খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২ই জুলাই ২০২৬, ২:২৬ এএম

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পৌরসভার ২০ নম্বর ওয়ার্ডের জগতি রেল স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় বাংলাদেশ রেলওয়ের লিজ দেওয়া সরকারি জমি অবৈধভাবে প্লট আকারে বিক্রি, দখল এবং পুকুর খননের অভিযোগে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কৃষি কাজের জন্য লিজ নেওয়া প্রায় ১ একর ৫০ শতক (প্রায় ১৫০ শতক) সরকারি জমিকে ব্যক্তিমালিকানার সম্পত্তির মতো ব্যবহার করে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে কাঠা হিসেবে বিক্রি করছে। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন লিজগ্রহীতা দেলোয়ার, আর তার সহযোগী হিসেবে রাজীব, শহিদুল, আরিফ, মিজানসহ আরও কয়েকজনের নাম স্থানীয়দের অভিযোগে উঠে এসেছে।
স্থানীয়দের দাবি, সরকারি জমি বিক্রির কোনো আইনি সুযোগ না থাকলেও সিন্ডিকেটটি সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। কেউ ৪০ হাজার, কেউ আবার ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রতি কাঠা দরে সরকারি জমি কিনেছেন বলে দাবি করছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই মৌখিক আশ্বাসে টাকা নেওয়া হয়েছে। অনেককে ভবিষ্যতে লিজ বা দলিল করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। সরেজমিনে দেখা যায়, জগতি থেকে পোড়াদহগামী রেললাইনের বাম পাশে অবস্থিত রেলওয়ের ওই জমির বড় একটি অংশে বিশাল আকৃতির পুকুর খনন করা হয়েছে।
বিভিন্ন স্থানে মাটি ভরাট করে দখলের চিহ্নও স্পষ্ট। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব কাজের মাধ্যমে সরকারি জমি ব্যক্তিগত মালিকানার মতো ভাগ-বাটোয়ারা করে বিক্রি করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রবীণ মো. সাঈদ হোসেন মণ্ডল বলেন, আমি নিজেই দেলোয়ারের কাছ থেকে প্রতি কাঠা ৪০ হাজার টাকা দরে ৬ কাঠা জমি কিনেছি। তিনি বলেছিলেন, পরে আমাদের নামে লিজ অথবা স্থায়ী দলিল করে দেবেন। সেই বিশ্বাসেই টাকা দিয়েছি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু স্থানীয়রাই নন, বাইরের অনেক মানুষের কাছেও একই জমি প্রতি কাঠা ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করা হয়েছে। এলাকার বাসিন্দা ও অভিযুক্তদের একজন শহিদুল বলেন, যার নামে ডিসিআর কাটা হয়েছে তিনি বিদেশে চলে যাবেন। তাই কিছু টাকা নিয়ে জমি দিয়ে দিচ্ছেন। আমিও ৬ কাঠা নিয়েছি। ডিসিআর কাটার জন্য ২৫ হাজার টাকা দিয়েছি। সরকারি জমি জেনেও কেন কিনেছেন—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, সে দিচ্ছে, আমরা নিচ্ছি। সরেজমিনে দেখা যায়, সরকারি জমির একটি বড় অংশে রাজীব নামে এক ব্যক্তি পুকুর খনন করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পাশের জমি আমার, তাই দখল করে পুকুর কেটেছি। লিজ নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তবে লিজ ছাড়া সরকারি জমি দখল করে পুকুর খনন আইনসম্মত কি না—এ প্রশ্নে তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, “আমাকে প্রশ্ন করার এখতিয়ার আপনাকে কে দিয়েছে? আমার সামনের জমি আমি বুঝব, রেল কর্তৃপক্ষ বুঝবে। আপনার মতো ইউটিউব সাংবাদিক অনেক আছে।” এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। অভিযোগের বিষয়ে দেলোয়ার বলেন, জমি আমার নামে লিজ রয়েছে। আমি কোনো জমি বিক্রি বা কাউকে হস্তান্তর করিনি। কৃষি জমি হিসেবে লিজ নিয়েছি। তবে জমি বিক্রি না হলে কীভাবে সেখানে একাধিক ব্যক্তি দখল নিয়ে মাটি ভরাট ও পুকুর খনন করছেন—এ প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়েই তিনি ফোন কেটে দেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ- দেলোয়ার, রাজীব, শহিদুল, আরিফ, মিজানসহ একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে সরকারি জমি প্লট আকারে বিক্রি করে আসছে। তাদের প্রভাবের কারণে কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার সাহস পান না। ফলে রেলওয়ের মূল্যবান সম্পত্তি ধীরে ধীরে বেদখল হয়ে ব্যক্তিমালিকানার মতো হাতবদল হচ্ছে। পোড়াদহ রেলস্টেশনের কানুনগো মনিরুল ইসলাম বলেন, জায়গাটি দেলোয়ার নামে একজনকে লিজ দেওয়া হয়েছে। তিনি অন্য কাউকে জমি দিতে চাইলে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। সরাসরি জমি বিক্রির কোনো বিধান নেই।
অভিযোগের সত্যতা পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাংলাদেশ রেলওয়ে পাকশী বিভাগের বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা (ডিইও) বলেন, রেলওয়ের লিজ নেওয়া জমি কোনো অবস্থাতেই বিক্রি করা যাবে না। কৃষি কাজের জন্য লিজ নেওয়া হলে সেই জমির শ্রেণি পরিবর্তন কিংবা অন্য কাজে ব্যবহারও করা যাবে না। অভিযোগ তদন্ত করে প্রমাণ পাওয়া গেলে লিজ বাতিলসহ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভূমি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সরকারি লিজের জমি বিক্রি, প্লটিং, শ্রেণি পরিবর্তন কিংবা অন্যের কাছে হস্তান্তর সম্পূর্ণ বেআইনি।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে লিজ বাতিল, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলাসহ কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, রেলওয়ের প্রায় দেড় একর সরকারি সম্পত্তি দখল ও প্লট বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত দেলোয়ার, রাজীব, শহিদুল, আরিফ, মিজানসহ পুরো সিন্ডিকেটকে চিহ্নিত করে দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে সরকারের মূল্যবান সম্পত্তি রক্ষা পায় এবং সাধারণ মানুষ প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা পান।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য