কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে এক পল্লী চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় অন্তত ১০ শিশুর জীবন বিপন্ন হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শিশুদের কারো মুখ অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাচ্ছে। আবার কারো মুখে গজাচ্ছে লোম। শরীরের জ্বালা যন্ত্রণার পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে ক্ষত। তারা ভুগছে হরমোনজনিত রোগেও। এমন পরিস্থিতিতে ওই চিকিৎসকের শাস্তির চেয়ে রোববার (৮ মার্চ) দুপুরে ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ করেন অন্তত ৭ অভিভাবক।
অভিযুক্ত পল্লী চিকিৎসকের নাম হাফেজ মো. ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ (২৮)। তিনি উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের দাড়িগ্রাম এলাকার রশিদ শেখের ছেলে। তার বেলগাছি গগণ হরকরা মোড়ে বেলগাছী মেডিকেল হল নামে একটি চেম্বার রয়েছে। তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে মাত্র তিনমাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে বুনে গেছেন চিকিসক। খুলে বসেছেন ব্যক্তিগত চেম্বার। নামের আগে লিখেন ডাক্তার পদবি। ব্যবহার করছেন সিল ও প্যাড। সেখানে তিনি চিকিৎসক পরিচয়ে ২০২৩ সাল থেকে চিকিৎসার নামে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
জানা গেছে লিখিত অভিযোগকারীদের মধ্যে একজন উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের বড় মাজগ্রামের কৃষক আশরাফুলের মেয়ে তাসলিমা খাতুন। দুপুরে সরেজমিন দেখা যায়, ঘরের বারান্দায় তিন শিশু সুমায়িা (৬), রাফাত ( ৩) ও তাইবা ( ৬ মাস) দের নিয়ে বসে আছেন তাদের মা তাসলিমা খাতুন। শিশুদের মুখমণ্ডল ফোলা, জন্মেছে লোম। জ্বালা যন্ত্রণায় কাঁদছে সবার ছোট তাইবা। আর মায়ের চোখেমুখে হতাশার ছাপ। এসময় তাসলিমা খাতুন অভিযোগ করে বলেন, তিনমাস আগে সন্তানদের শরীরে চুলকানি রোগ দেখা দেয়। তখন বেলগাছি এলাকার ডাক্তার ইব্রাহিমের কাছে গিয়েছিলাম।
ইব্রাহিম’ আলফাকর্ট নামের একটি ইনজেকশন দেন। ইনজেকশন দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছেলেমেয়েরা কাঁদতে শুরু করে। এরপর আস্তে আস্তে ওদের মুখ অস্বাভাবিকভাবেবে ফুলে যায়, ইনজেকশনের স্থানে ক্ষত তৈরি হয়। সম্প্রতি মুখে লোম গজাচ্ছে। পরে কুষ্টিয়ার এক ভালো ডাক্তারের কাছে গেলে চিকিৎসক বলেন ভুল চিকিৎসায় এমন হয়েছে। তাসলিমা বলেন, বড় ডাক্তার বলেছেন ভুল চিকিৎসার কারনে শিশুদের হরমোনজনিত রোগ হয়েছে। ভালো হতে সময় লাগবে। আমি ভুয়া ডাক্তার ইব্রাহিমের বিচার চাই।
একই এলাকার জাহিদ হোসেনের স্ত্রী মৌ খাতুন বলেন, ৬মাস আগে মেয়ে মরিয়ম (৭) ও ছেলে ইউসুফের (২) শরীরে চুলকানি দেখা যায়। সেজন্য ইব্রাহিম ডাক্তারের কাছে গিছিলাম। ডাক্তার, আলফাকর্ট ইনজেকশন দিলে ছেলে – মেয়ে দুজনই অসুস্থ হয়ে পড়ে। বর্তমানে মেয়ের মুখে ছেলেদের মত লোম গজিয়েছে। শরীরে জ্বালাপোড়া করে। কুষ্টিয়ার এক চিকিৎসক দেখানো হচ্ছে। চিকিৎসক বলেছেন হরমোনজনিত সমস্যা। সেরে উঠতে সময় লাগবে। তার ভাষ্য, ডাক্তার সেজে ইব্রাহিম ভুল চিকিৎসা করছে। এতে অনেক শিশুর জীবন এখন হুমকিতে পড়েছে। সঠিক বিচারের আশায় ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।
শিলাইদহ ইউনিয়নের দাড়িগ্রামের ফারুক হোসেনের ছেলে খাইরুল ইসলাম বলেন, নামের আগে চিকিৎসক লিখে ইব্রাহিম ভুলভাল চিকিৎসা দিচ্ছে। এই ভুয়া ডাক্তারের চিকিৎসায় আমার ১৩ মাস বয়সি মেয়ে খাদিজার জীবন বিপন্ন। হরমোনজনিত সমস্যায় ভুগছে। বর্তমানে মেয়েকে রাজশাহী মেডিকেলে চিকিৎসা দিচ্ছি। ভুয়া ডাক্তার ইব্রাহিমের কঠিন বিচার চাই। এ দিকে ঘটনার ভুল স্বীকার করে পল্লী চিকিৎসক হাফেজ মো. ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ বলেন, মানবিক বিভাগ থেকে ২০১৪ সালে এসএসসি পাশ করে একটি কলেজ থেকে ডিগ্রী সম্পন্ন করেছি।
২০২৩ সালে কুমারখালী হাসপাতাল থেকে তিন মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে আসছি। আগে না বুঝে সিল – প্যাড ও ডাক্তার পদবী ব্যবহার করতাম। তাঁর ভাষ্য, তিনি নিয়ম মেনে চুলকানী রোগীদের আলফাকর্ট ইনজেকশন দিয়েছিলেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা চিকিৎসক খালেদ সাইফুল বলেন, একজন পল্লী চিকিৎসব সিল, প্যাডসহ নাম ব্যবহার করতে পারেন না। আবার এধরনের চিকিৎসাও দিতে পারেন না। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার বলেন, ভুল চিকিৎসায় অন্তত ১০ শিশুর শরীরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ার ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্ত সাপক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
