রয়েছে বিকল্প খেলার মাঠ
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ বিশাল খেলার মাঠ রয়েছে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে। তবে সে মাঠে তেমন একটা খেলাধুলার আয়োজন চোখে পড়েনা। কলেজ কর্তৃপক্ষ মাঠটি বাশার ক্রিকেট একাডেমিকে ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে রেখেছে। ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত এই একাডেমি সকাল-বিকাল মাঠের একাংশ ব্যবহার করে সেখানে কিশোর-তরুণদের ক্রিকেট খেলা শেখাই। বাকি মাঠে অন্যান্যরা খেলাধুলা করে থাকে।
কলেজের বিশাল এই খেলার মাঠ বাদ রেখেই আন্তঃবিভাগীয় (কলেজের নিজস্ব বিভাগের মধ্যে) ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজনের নামে প্যান্ডেল তৈরির জন্য রাতের আঁধারে কেটে ফেলা হলো প্রায় ২০ টির মত গাছ। বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকরা মিলে তাদের নিজ হাতে লাগিয়েছিলেন এই গাছ গুলো। এমনকি শিক্ষকরা নিজেরাই পালা করে নিয়মিত গাছগুলোর পরিচর্যা করে আসছিলেন। রাতের আঁধারে এই গাছ কেটে ফেলার ঘটনায় চরম ক্ষুব্ধ কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
গতকাল মঙ্গলবার (৫ মে) সকালে কলেজে এসে গাছ কেটে ফেলার বিষয়টি জানতে পেরে শিক্ষকরা তাৎক্ষণিকভাবে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। তদন্ত কমিটি গঠন করে এ ঘটনার সাথে জড়িতদের চিহ্নিতকরণ ও শাস্তি মূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে কলেজের অধ্যক্ষ বরাবর লিখিত আবেদন করেন। এদিকে এ ঘটনায় কলেজ কর্তৃপক্ষ একটি কমিটি গঠন করেছে। তিন দিনের মধ্যে তদন্ত করে রিপোর্ট দাখিলের জন্য বলা হয়েছে।
গতকাল দুপুরে সরেজমিনে কলেজে গিয়ে দেখা যায় বাঁশ দিয়ে প্যান্ডেল তৈরি হচ্ছে। বৃহস্পতিবার (৭ মে) আন্তঃবিভাগীয় ফুটবল টুর্নামেন্ট উদ্বোধন করার কথা রয়েছে। শিক্ষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, কলেজের ১০ তলা বিজ্ঞান ভবনের সামনে দুই ধারে বেশ কিছু গাছ লাগানো ছিল। যার অধিকাংশই বিরল প্রজাতির পলাশ ফুলের গাছ। এছাড়াও আম গাছসহ দুই একটি ফলের গাছও ছিল।
কলেজের উপাধ্যক্ষ প্রফেসর ড. আব্দুল লতিফ জানান, ”মঙ্গলবার সকালে গাছ কেটে ফেলার বিষয়টি জানতে পেরে সেখানে ছুটে যায়। গিয়ে দেখি এক দিকের (প্রায় ২০ টির মত) সব গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এর মধ্যে কলেজের প্রয়াত শিক্ষক পদার্থ বিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুপক কুমার ঘোষের স্মৃতি রক্ষার্থে তাঁর স্ত্রীর হাতে লাগানো একটি এবং রুপালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষের লাগানো একটি গাছও রয়েছে। রাতের আঁধারে গাছ গুলো কেটে ফেলে ১০ তলা ভবনের পাশে বিদ্যুৎ এর ঘরের পেছনে ফেলে রাখা হয়েছে।
প্রায় এক এবং দুই বছর বয়সের এই গাছগুলো কলেজের শিক্ষকরাই লাগিয়েছিলেন এবং তাঁরাই গাছগুলোর নিয়মিত পরিচর্যা করে আসছিলেন। তিনি আরো জানান, গাছ কর্তনের বিষয়ে জানতে চাইলে ফুটবল টুর্নামেন্ট উদযাপন কমিটির আহবায়ক ইংরেজী বিভাগের শিক্ষক তোফাজ্জেল হোসেন কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি আরো যোগ করেন গাছ কর্তন করতে হলে বন বিভাগসহ সরকারি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দফতরের অনুমতি প্রয়োজন হয়। কলেজের শিক্ষক পরিষদ এবং একাডেমিক কাউন্সিলের অনুমতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই গাছগুলো কাটার ক্ষেত্রে এগুলোর কোন কিছুই মানা হয়নি।
ক্ষোভের পাশাপাশি আক্ষেপ প্রকাশ করে উপাধ্যাক্ষ প্রফেসর ড. আব্দুল লতিফ বলেন, গাছগুলো বড় হচ্ছিল। কিছু দিন পর শিক্ষার্থীরা গাছের ছায়ায় বসতে পারত সেই সুযোগ আর হলো না। রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. মো. রোকনুজ্জামান বলেন, ”সকাল ৯ টার দিকে কলেজে গিয়ে গাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছে বলে জানতে পারি। সাথে সাথে অন্যান্য বিভাগের প্রধানদের ডাকলাম। সৌন্দর্য বৃদ্ধিও পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা যাতে গাছের ছায়ায় বসে সময় কাটাতে পারে সে উদ্দেশ্য নিয়েই আমরা শিক্ষকরা মিলে গাছগুলো লাগিয়েছিলাম। আমরাই পরিচর্যা করতাম। এ ঘটনায় আমরা সবাই হতবাক হয়ে গেছি।
সাথে সাথে আমরা ৬ জন বিভাগীয় প্রধান এ ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে এবং অবিলম্বে তদন্ত কমিটি গঠন করে এ ঘটনার সাথে জড়িতদের চিহ্নিতকরণ ও শাস্তি মূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে কলেজের অধ্যক্ষ বরাবর লিখিত আবেদন করেছি। অধ্যক্ষ ওই সময় কলেজে উপস্থিত না থাকায় আমরা আবেদনটি উপাধ্যক্ষের কাছে জমা দিয়ে এসেছি।”
জানা যায়, গাছ কর্তনের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে আবেদন পত্রে যারা স্বাক্ষর করেছেন তাঁরা হচ্ছেন রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. রোকনুজ্জামান, প্রাণী বিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. আকলিমা খাতুন, গণিত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মো. আবুল কালাম সাজাদ, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক লাল মহম্মদ, উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রুমানা আফরোজ রেশমা এবং পরিসংখ্যান বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক আমজাদ হোসেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলেজের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজনের নামে অধ্যক্ষের নির্দেশে রাতের আঁধারে গাছগুলোকে হত্যা করা হলো। উপাধ্যক্ষ প্রফেসর ড. আব্দুল লতিফ এবং রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. মো. রোকনুজ্জামান ছাড়াও কলেজের একাধিক শিক্ষক জানান, ইতোপূর্বে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতাসহ যত ধরণের খেলাধুলার আয়োজন করা হয়েছে তার সবগুলোই হয়েছে কলেজের বিশাল খেলার মাঠে। হঠাৎ করে চারিদিকে বিল্ডিং দিয়ে ঘেরা খেলাধুলার সম্পূর্ণ অনুপোযোগী মাঠে গাছ কেটে খেলার আযোজন তাদের কাছে কোন ভাবেই বোধ্যগম্য এবং গ্রহণযোগ্য নয়।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোল্লা মো. রুহুল আমীন বলেন, কলেজ ক্যাম্পাসে ছোটখাটো কয়েকটি গাছ ছিল। রাতের অন্ধকারে কে বা কারা গাছগুলো কেটে ফেলে তা আমি জানি না। রাতে যে গার্ড দায়িত্বে ছিল তাকে শোকজ করা হয়েছে। ক্যাম্পাসের মধ্যে এ ধরণের ঘটনা কোনভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। বিষয়টি গুরুত্বেও সাথে দেখা হচ্ছে। সিসি টিভি ফুটেজ এবং অভ্যন্তরীণ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
এ ঘটনায় ইতোমধ্যে এক সদস্যেও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. মো. রোকনুজ্জামানকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং তিন দিনের মধ্যে তদন্ত করে এ বিষয়ে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে।









