কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

র‌্যাগিংয়ে বাধা দেওয়ায় শিক্ষার্থীকে বয়কট, মারধর করে ২৫ হাজার টাকা দাবি

ইবি প্রতিনিধি ॥ র‌্যাগিং ও ‘ম্যানার শেখানোর’ নামে সিনিয়রদের হস্তক্ষেপে বাধা দেওয়ার পর থেকেই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) লোক প্রশাসন বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে বয়কটের অভিযোগ ওঠে। একপর্যায়ে বয়কট তুলে নিতে তার কাছে দাবি করা হয় ২৫ হাজার টাকা। টাকা না দেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে নির্জন স্থানে আটকে তাকে মারধরের অভিযোগও করেছেন ওই শিক্ষার্থী। ভুক্তভোগী ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. তারিফ জামান রাজের অভিযোগ, বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী জাহিদ মৃধাসহ কয়েকজন সিনিয়রের ইন্ধনে তার ব্যাচের আল-নাজিব মাহি, কাইয়ুম মোস্তফা, আব্দুল কাইয়ুম, মুজাহিদুল ইসলাম মিম, আবিদ বিন ইকরা, সায়েম হাফিজ সিয়াম, নবী হোসেন শুভ ও আব্দুল ফাত্তাহ আকিবসহ কয়েকজন তাকে ব্যাচভিত্তিক বয়কট করেন।

গত ৯ সেপ্টেম্বর রাতে বয়কট তুলে নেওয়ার জন্য তার কাছে ২৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দেওয়ায় ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে তাকে আটকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ তার। এ ঘটনায় পৃথক দুটি অডিও রেকর্ড প্রতিবেদকের কাছে সরবরাহ করেছেন রাজ। পরে প্রক্টর ও বিভাগীয় সভাপতির কাছে লিখিত অভিযোগও দেন তিনি। লিখিত অভিযোগে রাজ জানান, তিনি ক্লাস প্রতিনিধি (সিআর) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সিনিয়রদের ‘ম্যানার শেখানোর’ নামে ক্লাসে আসার বিষয়ে তৎকালীন বিভাগীয় চেয়ারম্যানের সহায়তায় বাধা দেন।

এরপর বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী জাহিদ মৃধাসহ কয়েকজন সিনিয়র তাকে বয়কট করেন বলে অভিযোগ তার। পরবর্তীতে তার ব্যাচের আল-নাজিব মাহিকে নতুন সিআর হিসেবে মনোনীত করা হয়। তবে রাজের দাবি, তিনি নির্বাচিত সিআর থাকা অবস্থায় কোনো নির্বাচন ছাড়াই আল-নাজিব মাহি নিজেকে সিআর হিসেবে দাবি করেন। মাহির দাবি, রাজ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ায় ক্লাসের শিক্ষার্থীরা সম্মিলিতভাবে তাকে বয়কট করে এবং গণতান্ত্রিকভাবে ভোটের মাধ্যমে মাহিকে নতুন সিআর নির্বাচিত করে।

রাজের অভিযোগ, এরপর তার ইমিডিয়েট সিনিয়রসহ বিভিন্ন ব্যাচের কয়েকজন সিনিয়র এবং তার ব্যাচের কয়েকজন শিক্ষার্থী তাকে বিভাগ ও ব্যাচভিত্তিকভাবে বয়কট করতে থাকেন। তাকে বিভিন্ন মেসেঞ্জার গ্রুপ থেকে বের করে দেওয়া হয়। ফলে ক্লাস রুটিন, অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার সময়সীমা, ইনকোর্স পরীক্ষার সিলেবাসসহ বিভিন্ন একাডেমিক তথ্য পেতে বাধাগ্রস্ত হন তিনি। যথাসময়ে তথ্য না পাওয়ায় একবার অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে পারেননি বলেও দাবি করেন। তার অভিযোগে বর্তমান সিআর আল-নাজিব মাহি, মো. ওসমান গনি, কাইয়ুম মোস্তফা, আব্দুল কাইয়ুম ও মুজাহিদুল ইসলাম মিমের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

তারা তার সঙ্গে কেউ যোগাযোগ রাখলে তাকেও বয়কট করা হবে বলে ব্যাচমেটদের হুমকি দিতেন বলেও অভিযোগ করেন রাজ। রাজের অভিযোগ, গত ৯ সেপ্টেম্বর রাতে আল-নাজিব মাহিসহ কাইয়ুম মোস্তফা, মুজাহিদুল ইসলাম মিম, আবিদ বিন ইকরা, সায়েম হাফিজ সিয়াম, নবী হোসেন শুভ ও আব্দুল ফাত্তাহ আকিব তাকে বিভিন্নভাবে চাপ ও ব্ল্যাকমেইল করেন। এ সময় তার কাছে ২৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিলে তার ওপর চলমান বিভাগ ও ব্যাচভিত্তিক বয়কট তুলে নেওয়া এবং ব্যাচমেটদের সঙ্গে যোগাযোগে বাধা বন্ধ করার কথা বলা হয় বলে দাবি করেন তিনি।

একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের অপবাদ দিলে সবাই তা বিশ্বাস করবে এবং সিনিয়র শিক্ষার্থীরা তাদের সহযোগিতা করবে বলেও ভয় দেখানো হয় বলে অভিযোগ করেন রাজ। এর দুই সপ্তাহের মধ্যে গত ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে হল থেকে খাওয়াদাওয়া শেষে মেসে যাওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পকেট গেট দিয়ে বের হওয়ার সময় আল-নাজিব মাহিসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে একটি নির্জন ও অন্ধকার স্থানে আটকে দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। রাজের দাবি, সেখানে আগের ২৫ হাজার টাকা না দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে কথা বলা হয়। একপর্যায়ে আল-নাজিব মাহি, আব্দুল কাইয়ুম ও কাইয়ুম মোস্তফা তাকে লাথি, কিল, ঘুষি ও সজোরে থাপ্পড় মারেন।

আহত ও আতঙ্কিত অবস্থায় কোনোভাবে সেখান থেকে বের হয়ে পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পকেট গেট দিয়ে ক্যাম্পাসে ঢুকে প্রক্টরকে বিষয়টি জানান তিনি। তবে অভিযুক্তদের বক্তব্যে ঘটনাটির ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া গেছে। আল-নাজিব মাহি বলেন, ট্যুরের নাম করে টাকা দাবি বা চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। বন্ধুদের মধ্যে কথাকাটাকাটি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটলেও রাজই প্রথমে গায়ে হাত তোলেন।

রাজ পরিবার ও মা-বাবা তুলে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করায় বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়। ঘটনার পর বিভাগের বড় ভাইদের উপস্থিতিতে উভয় পক্ষ ভুল স্বীকার করে বিষয়টি রাতেই মীমাংসা করে বলে দাবি করেন তিনি। অভিযুক্ত আব্দুল কাইয়ুমও ২৫ হাজার টাকা দাবির অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার দাবি, রাজ তাকে আপত্তিকর মন্তব্য করায় পরদিন রাস্তায় দাঁড় করিয়ে কারণ জানতে চাইলে রাজ প্রথমে তাকে ধাক্কা দেন। এর জবাবে তিনি রাজের কলার চেপে ধরেন। পরে রাজ চিৎকার-চেঁচামেচি করে লোক জড়ো করলে পরিস্থিতি জটিল হয়। ঘটনার রাতেই সিনিয়রদের উপস্থিতিতে বিষয়টি আপস-মীমাংসা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

কাইয়ুম মোস্তফা মারধরের ঘটনা স্বীকার করে বলেন, পরিস্থিতির চাপে আকস্মিকভাবে এটি ঘটে। তাদের মধ্য থেকে একজন নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে রাজের গায়ে হাত তুলে ফেলেছিলেন। তবে চাঁদা দাবির অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন দাবি করেন তিনি। রাজ অভিযোগ করেছেন, মারধরের পর বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার রসিদ নিলয় তাকে প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ না দিতে এবং প্রক্টরকে অভিযোগপত্র না নিতে বলেছিলেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নিলয়।

নিলয়ের ভাষ্য, প্রক্টর নিজেই স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, লিখিত অভিযোগ জমা পড়লে আনুষ্ঠানিক তদন্ত হবে। কাউকে গায়ে হাত তোলা বা মারধর করে টাকা দাবি করা অপরাধ। মারধরের পর রাজ প্রক্টরের কাছে অভিযোগ দিতে চাইলে তিনি বিষয়টি প্রক্টরকে জানান। তখন প্রক্টর বিভাগের সিনিয়র হিসেবে নিজেদের মধ্যে বসে বিষয়টি মিটমাট করা যায় কি না, তা দেখতে বলেন। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি তাদের মিলেমিশে থাকার পরামর্শ দিয়ে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেন। রাজের বিরুদ্ধে পূর্বের বিভিন্ন অভিযোগও তুলেছেন অভিযুক্তরা।

কাইয়ুমের দাবি, রাজ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ ছিলেন এবং সহপাঠীদের সঙ্গে তার আচরণ নিয়ে অসন্তোষ ছিল। উসমানও রাজের আচরণ নিয়ে অভিযোগ করেছেন এবং বলেছেন, বয়কটের সিদ্ধান্ত ক্লাসের শিক্ষার্থীরা যৌথভাবে নেয়। অন্যদিকে রাজ এসব অভিযোগের বেশিরভাগই বানোয়াট দাবি করেছেন। তার ভাষ্য, কয়েকজন ছাড়া কেউ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেনি। ক্লাসের ভুল সময় জানানোর বিষয়টি ইচ্ছাকৃত ছিল না এবং বান্ধবীর সঙ্গে ভিডিও কলের বিষয়টি শিক্ষকদের মাধ্যমে অনেক আগেই সমাধান হয়েছে।

মূলত সিনিয়রদের র‌্যাগিং ও ‘ম্যানার শেখানোতে’ বাধা দেওয়ার পর থেকেই তার ওপর সবাই ক্ষিপ্ত বলে দাবি করেন তিনি। একই বর্ষের শিক্ষার্থী ও সাবেক নারী সিআর বৈশাখীর বক্তব্যেও রাজকে বয়কটের বিষয়টি উঠে এসেছে। তিনি বলেন, রাজের সঙ্গে সহপাঠীদের দূরত্ব ছিল এবং সিনিয়রদের সঙ্গে একটি ঘটনার পর পুরো ব্যাচের সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি হয়। তবে বর্তমানে রাজ অনেকটাই শান্ত হয়ে গেছেন এবং ক্যাম্পাসে কারও সঙ্গে ঝামেলায় জড়ান না বলে জানান তিনি। বিষয়টি নিয়ে বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মুন্সি মুর্তজা আলী বলেন, তিনি এ বিষয়ে অবগত ছিলেন না। সংশ্লিষ্ট সবাইকে ডেকে কথা বলবেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহিনুজ্জামান বলেন, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মারধরের ঘটনার রাতে তাকে বিষয়টি জানান। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে লিখিত অভিযোগ দিতে বলেন এবং অভিযুক্ত কয়েকজনকে ফোন করে সতর্ক করা হয়। ইতোমধ্যে অভিযোগপত্র জমা হয়েছে এবং শনিবার এ বিষয়ে আলোচনা করা হবে। উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমতাজ হোসেন জানান, তিনি বিষয়টি জানেন না এবং সাংবাদিকের কাছ থেকেই প্রথম শুনেছেন। র‌্যাগিংয়ের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি থাকা সত্ত্বেও এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ও পূর্বের র‌্যাগিংয়ের তদন্তের অগ্রগতি জানতে চাইলে তিনি প্রক্টরের সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানান। উপাচার্য অধ্যাপক ড. মতিনুর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর