নিজ সংবাদ ॥ ভারতের কলকাতায় হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত ও তার পরিবারের সদস্যদের মরদেহ নিজ বাড়িতে ফিরেছে। মরদেহবাহী গাড়ি দেবাশীষের বাড়িন সামনে এলে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। গতকাল শনিবার (২২ আগস্ট) রাত সাড়ে ১০ টায় কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়াস্থ বাড়িতে কফিন বন্দি অবস্থায় সাংবাদিক দেবাশীষ, স্ত্রী আফসানা ও তিন বছরের ছেলে শর্ণশিষ-এর মরদেহ এসে পৌঁছায়। আর দেবাশীষ দত্তের শ্বশুর আকরাম আলীর মরদেহ পৌঁছায় শহরের থানাপাড়া এলাকায় নিজ বাড়িতে। মরদেহ নিজ বাড়িতে পৌছানোর খবরে নিহত দেবাশীষ দত্তের আড়ুয়াপাড়াস্থ বাড়িতে হাজার হাজার মানুষ তাকে শেষ বারের মত দেখতে আসেন।
এর আগে, ভারতের কলকাতা মেডিকেল কলেজে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ সংক্রান্ত সব কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর শনিবার বেলা ১টার সময় দেবাশীষ সহ পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। গতকাল শনিবার বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে বেনাপোল বর্ডার দিয়ে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে বাংলাদেশে প্রবেশ করে দেবাশীষ ও তার পরিবারের মরদেহ।
অশ্রুসিক্ত নয়নে সহকর্মী এবং এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে বিদায়
দৈনিক আজকের আলো পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক গাজী মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে মরদেহ গ্রহন করেন দেবাশীষের আত্মীয়, বন্ধু ও সহকর্মীরা। মরদেহ বাড়িতে আসার পর থেকেই এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয় সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের বাড়িতে। বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন ও সহকর্মীদের আহাজারিতে ভারি হয়ে এলাকার পরিবেশ। এক নজর দেখতে ভিড় জমান প্রতিবেশীরা।
বেনাপোল ইমিগ্রেশনে মরদেহ গ্রহনের সময় কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন, প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি এবং দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন ও জাগো নিউজ ২৪ এর কুষ্টিয়া প্রতিনিধি আল মামুন সাগর, কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সাকে সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক আন্দোলনের বাজারের সম্পাদক আনিসুজ্জামান ডাবলু, কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সহ-সভাপতি এবং দৈনিক সময়ের কাগজ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও আনন্দটিভির কুষ্টিয়া প্রতিনিধি নুরুন্নবী বাবু, প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিনিধি তৌহিদী হাসান, কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সাবেক কোষাধক্ষ্য ও বাংলা টিভির কুষ্টিয়া প্রতিনিধি লিটনউজ্জামান, দীপ্ত টিভির কুষ্টিয়া প্রতিনিধি দেবেশচন্দ্র সরকার এবং দৈনিক খবরওয়ালা পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুন্সী শাহীন আহমেদ সহ সহকর্মী সাংবাদিক বৃন্দ।
কুষ্টিয়া মহাশ্মশানে কুষ্টিয়া প্রেসক্লাব ও পূজা উদ্যাপন কমিটি কুষ্টিয়া জেলা শাখার পক্ষ থেকে নিহত সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পনের মাধ্যমে বিশেষ সন্মান প্রদর্শন করা হয়।
পরিজনের মরদেহ দেখার পর দেবাশীষ দত্তের মা স্বপ্না দত্ত ছেলে, ছেলের বউ ও নাতির মরদেহ দেখে বারবার মুর্ছা যাচ্ছেন। তিনি আহাজারি করতে করতে বলছেন, “আমার দেবাশীষতো এমন ছিল না। হাসি মুখে আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ভারতে চিকিৎসার জন্য গেছিল আর ফিরল লাশ হয়ে। এমনভাবে আমি আমার দেবাশীষকে চাইনি। আমার সব শেষ হয়ে গেল। আমি কাকে নিয়ে বাঁচব। ছোট মেয়েটা অনাথ হয়ে গেল। আমার দেবাশীষকে তোমরা ফিরিয়ে দাও।
দেবাশীষের বাবা দিলীপ দত্ত নির্বাক চোখে তাকিয়ে আছে তার একমাত্র ছেলের কফিনের দিকে। চোখ দিয়ে পড়ছে অনবরত পানি। মাঝে মাঝে মুর্ছা যাচ্ছেন তিনি। বলছেন “আমার সব শেষ হয়ে গেল। আমি কি নিয়ে বাঁচবো। আমার সব চলে গেল।”
মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স চালক সাব্বির হোসেন জানান, তিনটি অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহগুলো সীমান্তে নেওয়া হয়। শুক্রবার রাতে সব প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো কলকাতার পিস ওয়ার্ল্ডের হিমাগারে রাখা হয়।
কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার মোহাম্মদ খালেদ শুক্রবার দুপুরে তার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের জানান, সরকারি খরচে নিহতদের মরদেহ দেশে পৌঁছে দেওয়া হবে। কাগজপত্রের কিছু জটিলতার কারণে সেদিন মরদেহ পাঠানো সম্ভব হয়নি। পরে রাতের মধ্যে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে শনিবার সড়কপথে মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।
এদিকে নিহত সাত বাংলাদেশির মধ্যে সাতক্ষীরার রেবতি সরকারের মরদেহ পরিবারের ইচ্ছায় ভারতে থাকা এক আত্মীয়ের কাছে রেখে সেখানেই শেষকৃত্য সম্পন্ন করাহ হয়েছে।
গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেল শিখা ইনে আগুন লেগে দমবন্ধ হয়ে সাত বাংলাদেশি ও দুই ভারতীয়সহ মোট নয়জনের মৃত্যু হয়। গত বৃহস্পতিবার কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নিহতদের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে মরদেহগুলো মর্গেই রাখা হয়। গত শুক্রবার রাতে আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে কফিনবন্দি মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
চলতি মাসের ৩ তারিখ কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ার ভাড়া বাসা থেকে স্ত্রী আফসানা শারমীন ও ছোট ছেলে স্বর্ণশীষ দত্তকে নিয়ে কলকাতায় যান দেবাশীষ দত্ত। কয়েকদিন পর তার শ্বশুর আকরাম হোসেনও কলকাতায় যান। তারা চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়েছিলেন। কিন্তু চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ফেরার বদলে আজ কফিনবন্দি হয়ে দেশে ফিরছেন তারা।
বেনাপোল স্থলবন্দরের উপপরিচালক (ট্রাফিক) রুহুল আমিন বলেন, ‘কলকাতা থেকে নিহত বাংলাদেশিদের মরদেহ আজ (শনিবার) সকালে আসার কথা থাকলেও প্রক্রিয়াগত কারণে বিকেল নাগাদ পৌঁছোছে। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হয়।
এদিকে দেবাশীষ দত্ত ও তার পরিবারের সদস্যদের শেষকৃত্য ও দাফন পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পৃথক ধর্মীয় রীতিতে সম্পন্ন হবে। দেবাশীষ দত্ত ও তার শিশু সন্তান স্বর্ণশীষের সৎকার করা হবে।
অন্যদিকে দেবাশীষের স্ত্রী আফসানা শারমীন ও শ্বশুর আকরাম হোসেনের মরদেহ প্রথমে দেবাশীষের বাড়ির সামনে নেওয়া হয়। পরে কুষ্টিয়া শহরের থানাপাড়া এলাকায় আফসানার বাবার বাড়িতে নেওয়ার পর তাদের কুষ্টিয়া পৌর কবরস্থানে মুসলিম রীতি অনুযায়ী দাফন করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দেবাশীষের বাবা দিলীপ দত্ত ও নিহতের স্বজনরা।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় নয় বছর আগে আফসানা শারমীনকে বিয়ে করেন দেবাশীষ দত্ত। দুজনের ধর্ম আলাদা হলেও তা তাদের সংসার গড়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। তাদের দুই সন্তান মহিমা ও স্বর্ণশীষ। সন্তানদের ঘিরেই ছিল তাদের ছোট্ট সংসার।
সহকর্মীদের কাছে দেবাশীষ দত্ত ছিলেন সদা হাস্যোজ্জ্বল, প্রাণবন্ত ও সজ্জন একজন মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতা পেশায় থেকে তিনি স্থানীয় বিভিন্ন বিষয় সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরেছেন। তার এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যু সহকর্মীদের জন্য যেমন অপূরণীয় ক্ষতি, তেমনি কুষ্টিয়ার সাংবাদিক অঙ্গনেও সৃষ্টি করেছে গভীর শূন্যতা।
দেবাশীষ দত্ত ও তার পরিবারের সদস্যদের আকস্মিক মৃত্যুতে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক সমাজে গভীর শোক নেমে এসেছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও শোক প্রকাশ করছেন।
সহকর্মীরা জানান, কর্মজীবনে দেবাশীষ দত্ত স্থানীয় নানা সমস্যা, মানুষের দুর্ভোগ ও জনস্বার্থের বিষয়গুলো সংবাদে তুলে ধরতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর এমন আকস্মিক মৃত্যু কুষ্টিয়ার সাংবাদিকতায় অপূরণীয় ক্ষতি তৈরি করেছে।
দেবাশীষ দত্তের ক্যামেরাপার্সন রুবেল হোসেন বলেন, “দাদার সাথে আমার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। কখন কি করতে হবে না করতে হবে সব সময় দাদা বলে দিতেন। তার সাথে আমার শেষ কথা ছিল ‘কুষ্টিয়া এসে তোর সাথে দেখা হবে রুবেল’। আজ দাদা আসছেন কফিন বন্দি হয়ে। এটা আমাদের মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে।”
চ্যানেল টোয়েন্টি ফোরের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট শরীফ বিশ্বাস বলেন, “দেবাশীষ দত্ত শুধু একজন সহকর্মী ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের আপনজন। তার সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি আমাদের মনে থাকবে। এমন একজন প্রাণবন্ত ও সদালাপী মানুষকে এভাবে হারাতে হবে, তা কখনো ভাবিনি। তার মৃত্যুতে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক সমাজ একজন নিবেদিতপ্রাণ সহকর্মীকে হারিয়েছি।”
এখন টেলিভিশনের মেজবাহ উদ্দিন পলাশ বলেন, “দেবাশীষ ভাই সবসময় হাসিমুখে সবার সঙ্গে কথা বলতেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনে তিনি ছিলেন আন্তরিক ও সাহসী। সহকর্মীদের সঙ্গে তার যে আন্তরিক সম্পর্ক ছিল, সেটি কখনো ভোলার নয়। তার অকাল মৃত্যু আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক।”
বাংলানিউজের জাহিদ হাসান বলেন, “একজন সহকর্মী হিসেবে দেবাশীষ দত্ত ছিলেন অসাধারণ একজন মানুষ। আমার প্রথম জেলার সাংবাদিক হিসেবে আলাপন ছিল দেবাশীষ দত্ত দার সাথে। তার সঙ্গে কাজের পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবেও আমাদের ভালো সম্পর্ক ছিল। তার চলে যাওয়া মেনে নেওয়া খুবই কঠিন। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, একই দুর্ঘটনায় তার পরিবারের সদস্যদেরও হারাতে হয়েছে। এই শোক ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।”
সাংবাদিকদের এসব কথায় উঠে এসেছে দেবাশীষ দত্তের প্রতি সহকর্মীদের গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। তার মরদেহ কুষ্টিয়ায় পৌঁছানোর অপেক্ষায় রয়েছেন স্বজন, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। প্রিয় সহকর্মীকে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে প্রস্তুত হচ্ছে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক সমাজ।
একজন সহকর্মীকে হারানোর বেদনার মধ্যেও দায়িত্বের জায়গা থেকে সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনের কাজে ছুটে চলেছেন কুষ্টিয়ার সাংবাদিকরা। শোকের এই সময়েও পেশাগত দায়িত্ব পালনের এই ব্যস্ততা যেন দেবাশীষ দত্তের প্রতি সহকর্মীদের শেষ শ্রদ্ধারই এক অনন্য প্রকাশ।
গতরাত ২টায় কুষ্টিয়া মহাশ্মশানে সাংবাদিক দেবাশীষ ও তিন বছরের ছেলে শর্ণশিষ এর সমাহিত করা হয় এবং রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তথ্য মতে, শ্বশুর আকরাম হোসেন ও স্ত্রী সিমমিন আফসানাকে ফজরের নামাজের পর জানাযা শেষে কুষ্টিয়া পৌর কবরস্থানে দাফন করার কথা রয়েছে।
প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দিবাগত রাতে ভারতের কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুন ও ধোঁয়ায় সেখানে থাকা ৯ জনের মৃত্যু হয়। যার মধ্যে সাত জনের বাড়ি বাংলাদেশে এবং দুই জন ভারতের। বাংলাদেেেশর সাত জনের মধ্যে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের পরিবারের চারজন ছিলেন।








