ছররা গুলি শরীরে নিয়ে বিছানায় দিন পার করছেন কুষ্টিয়ার সুমন - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

ছররা গুলি শরীরে নিয়ে বিছানায় দিন পার করছেন কুষ্টিয়ার সুমন 

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: অক্টোবর ৩, ২০২৪

কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ বৈষম্য বিরোধী ছাত্র জনতার আন্দোলনে অংশ নিয়ে দুই শতাধিক ছররা গুলি (স্প্রিন্টার) সুমনের শরীরে ঢুকে যায়। সেদিন প্রাণে বেঁচে গেলেও বিনা চিকিৎসায় কর্ম খুইয়ে অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করে বিছানায় দিন পার করছেন সুমন। সুমন ব্যাপারি (১৮) কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নের হাসিমপুর বাজার সংলগ্ন আলী হোসেনের বড় ছেলে। পরিবারের অনটনের কারনে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়াশোনা করে কুষ্টিয়ার একটি বেকারিতে হাজিরা ভিত্তিক ডেলিভারির কাজ করতো সুমন ।

ছাত্র জনতার আন্দোলন যখন ভয়াবহ রূপ ধারণ করে ঠিক সেই সময়েই সুমন আন্দোলনে যোগ দেয়, কর্ম বিরতি দিয়ে সুমন ১ আগস্ট থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত রাজপথে থেকে আন্দোলন করতে থাকে। ৫ আগষ্ট বেলা ১২ টার দিকে কুষ্টিয়া মডেল থানার গেটের সামনে গোলাগুলি হয়, সে সময় সুমনের সামনে সবুজ নামের এক ব্যক্তির পুলিশের ছোড়া বুলেট গলা ভেদ করে বের হয়ে যায়, সেখানে সবুজ মাটিতে লুটিয়ে পড়লে সুমন তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করতে যায়, সে সময় কয়েকশো ছররা বুলেট সুমনের শরীরে ঢুকে যায়, সুমন সেখানে পড়ে গেলে টিয়ারসেল এসে সুমনের সামনে পড়ে ধোয়া ছড়ালে জ্ঞান হারাই সুমন।

তারপর সেখান থেকে উদ্ধার করে সুমনকে কুষ্টিয়া জেনারেল হসপিটালে ভর্তি করা হয়, ৬ দিন চিকিৎসা শেষে শরীরে প্রায় তিনশো ছররাগুলি শরীরে নিয়ে বাড়ি ফেরে সুমন। সুমন বলেন, আমি কুষ্টিয়াতে শিশির বেকারির ডেলিভারির কাজ করতাম, ১ আগষ্ট থেকে আনদোলনে যোগ দিই, ৫ তারিখ বেলা ১২ টার দিকে কুষ্টিয়া মডেল থানার গেটের সামনে পুলিশের ছোড়া গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আমার সামনে থাকা

সবুজ নামের এক ব্যক্তি, রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে আমার শরীরে গুলিবিদ্ধ হয়, তারপর টিয়ার ছেলের ধোয়া আমার সামনে আসলে আমি জ্ঞান হারায়, জ্ঞান ফিরলে দেখি আমি হসপিটালের বিছানায়। আমি ছয় দিন হসপিটাল চিকিৎসা নিয়েছি এর মধ্যে আমার কর্মস্থলের পক্ষ থেকে একদিন শুধু দেখতে এসেছিল, তারপর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় দুই মাস হতে গেলো আর কেউ খোঁজ নেয়নি।

ডাক্তার বলেছে আমার শরীরে আড়াইশোর উপরে স্প্লিন্টার রয়েছে, এতগুলি বের করা অনেক ব্যয়বহুল খরচের ব্যাপার। আমার বাবা ছোট কাজ করে আমরা তিন ভাই, পরিবারে মোট পাঁচজন। বাবার পক্ষে পরিবার চালানো সম্ভব না বলেই আমি কর্মে লেগেছিলাম। আমি এখন দাঁড়াতে পারিনা হাঁটতে পারিনা বসলেও মাজা পিঠে ব্যথা করে, শুয়ে থাকলে মাথা ব্যথায়, রোদ্রে যেতে পারি না, গা জ্বালাপোড়া করে । বাবার সংসার চালাতেই হিমশিম, আমার চিকিৎসা তো প্রশ্নই উঠে না।

আমিও কর্ম হারিয়েছি শরীরের যে অবস্থা আর কোনদিন কর্ম করতে পারব কিনা তাও জানিনা, সুমন বলেন মনে হচ্ছে আন্দোলনে গিয়ে এখন আমি নিজেই পরিবারের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছি। সুমনের বাবা আলী হোসেন বলেন, আমার ছেলে কুষ্টিয়াতে ছোট একটা কর্ম করতো, সুমনের আন্দোলনে যোগ দেয়ার ব্যাপারে আমি জানতাম না, কিন্তু ৫ তারিখে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরে ফোন আসলে আমার দুনিয়া এলোমেলো হয়ে পড়ে, আমি হসপিটালে গিয়ে দেখি আমার ছেলে রক্তাক্ত অবস্থায় চিকিৎসাধীন আছে। আমার ছেলের চিকিৎসার খরচ বহন করা আমার পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব না, স্বৈরাচার সরকারের পতন হয়েছে, কিন্তু যারা পতনের জন্য জীবন উৎসর্গ করে আন্দোলন করেছে তাদের দিকে এখন কেউ তাকাচ্ছে না।

আমার ছেলেটার জীবন অনিশ্চয়তার উপরে ভাসছে। আমি অনুরোধ করবো সরকারের প্রতি, যারা স্বৈরাচার পতনে রাজপথে থেকে গুলিবিদ্ধ বা আহত হয়েছে, তাদের চিকিৎসা এবং পরিবারের দায়ভার নিয়ে সহযোগিতা করার জন্য। সুমনের মা ফরিদা খাতুন বলেন, আমার ছেলের শরীরে যখন যন্ত্রণা ওঠে তার কান্নার আওয়াজে আমার বুক ভারি হয়ে ওঠে, আমি মা হিসেবে সন্তানের কান্না শুনেও ডাক্তারের কাছে নিতে পারছিনা, এর থেকে অসহায়ত্ব আর কি হতে পারে। আরিফ নামের স্থানীয় একজন বলেন, সুমনের পরিবার হতদরিদ্র, আন্দোলনে গিয়ে সুমন নিজের কর্ম হারিয়ে এখন চিকিৎসার অভাবে বিছানায় কাতরাচ্ছে, সুমনের মত যারা আহত হয়েছেন তারা সবাই তো নতুন প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধা,

একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধারা ভাতা সহ বিভিন্ন সুবিধা পেয়ে তারা কোটিপতি, কিন্তু সুমনের মতো নতুন প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধারা আজ বিনা চিকিৎসায় পড়ে আছে, দেখার কেউ নেই, আমি অনুরোধ করব সরকারের পাশাপাশি বিত্তবানদের সুমনের মত যারা অসহায় অবস্থায় পড়ে আছে তাদের দায়িত্ব নিতে। কুষ্টিয়ার ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার বলেন, সুমনের মত অনেক আহতদের চিকিৎসা সহযোগিতা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে করা হয়েছে, কিন্তু সুমনের ব্যাপারটা এখনও আমাদের নজরে আসেনি, সুমনের পরিবারের থেকে যোগাযোগ করা হলে অবশ্যই তার চিকিৎসা সহ তার পরিবারের পাশে থাকবে জেলা প্রশাসন।