটি বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। আরও কিছু প্রতিষ্ঠান তৈরির প্রক্রিয়ায় রয়েছে বলেও স্থানীয়দের দাবি।
তাদের আশঙ্কা, এখনই এসব প্রতিষ্ঠানের অবস্থান, অনুমোদন, লাইসেন্স, অবকাঠামো, জনবল ও অন্যান্য শর্ত যাচাই করা না হলে ভবিষ্যতে হাসপাতালের চারপাশে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তখন রোগী ভাগানো ও দালালচক্র নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে পড়বে। অবশ্য বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকদের বক্তব্য ভিন্ন। কুষ্টিয়ার বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আরাফাত জামান তপন বলেন, সরকারি হাসপাতাল থেকে ঠিক কত মিটার দূরে বেসরকারি ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপন করতে হবে, সেটি তাদের কাছেও পরিষ্কার নয়।
বিষয়টি জানার জন্য তারা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে একাধিকবার যোগাযোগ করেছেন। যে নিয়মই থাকুক, তারা নিয়ম মেনেই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে চান। তবে দায়িত্ব কার—এ প্রশ্নে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর বক্তব্যেও ভিন্নতা দেখা গেছে। কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডা. শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, বিষয়টি শুধু সিভিল সার্জন কার্যালয়ের এককভাবে দেখার বিষয় নয়। জনবল সংকট রয়েছে। এর সঙ্গে পৌরসভা, পরিবেশ অধিদপ্তর, কলকারখানা অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন দপ্তর জড়িত। সমন্বয়ের মাধ্যমে এসব বিষয় দেখভাল করা প্রয়োজন।
কুষ্টিয়া পৌরসভার সচিব মেহেদি হাসান বলেন, হাসপাতাল থেকে কত মিটার দূরে ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপন করা যাবে, সেটি পৌরসভার জানা নেই। পৌরসভা মূলত ভবনের বিষয় এবং ট্রেড লাইসেন্সের মতো নিজ নিজ এখতিয়ারভুক্ত বিষয় দেখে। পরিবেশ অধিদপ্তরের কুষ্টিয়া জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. এমদাদুল হক বলেন, পরিবেশগত বিষয় যাচাই করে ছাড়পত্র দেওয়া তাদের দায়িত্ব। তবে সরকারি হাসপাতাল থেকে কত মিটার দূরে বেসরকারি ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপন করা যাবে, সেটি তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না।
ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, হাসপাতাল থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপনের বিষয়টি তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জনের বক্তব্য নেওয়ার কথা বলেন। এ সময় তার সামনেই থাকা কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জনের কাছে বিষয়টি জানতে চাওয়া হলে সিভিল সার্জন পৌরসভার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, পৌরসভা যখন লাইসেন্স দেয় তখন এসব বিষয় যাচাই করা উচিত।
তবে অতিরিক্ত মহাপরিচালক তখন বলেন, সরকারি হাসপাতাল থেকে নির্ধারিত দূরত্বে বেসরকারি ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার হচ্ছে কি না, সেটি স্বাস্থ্য বিভাগের জেলা পর্যায়ের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। পৌরসভার দায়িত্ব মূলত ভবন ও ট্রেড লাইসেন্সের মতো বিষয় দেখা। এ সময় সিভিল সার্জনের পক্ষ থেকে বলা হয়, এ বিষয়ে নির্ধারিত কোনো আইন নেই। এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যদি নির্দিষ্ট কোনো আইন বা নির্দেশনা না থাকে, তাহলে বিভিন্ন সময়ে সরকারি হাসপাতাল থেকে ৫০০ মিটার কিংবা এক কিলোমিটার দূরত্ব বজায় রাখার কথা কীসের ভিত্তিতে বলা হয়েছে?
আবার বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ ধরনের নির্দেশনার কথা কীভাবে প্রকাশিত হয়েছে? অতিরিক্ত মহাপরিচালক আরও জানান, সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে একটি অনুশাসন এসেছে। সেটি এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন পর্যায়ে যায়নি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি। কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন-হাসান বিষয়টিকে টেকনিক্যাল বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এটি দেখার দায়িত্ব মূলত সিভিল সার্জনের। তবে তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর সিভিল সার্জনকে সঙ্গে নিয়ে এ বিষয়ে একটি অভিযান পরিচালনা করেছেন। প্রয়োজনে আবারও অভিযান পরিচালনা করা হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্লাড ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের দায়িত্বের কথা উল্লেখ রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, লাইসেন্স দেওয়ার আগে একটি প্রতিষ্ঠানের অবস্থান, ভবন, জনবল, যন্ত্রপাতি, পরিবেশগত ছাড়পত্র, অগ্নিনিরাপত্তা এবং সরকারি হাসপাতালের কাছাকাছি অবস্থানের মতো বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে যাচাই করা হয় কি না। স্থানীয় রোগী ও স্বজনদের দাবি, কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ঘিরে এখনই কার্যকর নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।
হাসপাতালের আশপাশে যাতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে একের পর এক বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে না ওঠে, সে বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগ চান তারা। একজন রোগীর স্বজনের ভাষায়, “সরকারি হাসপাতালে দালালের হাত থেকে বাঁচতে পারছি না। এখন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনেও যদি একই ব্যবস্থা তৈরি হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?” স্থানীয়দের দাবি, সরকারি হাসপাতালের আশপাশে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অবস্থান, অনুমোদন ও লাইসেন্সের বৈধতা যাচাইয়ের পাশাপাশি দালালচক্রের বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ বিষয়টি শুধু কোনো প্রতিষ্ঠান হাসপাতাল থেকে কত দূরে—এ প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সরকারি হাসপাতালের রোগী সুরক্ষা, দালালমুক্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা, চিকিৎসাসেবার স্বচ্ছতা এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের বিষয়।









