কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স
প্রকাশ: ১২ই আগস্ট ২০২৬, ১:৫৬ এএম

কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ ‘ উপজেলা হয়ে যে সার আমাদের সোবাহান (ডিলার) সাহেবের কাছে আসে। সেই সার আমরা ঠিকমতো পাইনা। ১৫-২০ কেজি করে সার দেয়। বস্তা ধরে নিতি হলে ৪-৫ জন করে ভাগে নিতি হয়। আমার হলো ছয় বিঘে ভুই (জমি) ধান। এহন আমার কি সম্ভব প্রত্যেক দিন যায়া যায়া ২০ কেজি করে সার নিয়ে আসা।’ আক্ষেপ করে কথা গুলো বলছিলেন কুষ্টিয়ার কুমারখালীর পান্টি ইউনিয়নের বড় ভালুকা গ্রামের আবেদ আলী মোল্লার ছেলে কৃষক জনি মোল্লা (৩৮)।
তাঁর ভাষ্য, ডিলারের কাছে চাহিদামতো সার না পেয়ে তিনি কালোবাজার থেকে ২৭ টাকা কেজির ইউরিয়া কিনেছেন ৩২ টাকায়, ২৭ টাকা কেজির টিএসপি কিনেছেন ৪০ টাকায় আর ২১ টাকা কেজির ডিএপি সার কিনেছেন ৩২ টাকা দিয়ে। ভবিষ্যতে অতিরিক্ত টাকা দিয়েও সার পাবেন না, -এই ভয়ে তিনি কালেবাজারী দোকানের নাম প্রকাশ করেননি। শনিবার (৮ আগষ্ট) সকালে বড় ভালুকা মাঠে কথা এ কৃষকের সঙ্গে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ডিলারদের সিন্ডিকেটের কারণে কোনোদিনও কৃষকরা সরকারি দামে সার পাননা। প্রতি কেজিতে ৫ থেকে ১৩ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত টাকা দিয়ে সার কিনতে হয়। এতে চাষাবাদে খরচ বাড়ছে কৃষকদের। একই গ্রামের হোচেন আলী শেখের ছেলে সামছুল আলম বলেন, ‘ ৫ বিঘা জমিতের আমন ধানের আবাদ। ডিলার সরকারি দামে ১০ কেজির বেশি সার দিলোনা। বাধ্য হয়ে বেলতলা এলাকার সাব ডিলার কুদ্দুসের কাছ থেকে ৩২ টাকা কেজি ইউরিয়া, ৩৭ টাকা কেজি ডিএপি এবং ৩৮ টাকা কেজি টিএসপি সার কিনেছেন।’ তার ভাষ্য, সরকারি দামে কখনই সার পাওয়া যায়না। সাব ডিলার বিভিন্ন এলাকা থেকে সার এনে দেন।
সেজন্য বেশি টাকা নেন। শুধু জনি কিংবা সামছুল নয়, বরং অন্যান্য কৃৃষকদেরও একই অভিযোগ। তারা বলেন, কৃত্রিম সংকট তৈরির জন্য চাহিদামতো সার দেননা ডিলাররা। চাহিদামতো সারের জন্য সাব ডিলার অথবা কালোবাজারে ছুটতে হচ্ছে তাদের। এতে কেজি প্রতি ৫ থেকে ১৩ টাকারও বেশি গুণতে হচ্ছে। গেল এক সপ্তাহ সরেজমিন উপজেলার যদুবয়া, পান্টি, বাগুলাট ও চাপড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন ঘুরে দেখা গেছে, জমি চাষ ও প্রস্তুতি, আমন চারা উত্তোলন ও রোপনের কাজে ব্যস্ত কৃষক। ন্যায্যমূল্যের ডিলার পয়েন্টে গিয়ে চাহিদামতো সার না পেয়ে বাধ্য হয়ে সাব ডিলার ও খোলাবাজারে ছুটছেন তারা। সেখানে সরকার নির্ধারিত দামে কোনো সারই বিক্রি হচ্ছেনা।
প্রতি কেজি টিএসপি ২৭ টাকার পরিবর্তে ৩৮ থেকে ৪২ টাকা, ২৭ টাকার ইউরিয়া ৩০ থেকে ৩২ টাকা, ডিএপি ২১ টাকার পরিবর্তে ৩২-৩৫ টাকা এবং এমওপি ২০ টাকার পরিবর্তে ২৫-২৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পান্টির জোতভালুকা গ্রামের শাহাদতের ছেলে মজনু শেখ (৬৫) বলেন, সরকারি দামে সার পাচ্ছিনা। সাব ডিলার কুদ্দুসের কাছ থেকে ৩২ টাকা কেজি ইউরিয়া, ৪২ টাকা কেজি টিএসপি কিনেছি। সরকারি দামে কোনো দিন সার পাইনা। চাষ করতি হলে সার কেনায় লাগবে। কোনো উপায় নেই। তবে অস্বীকার করে সাব ডিলারের ছেলে ওয়াকিল আহমেদ জানান, তিনি বেশি দাম নিচ্ছেন না। তবে বস্তা ধরে সার কিনতে তিনি অন্য ডিলারদের কাছে পাঠাচ্ছেন।
সেখানে বস্তাপ্রতি ১০০ টাকা বেশি নিচ্ছেন। তার ভাষ্য, অন্য ডিলারের কৃষক আসলে বেশি টাকা নেওয়া হতেই পারে। কিন্তু তার অভিযোগটি আমলে নেওয়া যাবেনা। কারণ, বাইরে থেকে সে কেন আসবে? অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করলেও পরিমাণে কম সার দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন পান্টির বিসিআইসির ডিলার জাবিউল্লাহ পলাশ। তিনি বলেন, কৃষকের ব্যবহার দিনদিন বেড়ে যাচ্ছে। সেজন্য কৃষকদের বুঝানোর জন্য এবং সুষম সারের ব্যবহার নিশ্চিত করতে কম সার দেওয়া হচ্ছে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী এক এলাকার সার অন্য এলাকায় বিক্রি অবৈধ। আবার নিয়োগকৃত ডিলার ও সাব ডিলার ব্যতিত সার বিক্রি করাও অবৈধ।
তবুও সরকারি কর্মকর্তা ও বড় বড় ডিলারদের যোগসাজশে চলছে এমন আইনবিরোধী কার্যক্রম। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে সারের এমন কৃত্রিম সংকট। এমন অবৈধ বিক্রেতার কাছ থেকে সার কিনতে কৃষকদের গুণতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। এমন একজন অসাধু ব্যবসায়ীর নাম আবিদ হাসান। তিনি যদুবয়রা ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামের বড় ভাই মোড়ে অবৈধভাবে সারের ব্যবসা করছেন। চলতি মৌসুমে তার কাছ থেকে সার কিনেছেন দক্ষিণ ভবানীপুর গ্রামের কৃষক রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, দুই বিঘা জমিতে ধানের চাষ। গ্রামের ডিলার হাসানের কাছ থেকে তিনি ৩২ টাকা কেজি ইউরিয়া, ২৫ টাকা কেজি এমওপি এবং ৪৫ টাকা কেজি ডিএপি সার কিনেছেন।
তার ভাষ্য, সরকারি দামে সার মিলছেনা। অতিরিক্ত টাকা দিলেই বেশি বেশি সার পাওয়া যায়। তবে এ কৃষকের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অসাধু ব্যবসায়ী আবিদ হাসান। তিনি মুঠোফোনে জানান, তার সার বিক্রির লাইসেন্স নেই। নিজের জমির জন্যে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন এলাকার ডিলারের কাছ থেকে তিনি ৪ থেকে ৫ বস্তা করে সার কিনে দোকানে রাখেন। কিন্তু তিনি কোনো কৃষকের কাছে বিক্রি করেন না। সার ফাসের দাম বেশি। সরকারের বাধা এক হাজার ৩৫০ টাকা বস্তার সার কিনতে হচ্ছে এক হাজার ৯০০ টাকায়। এক বিঘা ধান চাষে খরচ হয় ১৫ হাজার টাকা। ধান হয় ১৫ মণ। তাহলে বলেন ধান চাষে লাভ কোথায়। ‘ ক
থা গুলো বলছিলেন বাগুলাট ইউনিয়নের বাঁশগ্রামের কৃষক শাহিন বিশ্বাস। তিনি বলেন, সরকার যদি সার – ওষুধের দাম কমায়, তবে কৃষকের লাভ হবে। উপজেলা কৃষি সম্প্রাসারণ কার্যালয় সুত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয়েছে। ২০২৫ -২৬ অর্থবছরে সরকার কর্তৃক অনুমোদিত ইউরিয়ার সারের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৮৩৮ মেট্রিকটন। টিএসপি সারের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭৩৮ মেট্রিকটন। ডিএপি ছিল ৪ হাজার ৯৮৫ মেট্রিকটন এবং এমওপি সারের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ১৫৪ মেট্রিকটন। কৃষি কার্যালয়ের তথ্য এবং কৃষকের করা অভিযোগ অনুযায়ী, গত অর্থবছরে প্রতি কেজি ১৩ টাকা হিসেবে টিএসপি সার বাবদ ৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা অতিরিক্ত নিয়েছে সিন্ডিকেট। প্রতি কেজি ১১ টাকা হিসেবে ডিএপি সার বাবদ ৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, প্রতি কেজি ৫ টাকা হিসেবে এমওপি সার বাবদ এক কোটি ৫৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সিন্ডিকেট। এছাড়াও প্রতি কেজি ৫ টাকা হিসেবে ইউরিয়া সার বাবদ চক্রটি আর ৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা লুটে নিয়েছে।
সবমিলে প্রায় ১৬ কোটি টাকা লুটেছে সিন্ডিকেট। সার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কারসাজি চলছে। কৃষকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ, যে তারা ন্যায্যমূল্যে সার পাচ্ছেন না। ডিলাররা কারসাজি করে কালোবাজারে সার বিক্রি করছেন বলেই কৃষকরা সার পাচ্ছেন না। ‘ এমন মন্তব্য করেছেন কুমারখালী দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক হাবীব চৌহান। তিনি বলেন, কোটি কোটি টাকা লুটছে সিন্ডিকেট। এমন সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তিনি। কৃষকদের এমন অভিযোগের ভিত্তিতে মাঠ পর্যায়ের কৃষি অফিসাররা ডিলার পয়েন্টে দাঁড়িয়ে থেকে কৃষকদের সার দিয়েছেন।
সিন্ডিকেট ও অসাধু ডিলারের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে বলেও জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো.মনির হোসেন। তিনি বলেন, এবছর প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষাবাদের লক্ষমাত্রা রয়েছে। নিয়মিত মনিটারিং করা হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে সার নিয়ে কোনো সমস্যা হবেনা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার বলেন, কৃত্রিম সংকট ও বেশি দাম নেওয়ার অভিযোগ শোনা গেছে। দ্রুতই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য