কুমারখালীতেবিদ্যালয় খুলতে শিক্ষকদের বাঁধা কটা গ্রুপের - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুমারখালীতেবিদ্যালয় খুলতে শিক্ষকদের বাঁধা কটা গ্রুপের

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: অক্টোবর ২৪, ২০২৪

কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ ঘড়ির কাটায় সকাল ১১ টা বেজে ৩১ মিনিট। তখনও শ্রেণি কক্ষে ঝুলছে তালা। প্রাক প্রাথমিক, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির ৫৬ জনের একজন শিক্ষার্থীও আসেনি বিদ্যালয়ে। প্রতিবেদকের দেখে তড়িঘড়ি করে পতাকা উত্তোলন করে কার্যালয় কক্ষে সটকে গেলেন এক সহকারী শিক্ষক। কার্যালয়ে বসে আছেন আরও পাঁচজন সহকারী শিক্ষক। আর প্রধান প্রবেশপথে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারসহ পুলিশের অন্তত ১১ জন কর্মকর্তা ও সদস্য।কুষ্টিয়ার কুমারখালীর চাঁপড়া ইউনিয়নের ৩৭ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গত মঙ্গলবার সরেজমিন গিয়ে এ চিত্র দেখা যায়। অথচ সকাল ৯ টার মধ্যে পতাকা উত্তোলন এবং ৯ টা ১৫ মিনিটে প্রথম শিফটের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা। উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ে মাসিক সভা থাকায় এ দিন বিদ্যালয়ে আসেননি প্রধান শিক্ষক।

এসময় সহকারী শিক্ষক অর্চনা রাণী বলেন, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সকাল থেকেই দু’পক্ষের কয়েক দফা হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আতঙ্কে প্রথম শিফটের প্রাক প্রাথমিক, প্রথম শ্রেণি ও দ্বিতীয় শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীও আসেনি। সেসময় প্রাণভয়ে শিক্ষকরা একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল।মাসুদা খাতুন নামের আরেক সহকারী শিক্ষক বলেন, কয়েক মাস পর পরই এমন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আতঙ্কে শিক্ষার্থীরা না আসলেও চাকুরি বাঁচাতে সময় মতোই শিক্ষকরা এসে বসে থাকেন। তাঁর ভাষ্য, দু’পক্ষের সংঘর্ষের কারনে বিদ্যালয়টি ধ্বংসের পথে।নাম প্রকাশ না করা শর্তে এক শিক্ষক বলেন, ৯ টার আগেই বিদ্যালয়ে এসেছেন তিনি। তবে কটা গ্রুপের লোকজন বিদ্যালয় খুলতে দেয়নি। সেজন্য পতাকা তুলতে দেরি হয়েছে।বিদ্যালয় সুত্রে জানা গেছে, ১৯৩৩ সালে প্রায় ৫১ শতাংশ জমির উপর প্রতিষ্ঠিত ৩৭ নম্বর পাহাড়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। বিদ্যালয়ের বর্তমানে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৩০ জন। বিপরীতে শিক্ষক রয়েছে সাতজন। দু’পক্ষের সংঘর্ষের কারনে প্রতিবছরই শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

২০২০ সালে শিক্ষার্থী ছিল ১৬৫ জন, ২০২১ সালে ১৪৭ জন, ২০২২ সালে ১৫৬ জন ২০২৩ সালে ১৩০ জন।দুপুর ১২ টা ৪৭ মিনিটে ফের সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, প্রাণভয়ে ভবনের গ্রিলে ছিটকান লাগিয়ে কার্যালয়ে কক্ষে বসে আছেন শিক্ষকরা। আর একটি শ্রেণিকক্ষে তৃতীয় শ্রেণির একজন, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে তিনজন করে মোট ৭ জন শিক্ষার্থী বসে খোশগল্প করছে।এসময় চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী তাওহিদ আহমেদ বলে, সকালে ভয়াবহ মারামারি হয়ছে। ভয়ে বন্ধুরা কেউ আসেনি বিদ্যালয়ে। শিক্ষকরাও কার্যালয়ে বসে আসেন। পাঠদান বন্ধ। তাই গল্প করছে সকলে মিলে।পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সিনথিয়ার মা রেহেনা খাতুন বলেন, কয়েক মাস পরপরই গ্রামে দুই গ্রুপের মারামারি হয়। সকলে ভয়ে থাকেন। সেজন্য মেয়ের সঙ্গে তিনিও বিদ্যালয়ের এসেছেন। তিনি এলাকায় শান্তি বজায় রাখতে প্রশাসনের সহযোগীতা চান।

সহকারী শিক্ষক সায়মা আফরোজ বলেন, আতঙ্কে প্রথম শিফটে কেউ আসেনি। দ্বিতীয় শিফটে তিন শ্রেণি মিলে মাত্র ৭ জন এসেছে। বিদ্যালয়ে স্বাভাবিক পরিবেশ না থাকায় পাঠদান বন্ধ। শিক্ষকরা চাকুরির ভয়ে বসে আছেন।গ্রামের ঘটনায় শিক্ষকরা প্রাণভয়ে চাকুরি করছেন বলে জানান বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তামান্না আক্তার। তিনি ফোনে বলেন, তিনি ২০০৯ সালে বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। তখন ২৬৫ জন শিক্ষার্থী ছিল। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে গ্রামে দু’পক্ষের দীর্ঘদিনের বিরোধ। প্রায়ই সংঘর্ষ বাঁধে। আতঙ্কে অনেকেই গ্রাম ছেড়ে অন্যত্রে চলে গেছেন। দিনে দিনে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন তিনি।আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ধ্বংসের পথে বিদ্যালয়টি। সেখানে চাকুরি করা অত্যন্ত ঝুঁকি বলে জানিয়েছেন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, পরিবেশ ফেরাতে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন তিনি।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দের জেরে পাহাড়পুর গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা ফিরোজ আহমেদ কটার সঙ্গে বিরোধ চলছে বিএনপি নেতা মো. লাল্টুর। তাদের সমর্থকরাও এতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। এরই মধ্যে গত ৮ অক্টোবর সন্ধায় জমিসংক্রান্ত বিষয়ে ওই গ্রামের মৃত হাকিম বিশ্বাসের দুই ছেলে মোতাহার হোসেনের সঙ্গে মুনতাজ হোসেনের বিরোধ বাধে। মুনতাজ জড়িত লাল্টু গ্রুপের সঙ্গে। তার ভাই মোতাহার আবার কটা গ্রুপের। বিষয়টি নিয়ে সেদিন উভয়পক্ষের সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত ১০ – ১৫ জন আহত হন। তারা ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। এঘটনায় থানায় দুইটি পাল্টাপাল্টি মামলা হয়েছে।আরো জানা গেছে, মামলায় লাল্টু গ্রুপের সমর্থকরা গত ১৬ অক্টোবর আদালতে জামিন নিতে গেলে তাদের অন্তত ১৫ টি বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট করে কটা গ্রুপের সমর্থকরা। এসব নিয়ে আজ মঙ্গলবার সকালে দু’পক্ষের সমর্থকরা কয়েক দফা পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও হামলায় জড়িয়ে পড়েন।

এতে উভয়পক্ষের অন্তত তিনজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এসময় উভয়পক্ষের বেশকিছু বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, সুনসান পাহাড়পুর গ্রাম। মোড়ে মোড়ে পুলিশের টহল। সড়ক ও বাড়ির আঙিনায় পড়ে আছে ইটপাটকেল। বেশকিছু ঘরবাড়িতে ভাঙচুরের ক্ষত।এসময় কটা গ্রুপের রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘ সকালে লাল্টু প্রায় দুই শতাধিক লোকজন নিয়ে এসে আমাদের বাড়িতে অতর্কিত হামলা করেছে। এতে আমাদের সজল ও রাজন নামের দুইজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। এছাড়াও বেশকিছু ঘরবাড়িতে ভাঙচুর করা হয়েছে। আমরা লাল্টু বাহিনীর হাত থেকে বাঁচকে চাই।’আর লাল্টু গ্রুপের রফিকুলের স্ত্রী ফাহিমা বলেন, সেদিন কটা গ্রুপের লোকজন আমাদের ভাঙচুর লুটপাট করেছিল।

সেজন্য আজ সকালে লাল্টু গ্রুপের লোকজন হামলা করেছে। তবে আমরা কোনো মারামারিতে যায়নি। তবুও সকাল ১০ টার দিকে কটা গ্রুপের আলামিন, আক্তার, রিয়াজসহ আরো অনেকে এসে আমার ঘরের বেড়া ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করে টাকাসহ অন্যান্য মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে।জানা গেছে, ২০১৭ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত আধিপত্য বিস্তারে উভয়পক্ষের পাঁচজন খুন হয়েছে। খবর পেয়ে পাহাড়পুর গ্রাম পরিদর্শন করেছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ( সদর সার্কেল) মো. আবু রাসেল। তিনি বলেন, আধিপত্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দু’পক্ষের বিরোধ চলছে। সকালেও পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও হামলা- ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গ্রামে শৃঙ্খলা ফেরাতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে শান্তি সমাবেশ করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।