আজ ৯ আগস্ট। ১৯৭১ সালের প্রেক্ষাপটে আজকের তারিখটি বাংলাদেশের জন্য একটি বিশেষ দিন। কারণ আজকের দিনেই সেই ভারত-সোভিয়েত শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় কেবল রণাঙ্গনে অস্ত্রের লড়াই চলেনি, সমান্তরালে পরিচালিত হয়েছিল এক তীব্র ও জটিল তথ্যযুদ্ধ। আধুনিক ডিজিটাল যোগাযোগমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা স্যাটেলাইট টেলিভিশনের অনুপস্থিতির এই যুগে যুদ্ধক্ষেত্রের সঠিক তথ্য বহির্বিশ্বে পৌঁছানো ছিল অত্যন্ত দুরূহ। এই যোগাযোগের সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও তাদের দোসররা বিশ্বজুড়ে পরিকল্পিত অপপ্রচার চালিয়েছিল।ই বৈশ্বিক কুয়াশা ভেদ করে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের সত্য তুলে ধরতে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী যে দূরদর্শী ও সাহসী কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তা বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে বিরল।

Table of Contents
Toggleতথ্য গোপনের অপচেষ্টা ও পাকিস্তানি প্রোপাগান্ডার স্বরূপ
২৫ মার্চ কালরাতে অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নৃশংস গণহত্যা শুরু করে, তখন তারা প্রথমেই বিদেশি সাংবাদিকদের ঢাকা থেকে বহিষ্কার করে সংবাদ মাধ্যমগুলোর ওপর কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করে। বিশ্ববাসীর চোখ ফাঁকি দিতে পাকিস্তান সরকার বিশ্বমঞ্চে প্রচার করতে থাকে যে, এটি মূলত অভ্যন্তরীণ “গৃহযুদ্ধ” বা কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদীর অপতৎপরতা। তারা দাবি করে যে, বাংলার মাটিতে কোনো ধরনের গণহত্যা বা মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়নি, বরং পাকিস্তানি সেনারা কেবল আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করছে। পশ্চিমা বিশ্বের একটি বড় অংশ শুরুতে এই প্রোপাগান্ডার ফাঁদে পা দিয়ে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করেছিল।
এক কোটি শরণার্থীর চাপ ও ভারতের কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতা
পাকিস্তানি বর্বরতার শিকার হয়ে প্রাণ বাঁচাতে প্রায় এক কোটি বাঙালি নারী-পুরুষ ও শিশু ঘরবাড়ি ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম ও মেঘালয়ের সীমান্ত অঞ্চলে তাবু গেড়ে থাকা এই বিশাল শরণার্থী শিবিরের খাদ্য, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ভারতের অর্থনীতির জন্য প্রচণ্ড এক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই বিশাল মানবীয় বিপর্যয় দূর করতে তাৎপর্যপূর্ণ কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছিল না। এই বাস্তবতায় ইন্দিরা গান্ধী অনুধাবন করেছিলেন যে, কেবল সীমান্ত খুলে দিয়ে শরণার্থীদের আশ্রয় দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না; বরং মূল সমস্যা সমাধানের জন্য বিশ্ব জনমতকে পক্ষে এনে পাকিস্তানকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতে হবে।
ইন্দিরা গান্ধীর ১৯ দিনের ঐতিহাসিক বিশ্ব সফর
বিশ্ববাসীর সামনে প্রকৃত সত্য তুলে ধরতে ১৯৭১ সালের ২৪ অক্টোবর ইন্দিরা গান্ধী ১৯ দিনের এক ক্লান্তিকর বিশ্ব সফরে বের হন। বেলজিয়াম, অস্ট্রিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স, পশ্চিম জার্মানি এবং যুক্তরাষ্ট্র—এই প্রভাবশালী দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তিনি বাংলাদেশের পরিস্থিতি স্পষ্ট করেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথসহ অন্যান্য ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে তার বৈঠকগুলোতে তিনি পরিষ্কার বুঝিয়ে দেন যে, দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে হলে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার দমনপীড়ন বন্ধ করতে হবে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় অনিবার্য বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে।
হোয়াইট হাউসে রিচার্ড নিক্সনের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও উত্তপ্ত বৈঠক
১৯৭১ সালের ৪ ও ৫ নভেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিন্জারের সঙ্গে ওয়াশিংটনে ইন্দিরা গান্ধীর বৈঠকটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও কূটনৈতিকভাবে টানটান উত্তেজনাকর। হোয়াইট হাউসের তৎকালীন প্রশাসন প্রকাশ্যে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল এবং মুক্তিযুদ্ধকে নিছক একটি “গৃহযুদ্ধ” হিসেবে হালকা করে দেখানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে মার্কিন প্রশাসনের সেই অবস্থানের তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রবক্তা হয়েও তারা কীভাবে একটি পাশবিক সামরিক জান্তার পক্ষ নিচ্ছে। নিক্সন প্রশাসনের বৈরী মনোভাবের মুখেও তিনি তার বক্তব্যে অনড় ছিলেন।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ভাষণ
৬ নভেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক ভাষণ দেন ইন্দিরা গান্ধী। বিশ্ববাসীর উদ্দেশে দেওয়া সেই ভাষণে তিনি পরিষ্কার ভাষায় তুলে ধরেন:
“২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনারা পূর্ববাংলায় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ঘিয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ চরম নির্যাতনের শিকার হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের নেতা শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে পাঠানো হয়েছে। এখন পূর্ববাংলার মানুষ স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার, এবং পরিস্থিতি তাদের পৃথক রাষ্ট্র গঠনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।”
এই ভাষণটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পায় এবং সাধারণ মানুষের বিবেককে নাড়া দিতে সক্ষম হয়।
ইয়াহিয়া খানের বৈঠকের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান
৭ নভেম্বর ফ্রান্স সফরের প্রাক্কালে পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের একটি প্রস্তাব পাঠান। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী আত্মমর্যাদা ও বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের প্রতি অবিচল থেকে সেই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। এই একটিমাত্র সিদ্ধান্ত বিশ্ববাসীর কাছে পরিষ্কার করে দিয়েছিল যে, ভারত কোনো আপস ফর্মুলার জন্য নয়, বরং একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই কাজ করছে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ও বৈশ্বিক জোট গঠন
ইন্দিরা গান্ধীর এই কূটনৈতিক ঝটিকা সফরের ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দ্রুত সমীকরণ বদলাতে শুরু করে। পশ্চিমা দেশগুলোর রক্ষণশীল অবস্থান কিছুটা হলেও নমনীয় হয় এবং বিশ্ব জনমত বাঙালিদের পক্ষে সংগঠিত হতে থাকে। এর পাশাপাশি, ভারতের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে স্বাক্ষরিত ‘ভারত-সোভিয়েত শান্তি, সহযোগিতা ও মৈত্রী চুক্তি’ কেবল সামরিক রক্ষাকবচই ছিল না, এটি জাতিসংঘে যেকোনো আন্তর্জাতিক চক্রান্ত প্রতিহত করার বড় হাতিয়ার ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের কড়া অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্র বা চীন সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সাহস পায়নি।
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে কূটনীতির চূড়ান্ত বিজয়
রণাঙ্গনে মুক্তিসামিকদের গেরিলা আক্রমণ এবং ভারতের সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা—এই দুইয়ের সমন্বয়ে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মস্বীকৃতভাবে পরাজিত হয়। ইন্দিরা গান্ধীর ব্যক্তিগত সাহসিকতা, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং অক্লান্ত বিশ্ব সফর না হলে হয়তো মুক্তিযুদ্ধকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে আরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পক্ষে জোরালো কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে বিশ্ববিবেককে জাগ্রত করা সম্ভব। বাঙালি জাতির মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে ইন্দিরা গান্ধীর এই বিশ্ব সফর এবং কূটনৈতিক যুদ্ধ চিরকাল এক অবিস্মরণীয় সোনালী অধ্যায় হয়ে থাকবে।








