কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কখনো জাপটে ধরে কখনো পিছু নেয়, ক্যাম্পাসে-বাইরে আতঙ্কে ইবির ছাত্রীরা

ইবি প্রতিনিধি ॥ কখনো বাসে গা ঘেঁষে বসা, কখনো পথে পিছু নেওয়া, আবার কখনো জাপটে ধরে শারীরিকভাবে হেনস্তা—ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা এমন নানা ঘটনার সাক্ষী হচ্ছেন প্রতিনিয়তই। ক্যাম্পাসের ভেতরের নির্জন সড়ক থেকে শুরু করে যাতায়াতের বাস, স্থানীয় বাজার ও আশপাশের এলাকাতেও বহিরাগত ও বখাটেদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করছেন শিক্ষার্থীরা। তবে ভয়, সামাজিক সংকোচ ও অভিযুক্তদের পরিচয় না জানায় অনেকেই এসব ঘটনায় লিখিত অভিযোগ জানানোর ব্যাপারে পিছিয়ে যান। ফলে অভিযুক্তদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে।

এতে বাড়ছে আতঙ্ক, ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ শহরে এবং ক্যাম্পাসের আশপাশের এলাকায় থাকেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার পথে গণপরিবহনে ও পথ চলাচলের সময় প্রায়ই বহিরাগতদের কাছ থেকে তারা অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের শিকার হন। ফোকলোর অ্যান্ড সোস্যাল স্টাডিজ বিভাগের ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থী বলেন, প্রায়ই শহরে যাওয়ার সময় গড়াই-রূপসা বাসে আমি বহিরাগত দ্বারা অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের শিকার হই। কিছুটা আতঙ্ক নিয়ে চলতে হয় তাই বেশি সতর্ক থাকি।

হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজম্যান্ট বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে বহিরাগতরা উঠে পাশে বসেন এবং সুযোগ পেলেই গা ঘেঁষে বসার চেষ্টা করেন। প্রতিবাদ করলে তারা এমনভাবে আচরণ করেন, যেন কিছুই ঘটেনি। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের বিভিন্ন মেসে থাকেন ইবির নারী শিক্ষার্থীরা। দৈনন্দিন কেনাকাটাসহ নানা প্রয়োজনে তাদের শেখপাড়া বাজারে যাতায়াত করতে হয়। বাজারে যাওয়া-আসার পথে অনেক শিক্ষার্থী বখাটেদের নানা ধরনের হয়রানির শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে ক্যাম্পাসের নির্জন সড়কগুলোতেও ইভটিজিংয়ের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

অর্থনীতি বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘শেখপাড়ায় বাজার করতে গেলে এক ব্যক্তি দোকানে বসে আমাকে লক্ষ্য করছিলেন। একপর্যায়ে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার শরীরে হাত দেন। আমি রাগী চোখে তাকালে লোকটি দ্রুত সেখান থেকে চলে যান। প্রায়ই এ ধরনের ঘটনা অনেকের সঙ্গেই ঘটে।’ শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের সাদিয়া খাতুন বলেন, ক্যাম্পাসের ভেতরেই সন্ধ্যার দিকে বহিরাগত কয়েকজনের দ্বারা হয়রানির শিকার হয়েছি। এক দিন মাগরিবের আজান হচ্ছিল। কয়েকজন বখাটে পেছন পেছন এসে শিস দিচ্ছিল আর পিছু নিয়ে ‘আপু আপু’ বলে ডাকছিল। কোনো যানবাহনও পাচ্ছিলাম না।

একপর্যায়ে ভয়ে দৌড়ে সেখান থেকে চলে আসি। ভয়াবহ হেনস্তার শিকার হন আইন বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের ফারিহা তাসনিম। তিনি বলেন, ২৩ জুন দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে পরীক্ষা শেষে মেসের সামনে পৌঁছালে পেছন থেকে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি নিঃশব্দে এসে আমাকে ঝাপটে ধরে এবং শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দেন। আমার চিৎকার শুনে মেসের ম্যানেজার এগিয়ে এলে ওই ব্যক্তি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দিয়ে চলে যান। লোকটিকে সামনে দেখলে আমি শনাক্ত করতে পারব। একই ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও কয়েকজন ছাত্রীকে পথেঘাটে কুপ্রস্তাব দিয়ে উত্ত্যক্ত করে আসছে।

এমনকি মেসের কয়েকজন শিক্ষার্থীও ওই ব্যক্তির মাধ্যমে বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন। ভুক্তভোগী সাদিয়া খাতুন এবং ফারিহা তাসনিম কেউই হয়রানির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেনকিনা জানতে চাইলে তারা জানান, যৌন হয়রানি প্রতিরোধকল্পে গঠিত কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কে তারা অবগত নন। এছাড়া ভয় ও মানহানির শঙ্কায় তারা অভিযোগ করতেও সাহস পাননি। শিক্ষার্থীরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে কমিউনিটি সেন্টার থেকে থানার গেট পর্যন্ত সড়কটিও বেশ নির্জন। ফলে সন্ধ্যার পর ওই পথে চলাচলে আতঙ্কে থাকেন তারা।

সম্প্রতি ওই স্থানে হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন ল অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেমন বিভাগের ২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থী। তার ভাষ্যমতে, দুপুরে আমি হোস্টেলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার সময় ১৫-১৬ বছর বয়সী এক কিশোর ভ্যান চালিয়ে যাচ্ছিল। ভ্যানে থাকা আরেক তরুণ হাতে সিগারেট নিয়ে আমাকে অশালীন অঙ্গভঙ্গি করে। প্রথমে বিষয়টি গুরুত্ব না দিলেও পরে ওই তরুণ বিভিন্নভাবে আমার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে এবং পাশে বসার জন্য ইশারা করে। এর আগেও আমি একই ব্যক্তিকে কয়েকবার দেখেছি এবং প্রতিবারই সে আমাকে উত্যক্ত করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর শাহিনুজ্জামান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের হয়রানির অভিযোগ সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য যৌন হয়রানি প্রতিরোধকল্পে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ বিষয়ে কমিটির সদস্যরা কাজ করছেন। তবে আমাদের কাছে লিখিত অভিযোগ করলে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা বহিরাগত নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি প্রতিরোধকল্পে গঠিত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. বেগম রোকসানা মিলি ঢাকা পোস্টকে বলেন, কোনো ভুক্তভোগী চাইলে নির্ধারিত ফরমে লিখিত অভিযোগ দিতে পারবেন। অভিযোগ পাওয়ার পর আমাদের কমিটি উভয় পক্ষকে ডেকে তাদের বক্তব্য শুনে তদন্তের মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। অভিযোগের ধরন অনুসারে হাইকোর্টের নীতিমালার আওতায় পড়ে কি না, তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অভিযোগ নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ও আচরণবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হবে। তিনি আরও জানান, অভিযোগের নির্ধারিত ফরম যৌন হয়রানি প্রতিরোধকল্পে গঠিত কমিটির সদস্য-সচিব ইব্রাহিম খলিলের কাছ থেকে সংগ্রহ করে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী অভিযোগ করতে পারবেন। হয়রানির শিকার শিক্ষার্থীদের ০১৯২৪৫৫২৭৫৪ ও ০১৮৭৫০৯০১২৫ নম্বরে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি। যৌন হয়রানি প্রতিরোধকল্পে গঠিত কমিটির সদস্য আল ফিকহ অ্যান্ড ল বিভাগের অধ্যাপক ড. হামিদা খাতুন বলেন, বিষয়টি নিয়ে এখনো মেয়েদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলার মতো পরিবেশ পুরোপুরি তৈরি হয়নি। তবে আমরা আমাদের কাজ করে যাচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় নবীনবরণ অনুষ্ঠানে প্রথম দিনেই নবীন শিক্ষার্থীদের হাতে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও অভিযোগের বিষয়ে আমাদের একটি ছোট নির্দেশিকা তুলে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ভবনের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কোথায় অভিযোগ করতে হবে, সে বিষয়ে ব্যানার টানানো হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে আমরা সচেতনতামূলক কর্মসূচি শুরু করেছি।

 

Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর