খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই জুলাই ২০২৬, ১:৩ এএম

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বটতৈল ইউনিয়নের খাজানগর এলাকার রাইস মিলগুলোর ছাই, ধুলাবালি ও বর্জ্যে দীর্ঘদিন ধরে চরম পরিবেশ দূষণের শিকার হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত খাজানগরে ছোট-বড় প্রায় ৪০০টি রাইস মিল ও অটো রাইস মিল রয়েছে। বেশিরভাগ মিলেই পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় দিন দিন এলাকার পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মিলগুলো থেকে নির্গত ছাই ও ধুলাবালি বাতাসের সঙ্গে ছড়িয়ে আশপাশের বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক ও কৃষিজমিতে জমা হচ্ছে। অনেক মিলে ছাই নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। আবার উৎপাদন প্রক্রিয়ার দূষিত পানি পরিশোধন ছাড়াই সরাসরি পাশের খাল-জলাশয়ে ফেলা হচ্ছে। খাজানগরের বাসিন্দা নুর ইসলাম ব্যাপারী জানান, দীর্ঘদিনের এ দূষণে শিশু, বৃদ্ধ ও সাধারণ মানুষ শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা, দীর্ঘস্থায়ী কাশি, চোখে জ্বালাপোড়া ও চুলকানিসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
ঘরের আসবাব, কাপড়চোপড় ও খাবার পর্যন্ত ছাইয়ে ঢেকে যায়। বারবার অভিযোগ করেও কোনো পদক্ষেপ মেলেনি। সম্প্রতি এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসকের নির্দেশনায় রাইস মিলের দূষণ রোধে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রককে সভাপতি এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালককে সদস্যসচিব করে ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। গতকাল বুধবার (২৯ জুলাই) সকাল ১১টা থেকে কমিটি খাজানগরের পাঁচটি রাইস মিলে সরেজমিন পরিদর্শন ও তদন্ত চালায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, সনি এগ্রো ফুড, জাহিদ অটো রাইস মিল, শামীম এগ্রো ফুড প্রোডাক্টস, মা-বাবার দোয়া ও সাজিম রাইস মিলে বর্জ্য পানি নিষ্কাশনের আধুনিক ব্যবস্থা নেই এবং তা সরাসরি খাল-জলাশয়ে ফেলা হচ্ছে। সনি এগ্রো ও জাহিদ অটো রাইস মিলে ছাই নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি অনুপস্থিত। স্থানীয়রা কমিটির কাছে অভিযোগ করেন, মিলগুলোর কারণে শিশুদের শ্বাসকষ্ট ও অ্যাজমা বাড়ছে, চোখে ছাই ঢুকে প্রদাহ ও ত্বকে চুলকানি হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিজমিও।
তারা শিল্পের বিরোধী নন, তবে দূষণকারী মিলগুলোতে ডাস্ট কালেকশন ও বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন, বর্জ্য পানি পরিশোধন নিশ্চিত করা এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মিত তদারকির দাবি জানান। কুষ্টিয়া জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন প্রধান বলেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশনায় গঠিত যৌথ পরিদর্শন টিমকে আমরা সাধুবাদ জানাই। আমরা সবাই দূষণমুক্ত খাজানগর চাই। শিল্পের কার্যক্রম চলমান থাকবে, পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও দূর করতে হবে। এ বিষয়ে মিল মালিকদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কমিটির সদস্য কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী পরিচালক (ভূমি ও রাজস্ব) আমিনুল ইসলাম বলেন, আজকের যৌথ পরিদর্শনে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে এবং তদন্ত কমিটির সিদ্ধান্ত ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কুষ্টিয়ার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এমদাদুল হক বলেন, রাইস মিলগুলো সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিবেশ সুরক্ষার ব্যবস্থা নিয়েছে কি না, তা যাচাই করা হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থা নেই, তাদের সংশোধনের জন্য যৌক্তিক সময় দেওয়া হবে। নইলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কুষ্টিয়া জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আল-ওয়াজিউর রহমান বলেন, মাঠপর্যায়ে প্রথম অভিযান পরিচালিত হয়েছে। পরিদর্শনে ছাই ব্যবস্থাপনা, তরল বর্জ্য নিষ্কাশন ও সড়কের অপব্যবহারসহ বেশ কিছু অনিয়ম নজরে এসেছে। সংশ্লিষ্ট মিল মালিকদের মৌখিকভাবে অবহিত করা হয়েছে। শিগগিরই লিখিতভাবেও জানানো হবে এবং সংশোধনের জন্য যৌক্তিক সময় দেওয়া হবে। নির্ধারিত সময়ে সংশোধন না হলে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য