১৮ পারা কোরআন হৃদয়ে নিয়েই চিরনিদ্রায় আয়েশা - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

১৮ পারা কোরআন হৃদয়ে নিয়েই চিরনিদ্রায় আয়েশা

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মার্চ ২৭, ২০২৬

চোখে-মুখে ছিল পবিত্র কোরআনের হাফেজা হওয়ার স্বপ্ন। ১৮ পারা ইতিমধ্যে গেঁথে নিয়েছিলেন হৃদয়ে। বাকি ছিল আর মাত্র ১২ পারা। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূর্ণ হওয়ার আগেই পদ্মার অথৈ জল কেড়ে নিল ১৩ বছরের কিশোরী আয়েশা বিনতে গিয়াসকে। গত বুধবার (২৫ মার্চ) দৌলতদিয়া ঘাটে বাসডুবির ঘটনায় পরিবারের আদরের আয়েশা এখন শায়িত আছেন কুষ্টিয়ার খোকসার পারিবারিক কবরস্থানে।

সেদিন বিকালে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পন্টুন থেকে বাসটি যখন দ্রুতগতিতে পদ্মায় তলিয়ে যাচ্ছিল, তীরে দাঁড়িয়ে থাকা বাবা গিয়াস উদ্দিন আর ভাই সাফিনের চোখের সামনেই মুহূর্তেই সব অন্ধকার হয়ে যায়। অলৌকিকভাবে মা লিটা খাতুন বেঁচে গেলেও, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তলিয়ে যায় আয়েশা।

আয়েশার বাবা ও ভাই দুজনেই কোরআনের হাফেজ। বাবার ইচ্ছা ছিল মেয়েকেও হাফেজা বানাবেন। সেই লক্ষ্যে মাদরাসায় পড়াশোনা করছিল সে। মেধাবী আয়েশা মাত্র ১৩ বছর বয়সেই কোরআনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মুখস্থ করে ফেলেছিল। গত রমজানে পরিবারের সঙ্গে ওমরাহ করেছিল সে।

আয়েশা ছিলেন পাঁচ ভাইয়ের পরিবারের মাত্র দুই মেয়ের একজন। সবার চোখের মণি আয়েশার এই অকাল প্রস্থান মেনে নিতে পারছেন না তার স্বজনরা।

কুষ্টিয়ার খোকসা শমসপুর মোল্লাপাড়ার নিজ বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে ​আয়েশার সেজো চাচা নাসির উদ্দিন বলেছিলেন, পরিবারের সবচেয়ে আদরের মেয়েটিকে হারিয়ে পুরো পরিবার এখন দিশেহারা। আমাদের পরিবারে মোট ৫ জন হাফেজ, আয়েশার বাবা আর ভাই দুজনেই হাফেজ। আয়েশারও খুব ইচ্ছা ছিল সে হাফেজা হবে। ইতিমধ্যে ১৮ পারা কোরআন মুখস্থও করে ফেলেছিল মেয়েটা। গত রমজানে ৫ রোজার সময় সপরিবারে ওমরাহ করে এলো; কত খুশি ছিল ও! পড়ালেখাতেও খুব মেধাবী ছিল।

তিনি জানান, আয়েশারা পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার আদরের ছিল আয়েশা। তার বড় চাচার কবরের পাশেই তাকে জায়গা দিয়েছি আমরা। ১৮ পারা কোরআন তো ওর হৃদয়েই ছিল, বাকি ১২ পারা পূর্ণ করার সুযোগ দিল না পদ্মা নদী।

গিয়াস উদ্দিনের ঢাকায় একটি ফুড প্রোডাক্ট কোম্পানি রয়েছে। ঈদের ছুটিতে সপরিবারে খোকসার নিজের বাড়ি ও কুমারখালীর শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে এসেছিলেন। বুধবার দুপুরে কুমারখালী পৌর বাস টার্মিনাল থেকে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসে করে ঢাকায় ফিরছিলেন তারা। বাসটি ফেরির অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় নামাজ পড়ার জন্য গিয়াস উদ্দিন তার ছেলেকে নিয়ে বাস থেকে নেমেছিলেন। বাসে থেকে যান তার স্ত্রী ও মেয়ে আয়েশা। এর কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাসটি পন্টুন দিকে ছুটে গিয়ে সরাসরি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়।

​পিতা গিয়াস উদ্দিন বলছিলেন, চোখের সামনে স্ত্রী আর মেয়েকে নিয়ে বাসটা ডুবে গেল। কিছুই করতে পারলাম না। পরে স্ত্রীকে লোকজনের সাহায্যে উদ্ধার করতে পারলেও মেয়েটা হারিয়ে গেল। গভীর রাতে ডুবুরিরা যখন আয়েশার নিথর দেহ উদ্ধার করে, তখন আমার সব আশার প্রদীপ নিভে যায়।

বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সকালে জানাজা শেষে শমসপুর মোল্লাপাড়ার বাড়িতে আয়েশাকে দাফন করা হয়েছে। আয়েশার অকাল মৃত্যুতে শুধু তার পরিবার নয়, পুরো এলাকায় বইছে শোকের মাতম। এ দুর্ঘটনায় আয়েশাসহ সর্বশেষ ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তার মধ্যে ১১ জন নারী, ৮ জন শিশু ও ৭ জন পুরুষ রয়েছেন। যাদের মধ্যে কুষ্টিয়া জেলার শিশুসহ ৪ জন যাত্রী নিহত হয়েছেন।