বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতাকে ঘিরে ক্ষমতার সময়কালে ব্যাপক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছিল তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক ফরহাদ হোসেনের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, শুধু গাড়ি চালানোর দায়িত্বেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না ফরহাদ বরং সাবেক চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে উপজেলা পরিষদে অঘোষিতভাবে এপিএসের ভূমিকা পালন করতেন তিনি। তার প্রভাব এতটাই ছিল যে, উপজেলা পরিষদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রশাসনিক বিষয়েও তিনি হস্তক্ষেপ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে ফরহাদ অল্প সময়ের মধ্যে সম্পদ ও জীবনযাপনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনেন।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের অভিযোগ, সাবেক চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন ফরহাদ। চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি পরিচয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ, উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন কাজের বিষয়ে প্রভাব বিস্তার এবং মালামাল সরবরাহের মতো কর্মকাণ্ডেও তার সম্পৃক্ততা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনৈতিক সম্পর্ক ও প্রতারণার গুঞ্জন
উপজেলা পরিষদের কয়েকজন কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তৎকালীন সময়ে ফরহাদ গাড়িচালক হলেও অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ওপর প্রভাব বিস্তার করতেন। এমনকি উপজেলা পরিষদের সরকারি কোয়ার্টার কার নামে বরাদ্দ হবে, সে বিষয়েও তিনি নির্দেশনা দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ আছে, সরকারি চাকরিতে না থেকেও তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তি উপজেলা পরিষদের কোয়ার্টারে বসবাসের সুযোগ পেয়েছিলেন।
উপজেলা পরিষদের কোয়ার্টারে ফরহাদ যে বাসায় বসবাস করেন, সেখানেও তার আর্থিক সামর্থ্যের পরিবর্তনের ছাপ দেখা যায় বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। বাসার বারান্দায় থাই গ্লাসসহ বিভিন্ন সাজসজ্জা এবং দামি আসবাবপত্র ব্যবহারের কথাও জানিয়েছেন তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা পরিষদের এক কর্মচারী বলেন, সাবেক চেয়ারম্যান আতার সময়ে ফরহাদের প্রভাব ছিল অনেক বেশি। তার ভাষ্য, ফরহাদ আতার অনেক কাজের টাকা লেনদেন করত। অফিসে তার দাপটের কারণে আমরা অনেক সময় কথা বলতে পারতাম না। কোনো কাজে সামান্য ভুল হলেও আতার কাছে অভিযোগ করে চাকরি খাওয়ার হুমকি দেওয়া হতো।
ওই কর্মচারীর অভিযোগ, উপজেলা পরিষদের ছোটখাটো বিভিন্ন কাজের মালামালও ফরহাদ সরবরাহ করতেন। কম দামে মালামাল কিনে বেশি দামে বিল করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
উপজেলা পরিষদের আরেক সাবেক কর্মচারী অভিযোগ করেন, একটি কাজের জন্য ফরহাদ এক লাখ টাকার বেশি মূল্যের কোটেশন দিয়েছিলেন। পরে তৎকালীন ইউএনও তাকে কম মূল্যের কোটেশন দিতে বলেন এবং প্রায় ৫০ হাজার টাকায় কাজটি সম্পন্ন করা হয়।
তার অভিযোগ, কাজ শেষ হওয়ার পর ফরহাদ তার কাছে দুই হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর থেকেই ফরহাদ তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। ওই কর্মচারীর দাবি, ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যেই তাকে চুরির অভিযোগে বরখাস্ত করা হয়।
তিনি বলেন, আমি কোনো অনিয়ম করিনি। ফরহাদের অবৈধ দাবিতে সাড়া না দেওয়ায় আমাকে মিথ্যা অভিযোগে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে আমি মনে করি।
ফরহাদের বিরুদ্ধে উপজেলা পরিষদের সরকারি গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। এ বিষয়ে এর আগে প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময় ফরহাদ হোসেনের বক্তব্য ছিল, কিছু যন্ত্রাংশ গ্যারেজে পড়ে থাকলে নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় তিনি সেগুলো বিক্রি করেছেন। সরকারি যন্ত্রাংশ বিক্রির অনুমতি ছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি নিয়ে আপত্তিকর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানান বলে প্রতিবেদকের দাবি।
ইতিপূর্বে কুষ্টিয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পার্থ প্রতিম শীল ফরহাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ থাকলে তা প্রকাশ করার কথা জানিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে প্রমাণ পেলে প্রশাসনিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও তিনি বলেছিলেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতার রাজনৈতিক প্রভাব কমে গেলেও ফরহাদের প্রভাব পুরোপুরি কমেনি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। বরং এবার বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তির আত্মীয় পরিচয়ে তিনি উপজেলা পরিষদ এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও ওই ব্যক্তির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক যোগাযোগ ছিল এবং সেই সময়েই ফরহাদের চাকরি পাওয়ার পেছনে তার ভূমিকা ছিল বলে এলাকায় আলোচনা রয়েছে।
এদিকে ফরহাদ হোসেনের বিরুদ্ধে একাধিক নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক ও প্রতারণার অভিযোগের গুঞ্জনও ছড়িয়েছে। কয়েকটি সূত্রের দাবি, উঠতি বয়সী নারীদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে সম্পর্ক তৈরি এবং পরবর্তীতে তাদের ব্যক্তিগত দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হয়। এমনকি ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করে তা ব্যবহার করে নারীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর হওয়ায় কোনো নারী ভুক্তভোগীর নাম বা পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রতিবেদক দলের অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে ফরহাদ হোসেনের সঙ্গে প্রতিবেদকের কথা হয়। নারীদের সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগের বিষয়ে তিনি প্রথমে কিছু কথা স্বীকার করলেও পরবর্তীতে তা অস্বীকার করেন। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি নিয়ে সুপারিশ করার চেষ্টা করা হয় বলে প্রতিবেদকের দাবি।
সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং তার হয়ে কাজ করার অভিযোগ প্রসঙ্গে ফরহাদ বলেন, ওই সময় তিনি তেমন কিছু করতে পারেননি।
ফরহাদ হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে কুষ্টিয়া সদর উপজেলা পরিষদের বর্তমান নির্বাহী কর্মকর্তা হারুন অর রশিদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।









