লোডশেডিংয়ে ভোগে সাধারণ মানুষ
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন এলাকায় বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে অবৈধভাবে সংযোগ নিয়ে ফাইবার নোড (ঋরনবৎ ঘড়ফব) পরিচালনার মাধ্যমে বছরের পর বছর বিদ্যুৎ ব্যবহার করে আসছে এমন অভিযোগ উঠেছে দুটি কেবল টিভি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান কেসিটিভি (কঈঞঠ) ও কণিকা কেবল টিভির বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যুতের মূল বিতরণ লাইনে সরাসরি সংযোগ নিয়ে শত শত ফাইবার নোড পরিচালনা করে গ্রাহকদের কেবল টিভি সেবা দেওয়া হলেও বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিপরীতে কোনো বৈধ বিল পরিশোধ করা হচ্ছে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে শহরের বিভিন্ন বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে ফাইবার নোড ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি স্থাপন করে সেগুলো সরাসরি বিদ্যুতের মূল লাইন থেকে চালানো হচ্ছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে থাকলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, কেসিটিভি ও কণিকা কেবল টিভির সম্মিলিত গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ২ লাখ। এই বিপুল সংখ্যক গ্রাহককে সেবা দিতে কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন এলাকায় ১ হাজারেরও বেশি ফাইবার নোড স্থাপন করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এসব নোডের অধিকাংশই বৈদ্যুতিক খুঁটির মূল লাইন থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। প্রযুক্তিগত হিসাবে, একটি মাঝারি ক্ষমতার ফাইবার নোড গড়ে ২০ ওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে ১ হাজার নোডের মোট লোড দাঁড়ায় ২০ কিলোওয়াট। সে হিসেবে ২৪ ঘণ্টা সচল থাকলে মাসে বিদ্যুৎ ব্যবহার হয় প্রায় ১৪ হাজার ৪০০ ইউনিট (কিলোওয়াট-ঘণ্টা) এবং বছরে প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার ৮০০ ইউনিট। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় মূল্য ১০ টাকা ধরে হিসাব করলে শুধুমাত্র এসব ফাইবার নোড পরিচালনায় বছরে বিদ্যুতের আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৭ লাখ ২৮ হাজার টাকা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নোডের প্রকৃত সংখ্যা বা বিদ্যুৎ ব্যবহার যদি এর চেয়ে বেশি হয়ে থাকে, তাহলে সম্ভাব্য আর্থিক মূল্য ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা কিংবা তারও বেশি হতে পারে। বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সংকটের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দেশে স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে। অন্যদিকে চাহিদা সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হওয়ায় নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে থাকে, তাহলে তা শুধু রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতিই নয়, জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মোহাম্মদ করিম বলেন, আমরা অনেক দিন ধরেই দেখছি বৈদ্যুতিক খুঁটির ওপর বিভিন্ন যন্ত্র বসানো আছে। যদি এগুলো বৈধ সংযোগে চলে, তাহলে সমস্যা নেই। কিন্তু যদি সত্যিই অবৈধভাবে বিদ্যুৎ নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে বিদ্যুৎ বিভাগ বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত সত্য জনগণের সামনে তুলে ধরুক। গৃহিণী মোছা. বিনা খাতুন বলেন, আমরা নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল দিচ্ছি, আবার লোডশেডিংও সহ্য করছি। এমন অবস্থায় যদি কোনো প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে থাকে, তাহলে সেটি সাধারণ গ্রাহকদের সঙ্গে অন্যায় হবে। আমরা নিরপেক্ষ তদন্ত চাই। চাকরিজীবী মোহাম্মদ ইসলাম বলেন, কুষ্টিয়া শহরের অনেক বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে ফাইবার নোড লাগানো দেখা যায়। এসব নোড কীভাবে বিদ্যুৎ পাচ্ছে, সেটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের খতিয়ে দেখা উচিত।
অভিযোগ সত্য হলে আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও পরিষ্কার হওয়া উচিত। কলেজশিক্ষার্থী মোহাম্মদ রহমান বলেন, এ ধরনের অভিযোগ উঠলে শুধু আলোচনা করলেই হবে না। বিদ্যুৎ বিভাগ, জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যৌথভাবে তদন্ত করে জানাক, সংযোগগুলো বৈধ নাকি অবৈধ। এতে জনগণের মধ্যে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তারও স্পষ্ট উত্তর মিলবে। এ বিষয়ে ওজোপাডিকো কুষ্টিয়ার বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম চক্রবর্তী বলেন, ২০১৮-১৯ সালের দিকে আমি যখন ঝিনাইদহে কর্মরত ছিলাম, তখন এ ধরনের একটি বিষয় সামনে এসেছিল।
সে সময় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের একটি অ্যাকাউন্টের বিপরীতে কতটি ফাইবার নোড ও অ্যাম্প্লিফায়ার রয়েছে, সেগুলোর বিদ্যুৎ ব্যবহারের সক্ষমতা অনুযায়ী বিল নির্ধারণ করা হতো। কারণ, কিছু যন্ত্রপাতির বিদ্যুৎ খরচ কম এবং কিছু বেশি। তবে বর্তমানে কুষ্টিয়ায় এ বিষয়ে কী পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে, তা এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না। বিষয়টি যাচাই করে পরে জানাতে পারব। অভিযোগ সম্পর্কে কেসিটিভির পরিচালক স্বজল বলেন, আগে বিদ্যুৎ বিলের অনুপাতে আমরা বিদ্যুৎ অফিসে একটি নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতাম। পরে বিদ্যুৎ অফিস ইন্টারনেট সেবার জন্য আলাদাভাবে কোনো অর্থ গ্রহণ না করায় আমরাও সেই অর্থ প্রদান বন্ধ করে দিই। ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত আমরা নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেছি।
মূলত ইন্টারনেট ব্যবসায়ীদের এ বিষয়ে ছাড় দেওয়া হয়েছে বলেই আমরা অতিরিক্ত অর্থ প্রদান বন্ধ করেছি। এছাড়া আগের তুলনায় আমাদের গ্রাহক সংখ্যাও কমে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের বাসায় প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়। তবে এসব যন্ত্রপাতির মাধ্যমে বিদ্যুৎ চুরির সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে কি না এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। অন্যদিকে কণিকা কেবল টিভির পরিচালক আতিয়ার বলেন, আগে আমরা নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতাম, বর্তমানে আর দিই না। ইন্টারনেট ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেও যেহেতু বিল নেওয়া হচ্ছে না, তাই আমাদেরও আর পরিশোধ করা হচ্ছে না।
তবে মাসিক কত টাকা বিল দেওয়া হতো এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সে সময় আমরা সবাই একসঙ্গে ব্যবসা করতাম। এ বিষয়ে কে সি টিভির স্বজল সাহেব বিস্তারিত বলতে পারবেন। এ অভিযোগের বিষয়ে এখনো বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের ঘোষণা আসেনি। তবে বিষয়টি নিয়ে শহরজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে দ্রুত কারিগরি পরিদর্শন, সংযোগ পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই করা জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতির হিসাব নিরূপণ করা উচিত।









