খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ই জুলাই ২০২৬, ২:৪৫ এএম

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ের বহুল আলোচিত নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় এবার সরাসরি তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জাহাঙ্গীর আলমকে দায়ী করলেন কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আমির হামজা। জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি দাবি করেছেন, সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠকে প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় জাহাঙ্গীর আলমকে মূল দায়ী ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, তদন্তে একাধিক ব্যক্তির নাম উঠে এলেও ঘটনার প্রায় আট মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও তাদের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান প্রশাসনিক বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
গত ৭ জুলাই জাতীয় সংসদে দি পাবলিক এক্সামিনেশন অফেন্স (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬-এর ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে আমির হামজা বিষয়টি উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, বিলটির উদ্দেশ্য ও কারণের সঙ্গে তিনি নৈতিকভাবে একমত হলেও এত গুরুত্বপূর্ণ আইন সংসদীয় কমিটিতে পাঠিয়ে জনমত যাচাই করা উচিত। একই সঙ্গে তিনি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় নকল ও প্রশ্নফাঁস বন্ধে কঠোর এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। বক্তব্যে তিনি বলেন, বিগত সরকারের সময় বিভিন্ন খাতের মতো শিক্ষা ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের প্রতি আরও যত্নশীল হতে হবে এবং তাদের ওপর হঠাৎ করে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
এরপর তিনি কুষ্টিয়ার বহুল আলোচিত প্রশ্নফাঁসের ঘটনা তুলে ধরে বলেন, প্রায় আট মাস আগে সংঘটিত ওই ঘটনার এখনো কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। সংসদ সদস্য জানান, কয়েকদিন আগে তিনি এ বিষয়ে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ডেকে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে সিভিল সার্জন তাকে জানিয়েছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তদন্তে তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জাহাঙ্গীর আলমের নাম প্রধানভাবে উঠে এসেছে।
কিন্তু এতদিনেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিষয়টি উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে তিনি জোরালোভাবে দাবি জানান, প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তবে সংসদে বক্তব্য দেওয়ার সময় আমির হামজা ঘটনাটিকে ভুলবশত “কুষ্টিয়ার মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্নফাঁস” হিসেবে উল্লেখ করেন। অথচ কুষ্টিয়া জেলায় কোনো মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় নেই।
পরে অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া যায়, তিনি আসলে ২০২৫ সালের ২৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ের অধীনে ১১৫টি শূন্য পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকেই বোঝাতে চেয়েছিলেন। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৫ সালের ২৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ওই নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পরীক্ষা শুরুর আগের রাতেই বাইরে চলে যায়। প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা পৃথকভাবে তদন্ত শুরু করে। তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র ও সে সময় প্রকাশিত বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসে, প্রশ্নপত্র প্রণয়নের সময় নিয়োগ কমিটির কয়েকজন সদস্য সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে মোবাইল ফোন নিয়ে প্রশ্ন তৈরির কক্ষে প্রবেশ করেন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রশ্ন তৈরির আগেই কক্ষের সিসিটিভি ক্যামেরা খুলে রাখা হয় এবং পুরো প্রক্রিয়াটি নজরদারির বাইরে সম্পন্ন করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিয়োগ কমিটির সদস্য ছিলেন খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মুজিবুর রহমান, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপসচিব শাহাদত হোসেন কবির, সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) খুলনা কার্যালয়ের উপপরিচালক নাসরিন সুলতানা, কুষ্টিয়ার তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ কামাল হোসেন এবং কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জাহাঙ্গীর আলম। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রশ্নপত্র প্রণয়নের সময় উপসচিব শাহাদত হোসেন কবির, পিএসসির উপপরিচালক নাসরিন সুলতানা এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর আলম নিয়ম ভেঙে মোবাইল ফোন নিয়ে প্রশ্ন তৈরির কক্ষে প্রবেশ করেন।
জেলা প্রশাসনের কর্মচারী মাহাবুবকে দিয়ে প্রশ্নপত্র কম্পোজ করানো হয়, যাকে সেখানে নিয়ে আসেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর আলম। তদন্তে আরও অভিযোগ ওঠে, প্রশ্ন তৈরির সময় নাসরিন সুলতানা একাধিকবার কক্ষের বাইরে গিয়ে মোবাইলে কথা বলেন এবং সেই সময়ই প্রশ্ন বাইরে পাঠানো হয় বলে তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা। এদিকে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) হোসেন ইমাম ও তাঁর ভাই উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (স্যাকমো) হাসান ইমাম নান্নুর বিরুদ্ধেও প্রশ্নফাঁস চক্রে সক্রিয় ভূমিকার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ প্রকাশের পর তারা ছুটিতে চলে যান।
তদন্তের অংশ হিসেবে দুদক তাদের সংশ্লিষ্ট একাধিক মোবাইল ফোন, হাতে লেখা প্রশ্নপত্র এবং সিসিটিভি-সংক্রান্ত আলামত জব্দ করে। তদন্তে জব্দ করা একটি মোবাইল ফোনে প্রশ্নপত্রের অংশবিশেষ পাওয়া গেছে বলেও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র সে সময় জানায়। ঘটনার পর দুদকের কুষ্টিয়ার তৎকালীন উপপরিচালক মইনুল হাসান রওশনী বলেছিলেন, জব্দ করা আলামত ও মোবাইল ফোন পর্যালোচনায় অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে এবং তদন্ত চলমান রয়েছে। অন্যদিকে নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব ও তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. কামাল হোসেনও প্রকাশ্যে বলেছিলেন, প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় হোসেন ইমাম, নান্নুসহ আরও অনেকে জড়িত। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক খায়ের আহমেদ চৌধুরীও সে সময় আশ্বাস দিয়েছিলেন, প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। কিন্তু সেই আশ্বাসের প্রায় আট মাস পরও তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান প্রশাসনিক কিংবা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্যও প্রকাশ্যে আসেনি। একই সঙ্গে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে বিতর্কিত নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল করে নতুন নিয়োগ পরীক্ষার তারিখও ঘোষণা করা হয়নি। ফলে চাকরিপ্রত্যাশী শত শত প্রার্থী এখনও চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এদিকে সংসদ সদস্য আমির হামজার বক্তব্যে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের নাম উল্লেখ করে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্য উদ্ধৃত হওয়ায় ঘটনাটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তদন্ত, প্রশাসনিক নীরবতা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রশ্নফাঁসের মতো স্পর্শকাতর ঘটনায় তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা শুধু চাকরি প্রত্যাশীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করছে না, বরং সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলছে। তাই দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষীদের আইনের আওতায় আনা এবং বিতর্কিত নিয়োগ পরীক্ষার বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত জানানো এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। এ বিষয়ে তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জাহাঙ্গীর আলমের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জাহাঙ্গীর আলম বর্তমানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট (এডিএম) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য