ইবি প্রতিনিধি ॥ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) শাখা শিবিরের এক নেতাকে ছাত্রদল কর্মীর থাপ্পড় দেয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে জামায়াত-শিবির ও বিএনপি-ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে কমপক্ষে ২ জন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এ ঘটনায় তদন্তে ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
শহিদ জিয়াউর রহমান হলের দুইজন ছাত্রের মধ্যে সংঘঠিত ঘটনা তদন্তের জন্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করেন। কমিটিতে লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সেলিমকে আহ্বায়ক এবং অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মোস্তফা আরীফ ও ফলিত রাসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মামুন আল রশীদকে সদস্য করা করা হয়েছে। উক্ত কমিটিকে সুষ্ঠু তদন্ত করে আগামী ৭২ ঘন্টার মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য নির্দেশ দেয় প্রশাসন।
গতকাল শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) বেলা ৩টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলে এ ঘটনা ঘটে। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চলছে। জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের জিয়া হল সেক্রেটারি জুহায়ের হোসেনকে থাপ্পড় মারেন শাখা ছাত্রদলের সদস্য আলীনূর রহমান। জুহায়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের দাওয়াহ বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং আলীনূর আরবি বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। এ ঘটনার পর ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে শহীদ জিয়া হলে আসেন। সেখানে ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা-কর্মীও উপস্থিত হন। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়।
পরে আলীনূর হলের ২১৭ নম্বর কক্ষে অবস্থান নেন। পরে বিষয়টি সমাধানের জন্য জিয়া হলের প্রভোস্টের কক্ষে আলোচনায় বসেন ভুক্তভোগী জুহায়েরসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান, হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. সেলিম রেজা, শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি রাশেদুল ইসলাম রাফি, ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক সাহেদ আহমেদ, আহ্বায়ক মাসুদ রুমী মিথুন ও সদস্যসচিব রাফিজ আহমেদসহ অন্যান্য নেতা-কর্মী। এ সময় কক্ষের বাইরে শিবিরের নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। পরে প্রক্টরিয়াল বডির নেতৃত্বে আলীনূরকে আনতে গেলে ফের উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
কক্ষটি তালাবদ্ধ থাকায় তাঁকে সেখান থেকে বের করা সম্ভব হয়নি। এদিকে আলীনূরকে উপস্থিত করতে না পারা এবং শিবিরের নেতা-কর্মীরা উত্তেজনা সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ তুলে ছাত্রদলের নেতারা আলোচনা থেকে উঠে চলে যান। এ সময় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে আবারও ধাক্কাধাক্কি ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ ও প্রক্টরিয়াল বডির নেতৃত্বে তাঁকে হল থেকে উদ্ধার করে সরিয়ে নেওয়া হয়। এ সময় শিবিরের নেতা-কর্মীরা আলীনূরের ওপর চড়াও হন এবং প্রক্টরের গাড়িতে ইট নিক্ষেপ করেন। এ সময় ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে জিয়া মোড়ে অবস্থান নেন।
ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে অবস্থান নেন। এ সময় ছাত্রদল প্রধান ফটক বন্ধ করে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রক্টরিয়াল বডির পাশাপাশি অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চলছে। এ বিষয়ে শাখা ছাত্রশিবিরের জিয়া হল সেক্রেটারি জুহায়ের হোসেন বলেন, আমি ক্লাস শেষে অনুষদে অবস্থান করছিলাম। হঠাৎ আলীনূর এসে আমাকে থাপ্পড় মারে এবং গালাগালি করে। পরে কেন আমাকে মারল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার ইচ্ছা হয়েছে, তাই মেরেছি। আপনি কী করতে পারেন করেন।’
আমি তাঁর স্থায়ী বহিষ্কার দাবি করছি। পাশাপাশি তিনি হলের অবৈধ শিক্ষার্থী। তাঁকে হল থেকে বের করে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করতে হবে। অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা আলীনূর রহমান বলেন, ‘আমি তাঁর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁকে বেয়াদব বলি। পরে তিনি আমাকে গালি দেন। এ সময় আমি তাকে থাপ্পড় দিই। তবে তার সঙ্গে আমার আগে কোনো সমস্যা ছিল না।’ শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি রাশেদুল ইসলাম রাফি বলেন, ‘আমরা এ ঘটনার বিচার চাই। বিষয়টি সমাধানের জন্য আমরা আলোচনায় বসেছিলাম। কিন্তু ছাত্রদল কর্মী রাহী আমাদের নেতা-কর্মীদের গালাগালি করায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
পরে ছাত্রদলের নেতারা সমঝোতার আলোচনা থেকে বেরিয়ে যান। তাঁরা মূলত বিচার চান না।’ শাখা ছাত্রদলের সদস্যসচিব রাফিজ আহমেদ বলেন, ‘আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, ‘ঘটনার খবর পেয়ে আমরা তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে যাই এবং উভয় পক্ষকে শান্ত করার চেষ্টা করি। পরে পুলিশের সহযোগিতায় অভিযুক্তকে নিরাপদে প্রক্টর অফিসে নিয়ে আসি। উভয় পক্ষকে নিয়ে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করছি।’
কুষ্টিয়া জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ফয়সাল মাহমুদ বলেন, ‘এখানে দুই পক্ষের মাঝে একটা ইস্যুকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। আমরা পুলিশ এসে বিষয়টা দুই পক্ষের সাথে কথা বলে এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে বর্তমানে একটা স্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করিয়েছি। তারপরেও আমরা আমাদের অবস্থান এখানে রেখেছি যাতে পরবর্তীতে এটা আরও উত্তপ্ত না হয়।’
এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর বলেন, ‘যে ঘটনা ঘটেছে তার একটি প্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। আগামী ৭২ ঘন্টার মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলেছি। এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়াও বহিরাগত প্রবেশ নিষিদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে।









