কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

ফেলে দেওয়া মাছের আঁশে বাজিমাত: মিলছে বাড়তি আয়

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ একসময় কুষ্টিয়ার বিভিন্ন মাছ বাজারে যা ফেলা দেওয়া হতো বর্জ্য হিসেবে, সেই মাছের আঁশ এখন আর ফেলনা নয়। স্থানীয় মাছ বাজারে অপছন্দনীয় এই বর্জ্যই এখন খুলে দিয়েছে বাড়তি উপার্জনের নতুন দুয়ার। প্রতিদিন শহরের ছোট-বড় বাজারগুলো থেকে কেজি কেজি মাছের আঁশ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন একশ্রেণীর উদ্যমী ব্যবসায়ী। ফলে একদিকে যেমন বাজারগুলোর সার্বিক পরিবেশ দূষণের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে, অন্যদিকে খুচরা মাছ বিক্রেতা থেকে শুরু করে সংগ্রাহক- সবারই পকেটে আসছে বাড়তি অর্থ।

 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুষ্টিয়া শহরের পৌর বাজার, বড় বাজার, সাদ্দাম বাজার, মঙ্গলবাড়িয়া বাজার, হরিপুর বাজার, হাউজিং বাজার, চৌড়হাস বাজার ও রাজারহাটসহ উপজেলার বিভিন্ন বাজারে প্রতিদিন ভোর ৬টা থেকে শত শত মন মাছ বেচাকেনা হয়। 

 

সকাল ৭টার পর থেকে খুচরা বিক্রেতারা শহরের বিভিন্ন মোড় ও ছোট বাজারে মাছ কেটে আঁশ ছাড়িয়ে বিক্রি করেন। আগে এই আঁশগুলো ময়লা হিসেবে নর্দমায় বা বাজারের কোণে ফেলে দেওয়া হতো, যা পচে দুর্গন্ধ ছড়াত।

 

বর্তমানে ব্যবসায়ীরা পরিচ্ছন্নভাবে এই আঁশ সংগ্রহ করে রাখছেন। কুষ্টিয়া পৌর বাজারের মাছ ব্যবসায়ী আব্বাস বলেন, ‘আগে আমরা মাছের আঁশগুলো ফেলে দিতাম। এখন আর ফেলি না। ভেজা আঁশ শুকাতে দিলে প্রতি কেজি ২৫ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ফেলনা জিনিস থেকে কিছু বাড়তি টাকা পাওয়ায় আমাদের উপকার হচ্ছে, আবার বাজারও পরিষ্কার থাকছে।’

 

স্থানীয় আঁশ সংগ্রাহকদের সূত্রে জানা যায়, পূর্বে ভেজা আঁশ ১৫ থেকে ২০ টাকা কেজিতে কেনাবেচা হলেও এখন প্রক্রিয়াজাত বা শুকনো আঁশের চাহিদা বেশি। সংগ্রাহকরা বাজার থেকে ভেজা আঁশ কিনে বাড়িতে নিয়ে ধুয়ে-মুছে কড়া রোদে শুকান।

 

হাটশ হরিপুর বোয়ালদা গ্রামের পিয়ার আলী নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবসা করছি। প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ কেজি মাছের আঁশ সংগ্রহ করার পর বাড়িতে পানি দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করে রোদে শুকাই। এভাবে ৪ থেকে ৫ মণ জমা হলে সেগুলো ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে ঢাকার বড় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দিই।’

 

তার মতো কোর্ট স্টেশন এলাকার অমিতসহ আরও অনেকেই বর্তমানে কুষ্টিয়ায় এই সম্ভাবনাময় ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

মাছের আঁশ কিনে ঢাকার ব্যবসায়ীরা কী কাজে ব্যবহার করছেন- তা নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে দীর্ঘদিনের কৌতুহল রয়েছে। 

 

প্রসাধনী ও প্রিমিয়াম সামগ্রী: মাছের আঁশে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক ‘কোলাজেন’ ও ‘জিলাটিন’। এটি নারীদের লিপস্টিক, নেলপালিশ, বিভিন্ন স্কিন কেয়ার ক্রিম ও অ্যান্টি-এজিং প্রডাক্টে মসৃণতা ও উজ্জ্বলতা আনতে ব্যবহৃত হয়।

 

ঔষধ শিল্প: ক্যাপসুলের বাইরের নরম ও শক্ত যে কভার (ঈধঢ়ংঁষব ঝযবষষ) থাকে, তা তৈরিতে জিলাটিনের ভূমিকা অপরিসীম। মাছের আঁশ থেকে এই জিলাটিন নিষ্কাশন করা হয়।

 

পোল্ট্রি ও মাছের ফিড: শুকনো মাছের আঁশ গুঁড়ো করে তাতে বিদ্যমান ক্যালসিয়াম, প্রোটিন ও ফসফরাস পোল্ট্রি এবং মাছের সম্পূরক খাদ্য (ঋববফ) তৈরিতে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

 

বায়োপ্লাস্টিক ও সার: আধুনিক প্রযুক্তিতে মাছের আঁশ থেকে পচনশীল পরিবেশবান্ধব প্লাস্টিক এবং উন্নতমানের জৈব সারও তৈরি হচ্ছে।

 

কুষ্টিয়া শহরের পরিবেশ সচেতন মহল মনে করছেন, বাজারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এটি একটি দৃষ্টান্তমূলক উদ্যোগ। ফেলে দেওয়া মাছের আঁশ ড্রেন বা নর্দমায় গিয়ে পানি প্রবাহ বন্ধ করে দিত এবং পচে গিয়ে মারাত্মক দুর্গন্ধ ছড়াত।

 

স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের মতে, সরকারি বা বেসরকারিভাবে যদি এই ক্ষুদ্র সংগ্রাহকদের কারিগরি সহায়তা বা সহজ শর্তে অর্থায়নের ব্যবস্থা করা যায়, তবে কুষ্টিয়ার এই ‘মাছের আঁশ’ ব্যবসা ভবিষ্যতে আরও বড় অর্থনৈতিক ক্ষেত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর