কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ ২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্রজনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর ১৩ আগষ্ট থেকে কুষ্টিয়া-রাজাবাড়ী আঞ্চলিক মহাসড়কের কুমারখালীর সৈয়দ মাসুদ রুমী সেতুতে টোল আদায় বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘ প্রায় ২০ মাস বন্ধ থাকার পর আগামী ১০ এপ্রিল আবারও সেতুতে টোল চালু হতে যাচ্ছে। সেই লক্ষ্যে গতকাল মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) দুপুর ১২টার দিকে টোলপ্লাজা এলাকা পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসন, পুলিশ, সওজের কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল।
পরিদর্শন শেষে তারা টোলপ্লাজার কার্যালয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভায় বসেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কুষ্টিয়া স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক (উপসচিব) আহমেদ মাহবুব উল ইসলাম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাভিদ সারওয়ার, সড়ক ও জনপদের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ মনজুরুল করিম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) শিকদার মো. হাসান ইমাম প্রমূখ।
এরপর দুপুর ১২ টা ৪৫ মিনিটের দিকে শতাধিক বৈষম্যবিরোধী ছাত্রজনতা, সিএনজি চালক ও স্থানীয়রা এসে কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে তাদের তোপের মুখে দুপুর ১টার দিকে বৈঠকে বসা কর্মকর্তারা টোলপ্লাজা ছেড়ে চলে যান। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, টোলপ্লাজার কার্যালয়ের সামনে শতাধিক মানুষ বিক্ষোভ করছেন। এসময় নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার। টোলের নামে চাঁদাবাজি, চলবেনা চলবেনা শ্লোগান দিচ্ছিলেন।
কিছুক্ষণ পর থানা পুলিশের সহযোগীতায় সরকারি গাড়ি করে কর্মকর্তাদের চলে যেতে দেখা যায়। এ সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র নেতা পরিচয় দেওয়া নয়ন হোসেন রবিন বলেন, ৫ আগষ্ট বিজয়ের পর থেকে টোল আদায় বন্ধ রয়েছে। কিন্তু সরকারি আমলারা রাজনৈতিক নেতা ও ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে যোগসাজশ করে নতুন করে আবার টোল চালুর পায়তারা করতেছে। কিন্তু আমরা বলে দিতে চাই। জনগণই সরকার।
সরকার যে রায় দিবে জনগণ সেইটা মানতে বাধ্য নয়। জনগণ যে রায় দেবে সরকার সেইটা মানতে বাধ্য। আর সরকার যদি জনগণের সঙ্গে পাঙ্গা নেওয়ার চেষ্টা করে তাহলে জনগণ বুঝিয়ে দেবে জনগণ কি জিনিস?। সুতরাং এখানে যদি, কিন্তু উহ ছাড়া টোলঘর বন্ধ করতে হবে। স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই আজকের মধ্যে টোলঘর ভাঙতে হবে। নয়লে ছাত্রজনতা সবাই মিলে নিজ উদ্যোগে ভেঙে দিবে।
কুমারখালী বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলন কমিটির সাবেক মুখপাত্র আশরাফুল ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে ছাত্রজনতা সর্বপ্রথম এই টোল বন্ধের কাজ করে। পরবর্তীতে বিভিন্ন আন্দোলন হলে সরকারী কর্মকর্তারা টোল বন্ধের আশ্বাস দেন। কিন্তু নির্বাচনের পর আজ আবার টোল চালুর পায়তারা চলছে। তবে ছাত্রজনতা এক দফা এক দাবি। এই টোল আর কোনোদিন চালু হবেনা।
কুমারখালী সিএনজি মালিক সমিতির সভাপতি মনজুর আলম চুন্নু বলেন, গ্যাসের দাম বেশি। দ্রব্যমূল্যের দাম বৃদ্ধি। টোল চালু হলে প্রতিদিন অন্তত ১০০ টাকা করে দেওয়া লাগবে। এতে চালকরা ক্ষতিগ্রস্থ হবে। সেজন্য টোল বন্ধের জন্য দাবি জানাতে এসেছি আজ। পরবর্তীতে টোল বন্ধ না হলে কঠোর আন্দোলন করা হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিক্ষোভকারী বলেন, টোল আদায় চালুর খবর শুনে কয়েকশ মানুষ বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে কর্মকর্তারা দ্রুত পালিয়ে যান। এলাকাবাসী দীর্ঘদিন ধরে টোল বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছেন।
সওজ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৪ সালে ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী আঞ্চলিক মহাসড়কের গড়াই নদীর ওপর সেতু নির্মাণ করে সওজ। এই সেতু ইজারা থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৫০ কোটি টাকা আয় হয়েছে। সেতুটি ঢাকা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, শরিয়তপুর, মাদারীপুরসহ বরিশাল বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম।
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর টোল আদায় বন্ধের দাবিতে টোলপ্লাজায় আগুন লাগিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা। এর পর ১৩ আগস্ট সওজ কর্তৃপক্ষ টোল আদায় করতে গেলে বিক্ষুব্ধ জনতা বাধা দেয়। এর পর থেকে সেতুতে টোল আদায় বন্ধ রয়েছে। এতে প্রতিদিন ৩-৪ লাখ টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
গত ২০ মাসে অন্তত ১৮ কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়েছে সরকার। সেজন্য চলতি বছরের ১০ মার্চ নতুন করে দরপত্র আহবান করে সওজ। সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ২৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকায় টোল আদায়ের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স থ্রী স্টার এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিস। প্রতিষ্ঠান ১২ কিস্তিতে টাকা পরিশোধের মাধ্যমে তিনবছর টোল তুলতে পারবেন। আগামী ১০ এপ্রিল থেকে ঠিকাদার টোল আদায় শুরু করবেন।
প্রতিদিন অন্তত ৩ লাখ টাকা হিসেবে টোল আদায় বন্ধ থাকায় সরকার ইতোমধ্যে প্রায় ১৮ কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়েছে বলে জানিয়েছেন কুষ্টিয়া সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ মনজুরুল করিম। তিনি বলেন, সম্প্রতি ২৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকায় ইজারা হয়েছে। ১০ এপ্রিল থেকে টোল আদায় শুরু। সেই লক্ষ্যে জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি টোলপ্লাজা এলাকা পরিদর্শন করেছে। কিছু লোক এসেছিল। তবে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
এ বিষয়ে ক্যামেরায় কথা বলতে রাজি হননি কুমারখালীর ইউএনও ফারাজানা আখতার।
তবে থানার ওসি জামাল উদ্দিন বলেন, সরকারি রাজস্বের জন্য টোলপ্লাজা টেন্ডার হয়েছে। টোল চালুর জন্য প্রশাসনের একটি টিম পরিদর্শন শেষে আলোচনায় বসেন। যারা টোল বন্ধ করতে চান তারাও এসে কিছু দাবিদাওয়া করেছেন। দাবি গুলো নিয়েই তারা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বসে সমাধান করবেন। এখানে আইন-শৃঙ্খলা অবনতির মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি।
