কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ বাউলদের আপ্যায়নের মধ্য দিয়ে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ায় আখড়াবাড়িতে আজ মঙ্গলবার শেষ হচ্ছে একদিনের লালন স্মরণোৎসব। প্রতিবছর দোলপূর্ণিমা তিথিতে তিন দিনের আয়োজন থাকলেও এবার রমজানের কারণে ব্যাপ্তি কমানো হয়েছে। নেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মেলা। সকালে বাল্যসেবা ও দুপুরে পূর্ণসেবার মধ্যদিয়ে শেষ হবে লালনভক্ত বাউল – ফকিরদের সাধুসঙ্গ। গতকাল সোমবার সন্ধায় অষ্টপ্রহরব্যাপী গুরুকার্য্যরে মাধ্যমে শুরু হয় এই চিরাচরিত রীতির সাধুসঙ্গ।
এরআগে, সোমবার দুপুরে আলোচনার মাধ্যমে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন লেখক-চিন্তক ফরহাদ মজহার। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেছেন, লালন একাডেমিতে কোনো গবেষণা ও চর্চা না হওয়ায়। এই এলাকাতেই লালনের বাণীর বিরুদ্ধে অনেক অপপ্রচার করা হয়। এই ভুল বোঝাবুঝির বিনোদন আমাদের আল্লাহ অনেক দুরে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে যেই ধারা, যেই সংস্কৃতি আমাদের আল্লাহ্র নিকটবর্তী করেনা। সেই সংস্কৃতির বিপরীতে আমরা যদি সত্যিকার অর্থে, যেই সংস্কৃতি আমাদেরকে আল্লাহ্র সাক্ষী হতে সহায়তা করে, সেই সংস্কৃতি আমরা কি করে বিকশিত করতে পারি। সেটা আমাদের এই অঞ্চলের আলেমওয়ালা, আকুদা, এমপি রয়েছেন যদি তারা বসতে চান, আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে বসে আমি তাঁদেরকে বুঝাবো। এটা আমাদের স্বার্থের সঙ্গে যাবে।
কারণ তাঁরা আমাদের ভুল বুঝতেছেন। তাঁরা হয়তো এমন কিছু কথা বলছেন যেটার যুক্তি রয়েছে। কোথাও কোথাও অবশ্যয় তাঁদের সঙ্গে অন্যায় হয়েছে। এমনকিছু হয়েছে যা নৈতিক দিক থেকে মেনে নেওয়া যায়না। কিন্তু ফকির লালনের বিরোধিতা করা মানেই আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার পথ থেকে মানুষকে ভুলপথে ঠেলে দেওয়া। এটা অন্যায়। আমি লালন একাডেমির সহায়তা চাই। প্রশাসন সরকারের সহায়তা চাই। ফরহাদ মজহার বলেছেন, কুষ্টিয়াকে একটা সংস্কৃতি – আধ্যাতিক নগরী ও ধর্মচর্চার ক্ষেত্রে তৈরি করতে চাই।
যাতে সারা দুনিয়ার মানুষ এইখানে তীর্থ হিসেবে, সংস্কৃতির একটা মহৎ কেন্দ্র হিসেবে গান বলি, ছবি আঁকা বলি বা যেকোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড করি, যার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর গাঁয়েবের নিকটবর্তী হতে পারি। গাঁয়েব তো ধরা যায়না। গাঁয়েব কেন ধরা দেবে আমিতো মানুষ, মরণশীল। তিনি আরো বলেছেন, আমি মৃত্যুর দ্বারা সীমাবদ্ধ। সুতরাং আমি যা বলি তা কখনই সত্যই সত্য হতে পারেনা। হক একটা মাত্র যাঁর ক্ষেত্রে এই বিশেষণ প্রয়োজন তিনি আল্লাহ। তিনি একমাত্র সত্য। সেই সত্যের নিকটবর্তী যদি আমি হতে চাই, তাহলে যে সংস্কৃতির চর্চা, যে প্রজ্ঞার চর্চা, সাধনার যে ধারা। সেইভাবে
গড়ে তুললে, সেই পথে যদি এগোতে পারি। তাহলে সারা বিশ্বকে এই কুষ্টিয়াতে বসে নেতৃত্ব দিতে পারি। আজকে যে যুদ্ধ – বিগ্রহ চলছে, যে হত্যা চলছে। তার বিপরীতে যার নাম বারবার উচ্চারিত হবে তিনি ফকির লালন সাঁই। ফলে লালনকে যতবেশি চর্চা করতে পারবো, আমরা বিশ্বে ততবেশি নিজেকে হাজির করতে পারবো। আর যদি আমরা তাকে উপেক্ষা করি তাহলে মারাত্মক ভুল করব। আমরা দ্রুতই ক্ষয়ের দিকে বিন্যাসের দিকে যাব। সভায় মুখ্য আলোচক ছিলেন কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. রাশিদজ্জামান ও বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন। এতে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. ইকবাল হোসেন। সংস্কৃতি-বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় লালন একাডেমি এ স্মরণোৎসবের আয়োজন করেছে। বিকেলে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, উৎসবে অংশ নিতে কয়েক দিন আগে থেকেই আখড়াবাড়িতে এসেছেন লালনভক্ত বাউল-ফকিররা। ভাগ হয়ে আসনে বসছেন তারা। কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে লালন ফকিরের গান। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় উপস্থিতি অনেক কম। নেই চিরচেনা জৌলুশ।
এ সময় চট্টগ্রাম থেকে আগত দর্শনার্থী রুপমনাথ বলেন, আমি একজন শিক্ষক। লালন শাহের জাতপাত নেই। তিনি ধর্ম, বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে সবাইকে মানুষ হিসেবে তুলে ধরেছেন। আমরা সবাই একই রক্ষের মানুষ। এই শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে স্ত্রী, সন্তানকে নিয়ে ঘুরতে এসেছি লালনে। ফরিক হৃদয় শাহ বলেন, লালন সাঁইজি দোলপূর্ণিমার তিথিতে সঙ্গীদের নিয়ে দোল উৎসব করতেন। সেই থেকে সাধু পরম্পরা এই উৎসব চলে আসছে। সারাদেশের ভক্তরা ছুটে এসেছে। অষ্টপ্রহর গুরুকার্য ও সাধুসঙ্গ শেষে ফিরে যাবেন গন্তব্যে। জেলা প্রশাসক মো. ইকবাল হোসেন বলেন, মাহে রমজানের কারণে উৎসব সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে চলছে লালন স্মরণোৎসব।
