ইবি প্রতিনিধি ॥ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা হত্যা মামলা নতুন মোড় নিয়েছে। হত্যার পর কর্মচারী ফজলুর রহমান ভেতর থেকে আবদ্ধ কক্ষে হাতেনাতে ধরা পড়ে খুনের দায় স্বীকার করলেও পরে কারাগারে গিয়ে নিজের অবস্থান পুরোপুরি বদলে ফেলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, দুই মুখোশধারী ব্যক্তি ওই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
তবে তদন্তে পাওয়া তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, ঘটনাস্থলের আলামত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার সঙ্গে তার এ দাবির কোনো মিল পাওয়া যায়নি। জানা গেছে, চলতি বছরের ৪ মার্চ সমাজকল্যাণ বিভাগের নিজ কার্যালয়ে কর্মচারী ফজলুর রহমানের ছুরিকাঘাতে নিহত হন বিভাগের সভাপতি আসমা সাদিয়া রুনা। ঘটনার পর ফজলুর নিজের গলায়ও ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।
পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। হত্যাকাণ্ডের পরদিন নিহত শিক্ষিকার স্বামী ইমতিয়াজুর সুলতান ইবি থানায় ফজলুর রহমানসহ চারজনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার অন্য আসামিরা হলেন, বিভাগের সাবেক উপ-রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস, সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার ও হাবিবুর রহমান। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ফজলুরকে গ্রেফতার দেখায় পুলিশ।
সুস্থ হওয়ার পর গত ১ এপ্রিল তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। মামলার অপর তিন আসামি এখনও পলাতক রয়েছে। পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ফজলুর লিখিতভাবে হত্যার দায় স্বীকার করেন। ওই লিখিত বক্তব্যে তিনি বদলিজনিত ক্ষোভ ও হতাশা থেকে শিক্ষিকা রুনাকে হত্যা করেছেন বলে উল্লেখ করেন। তবে কারাগারে যাওয়ার পর তিনি সেই বক্তব্য থেকে সরে আসেন এবং আদালতেও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে অস্বীকৃতি জানান।
ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি সূত্রে জানা গেছে, কারাগারে গিয়ে কমিটির সদস্যরা প্রায় দুই ঘণ্টা ফজলুরের সাক্ষাৎকার নেন। লিখিত জবাবে তিনি দাবি করেন, শিক্ষিকা রুনা থিসিস পেপার চাইলে তিনি তার কক্ষে গিয়ে দেখেন, দুই মুখোশধারী ব্যক্তি রুনাকে ছুরিকাঘাত করছে। বাধা দিতে গেলে তারা তাকেও আঘাত করে পালিয়ে যায়। এরপর তিনি অচেতন হয়ে পড়েন বলে দাবি করেন। তবে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফজলুরের এ দাবি সিসিটিভি ফুটেজ ও ঘটনাস্থলের আলামতের সঙ্গে মেলেনি।
ফুটেজে ঘটনার সময় ফজলুর ছাড়া অন্য কাউকে বিভাগে ঢুকতে দেখা যায়নি। ফজলুর কক্ষে ঢোকার কিছুক্ষণের মধ্যেই রুনার ‘বাঁচাও বাঁচাও’ চিৎকার শোনা যায়। ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঘটনার দিন বিকাল ৪টা ১ মিনিটে ফজলুর তৃতীয় তলার একটি কক্ষ থেকে পলিথিনে মোড়ানো একটি বস্তু নিয়ে বের হন। পরে কয়েক দফা যাতায়াতের পর বিকাল ৪টা ১০ মিনিটে তিনি রুনার কক্ষের দিকে যান। দুই মিনিট পর রুনার চিৎকার শুনে নিরাপত্তাকর্মী ও শিক্ষার্থীরা গিয়ে কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ অবস্থায় দেখতে পান। পরে তারা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, কক্ষে ঢোকার সময় রুনাকে রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। একইসঙ্গে ফজলুর তখন নিজেই নিজের গলায় ছুরি চালাচ্ছিলেন। ঘটনার ভিডিও তদন্ত কমিটি ও পুলিশের কাছে আলামত হিসেবে রয়েছে। এদিকে ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির সদস্যরা জানান, মুখোশধারীদের উপস্থিতির দাবি করলেও ‘তারা কীভাবে ভেতর থেকে বন্ধ কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল এবং দরজা কে বন্ধ করল?’
এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি ফজলুর। এছাড়া চিকিৎসা শেষে ফজলুর কথা বলতে না পারার বিষয়টিও সন্দেহজনক হিসেবে দেখছে কমিটি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটিতে থাকা একজন বলেন, ফজলু পুরোটা ফিট হয়েও কথা বলতে পারে না এটা বিশ্বাসযোগ্য না। তাকে আমাদের প্রশ্ন করতে যতটা সময় লাগে, তার উত্তর দিতে তার চেয়ে কম সময় লেগেছে। কোন কথার এগেইনেস্টে কোন জবাব দিতে হবে সেটা তার মুখস্থ। মূলত অন্য কেউ তাকে যেভাবে শিখিয়েছে, সে সেভাবেই বলেছে। ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মিজানূর রহমান বলেন, আসামি অভিযোগ অস্বীকার করবে, এটাই স্বাভাবিক।
তবে তার বক্তব্য, তদন্তে পাওয়া তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ ও আলামতের সঙ্গে মিলছে কিনা, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া তিনি অনেকগুলো বিষয়ের সদুত্তর দিতে পারেননি। ইবি থানার ওসি মাসুদ রানা বলেন, প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই তদন্ত এগোচ্ছে। আসামি দায় অস্বীকার করলেও তদন্তে তার কোনো প্রভাব পড়বে না। ঘটনাস্থলের ভিডিওসহ বিভিন্ন আলামত সিআইডিতে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদন হাতে পেলেই চার্জশিট দাখিল করা হবে।









