কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার কুমারখালীর পদ্মা নদীতে নিখোঁজের প্রায় ৩৪ ঘণ্টা পরে পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) সদরুল হাসানের (৪০) মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার (২৯ অক্টোবর) দুপর ২ টা ৫৫ মিনিটের দিকে উটজেলার শিলাইদহ খেয়াঘাট এলাকা থেকে ভাসমান মরদেহটি উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল। এঘটনায় এখনও নিখোঁজ সহকারী উপপরিদর্শক মুকুল হোসেনকে উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।এরআগে দুর্বৃত্তদের জেলেদের হামলায় গত সোমবার ভোরে উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের শ্রীখোল এলাকায় নিখোঁজের ঘটনা ঘটে। এছাড়াও এ ঘটনায় আহত হয়েছেন এক উপ উপরিদর্শক ও দুই ইউপি সদস্য।
এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন উদ্ধার অভিযান পরিচালনাকারী ও কুমারখালী ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সাব অফিসার ফিরোজ আহমেদ। তিনি বলেন, ঘটনাস্থল থেকে আনুমানিক প্রায় দুই কিলোমিটার দুর থেকে ভাসমান অবস্থায় নিখোঁজ পুলিশ সদরুলের মরদেহটি উদ্ধার করা হয়েছে। অপর পুলিশকে উদ্ধারে অভিযান চালানো হচ্ছে।নিহত সহকারী উপপরিদর্শক সদরুল হাসান পাবনার আতাইকুলা থানার কাজিপুর গ্রামের আব্দুল ওহাবের বড় ছেলে। আর নিখোঁজ সহকারী উপরিদর্শক মুকুল হোসেন (৪০)। তিনি মেহেরপুরের কালাচাঁদপুর গ্রামের মৃত আব্দুল লতিফ বিশ্বাসের ছেলে।আহতরা হলেন-কুমারখালী থানার উপপরিদর্শক নজরুল ইসলাম,
কয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর সদস্য ছানোয়ার হোসেন ছলিম ও ৬ নম্বর সদস্য আনোয়ার হোসেন টিটন।কুমারখালী থানার উপপরিদর্শক মোঃ আশরাফুল ইসলাম বলেন, ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলের সহযোগীতায় নিখোঁজের প্রায় ৩৪ ঘণ্টা পরে এএসআই সদরুলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। অপরজনের উদ্ধারে অভিযান চলছে। গতকাল বিকেলে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, মরদেহটি নৌকা থেকে নদীপাড়ে আনা হচ্ছে। মরদেহ দেখতে উৎসুক জনতা ভিড় করেছে। আহাজারিতে ভেঙে পড়েছেন নিহত সদরুলের বাবা আব্দুল ওহাব ও স্ত্রী আদুরি খাতুন। শোকে মাতম পুলিশ ও সহপাঠীরা। তবে এবিষয়ে স্বজনদের কেউ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।একাধিক সুত্র জানায়, পদ্মা ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা চলছে। আইন অমান্য করে নদীতে জেলেরা মাছ ধরছিল।
গত সোমবার রাতে কুমারখালী থানার উপপরিদর্শক নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশের চার সহকারী উপপরিদর্শক ও একজন পুলিশ সদস্য অভিযানের নাম করে নদীতে নামে। তাদের সঙ্গে কয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ছানোয়ার হোসেন ছলিম ও ৬ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য আনোয়ার হোসেন ছিলেন। সেসময় নদীতে জেলেদের ধরা ইলিশ মাছ নিয়ে নেন পুলিশের অভিযানি দলটি। এ নিয়ে বিরোধের জেরে জেলেরা তাদের অতর্কিত হামলা চালালে এ ঘটনা ঘটে।জেলেরা অভিযোগ করেছেন, সাদা পোশাকে আসা পুলিশ সদস্যরা দু’জন ইউপি সদস্যকে নিয়ে অবৈধভাবে ইলিশ শিকারকারী জেলেদের নৌকায় যান। সেখানে থেকে মাছ লুট করে ফিরছিলেন। ডাকাত ভেবে তাদের ওপর হামলা করে জেলেদের একটি অংশ।
সংবাদ পেয়ে জেলেদের নেতারা গিয়ে আহত অবস্থায় একই থানার এসআই মো. নজরুল ইসলাম, কয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. ছলিম ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আনোয়ার হোসেন টিটনকে উদ্ধার করেন। কয়েকজন জেলে জানান, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অসাধু জেলেরা নদীতে মাছ ধরছিল। গভীর রাতে দুই ইউপি সদস্য ও ৬ পুলিশ সদস্য পদ্মা নদীর বেড় কালোয়া যান। তারা অভিযানের কথা বলে কয়েকজন জেলের কাছ থেকে ইলিশ মাছ ও তেল ছিনিয়ে নদীর অন্য প্রান্তে চলে যান। পরে শিলাইদহের শ্রীখোলে তাদের ওপর হামলা হয়।বেড় কালোয়ার জেলে নেতা ইয়ারুল ইসলাম বলেন, রাত আনুমানিক ৩টার দিকে জেলেরা প্রথমে তাঁকে কল করে নদীতে ঝামেলার কথা জানান। তখনই তেল ও মাছ লুটপাটের তথ্য পান। পরে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। ভোর ৫ টার দিকে এএসআই সদরুল ফোনে তাঁকে বলেন,
‘ভাই আমরা বিপদে আছি, সাহায্য করেন।’ তখন নৌকা নিয়ে তারা চার জেলে গিয়ে এসআই নজরুলসহ ৪ পুলিশ সদস্য ও দুই ইউপি সদস্যকে উদ্ধার করেন। এ সময় এসআই নজরুলের মাথা ফাটা ছিল।ইয়ারুলের ভাষ্য, পুলিশ সাদা পোশাকে ছিল। দুই ইউপি সদস্য জেলেদের মাছ, তেল ও টাকা লুটপাট করতে পুলিশ নিয়ে এসেছিলেন। তাদের ডাকাত ভেবে ৩০-৪০ জন জেলে মারধর করেন।তবে অভিযোগ অস্বীকার করে আহত ইউপি সদস্য ছানোয়ার হোসেন ছলিম বলেন, রাতে এসআই নজরুলের স্যারের সঙ্গে নৌকায় করে চর সাদিপুরে আসামি ধরতে যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে ৪০-৫০ জন তাঁদের ওপর হামলা চালায়। হামলাকারীদের মুখ বাঁধা ছিল।কুমারখালী থানার ওসি মো. নজরুল ইসলাম বলেন, একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আসামি ধরতে গিয়েছিলেন তাদের ৬ সদস্য। এ সময় দুই নৌকার সংঘর্ষে দুই এএসআই নিখোঁজ হন। তাদের মধ্যে একজনের মরদেহ পাওয়া গেছে। মরদেহটি সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে হস্তাান্তর করা হবে। এ সংক্রান্ত আইনী কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
