কুষ্টিয়ায় যুবকের ৯ টুকরা লাশ উদ্ধার, স্ত্রীর দাবি পুলিশ গুরুত্ব দিলে জীবিত উদ্ধার করতে পারতো - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুষ্টিয়ায় যুবকের ৯ টুকরা লাশ উদ্ধার, স্ত্রীর দাবি পুলিশ গুরুত্ব দিলে জীবিত উদ্ধার করতে পারতো

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৪

কুষ্টিয়ার সদর উপজেলায় পদ্মা নদীর চরের ৬ জায়গা থেকে এক যুবকের লাশের ৯টি টুকরা উদ্ধার করা হয়েছে। লাশের টুকরোগুলো সাতটি ব্যাগে রাখা ছিল। শুক্রবার (২ ফেব্রুয়ারি)  দিবাগত রাত ২টা থেকে শনিবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৯টা পর্যন্ত পদ্মার চরে অভিযান চালিয়ে এগুলো উদ্ধার করে পুলিশ। পরে লাশের টুকরাগুলো কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে নেওয়া হয়।

কুষ্টিয়ায় যুবকের ৯ টুকরা লাশ উদ্ধার, স্ত্রীর দাবি পুলিশ গুরুত্ব দিলে জীবিত উদ্ধার করতে পারতো

নিহত যুবকের নাম মিলন হোসেন (২৪)। মিলন হোসেন কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের বাহিরমাদি গ্রামের মাওলা বক্স সরদারের ছেলে। টেক্সটাইল প্রকৌশলে পড়াশোনা শেষ করে তিনি অনলাইনে আউটসোর্সিংয়ের কাজ করতেন। এ কাজের মাধ্যমে তাঁর প্রচুর টাকা আয় হয়েছিল। গত ৯ মাস আগে বিয়ে করেন মিলন। তিনি স্ত্রী মিমি খাতুনকে নিয়ে কুষ্টিয়া শহরের হাউজিং ই ব্লকের ২১৩ নং বাসায় ভাড়া বাসায় থাকতেন । গত বুধবার সকালে এক যুবকের ফোনকল পেয়ে তিনি শহরের ভাড়া বাসা থেকে বের হয়ে আর ফেরেননি। ওই সন্ধ্যায় মিলনের স্ত্রী মিমি কুষ্টিয়া মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। মিলনের ভাড়া বাসার মালিক আব্দুল হালিম জানান, দুই মাস পূর্বে মিলন হোসেন বাসা ভাড়া নেয়। সে নম্র স্বভাবের মানুষ ছিলো। পাশে তাদের একটি অফিসও ছিলো। তবে এই ঘটনার পর থেকে ঐ অফিস বন্ধ রয়েছে। নিহতের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, কী কারণে মিলনকে হত্যা করা হয়েছে। সে বিষয়ে আমরা কিছু জানি না। সকালে শুনতে পারি, মিলনের ৯ টুকরো করা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হোক। কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গের সামনে কথা হয় মিলনের বড় বোন সেলিনা খাতুনের সঙ্গে। তিনি জানান, চার বোনের একমাত্র ভাই ছিলেন মিলন। সে অত্যন্ত ভদ্র প্রকৃতির। তার ভাইকে এভাবে কেউ হত্যা করতে পারে, সেটি এখনও তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না। মিলন নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তাকে ফিরে পেতে পরিবারের পক্ষ থেকে সজলকে বারবার অনুরোধ করা হয়েছে, তার হাতে পায়ে ধরা হয়েছে। এমনকি তারা সজলকে মোটা অংকের টাকারও প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু তাতে কোনও কাজ হয়নি। মিলনের শশুর মহিবুল হক বলেন, গত রোজার ঈদের পর মিলনের সঙ্গে তিনি মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। মিলন স্থানীয় বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কমপ্লিট করেছিলেন। তিনি বলেন, মিলন নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে উদ্ধারে বারবার তারা পুলিশের সাহায্য চেয়েছেন। কিন্তু প্রথম দিকে পুলিশ তাদের ডাকে সেভাবে সাড়া দেয়নি। যদি সময়মতো পুলিশ তৎপর হতো তাহলে হয়তো মিলনকে এভাবে অকালে প্রাণ দিতে হতো না।

মিলনের স্ত্রী মিমি খাতুন বলেন, হাউজিং এলাকার সজল মিলনকে কল করে ডাকে। তার সঙ্গে দেখা করে বসায় এসে বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আবার বের হয়ে যায়। পরে সে নিখোঁজ ছিল। ওই দিনই কুষ্টিয়া মডেল থানায় জিডি করি। যার জিডি নম্বর ২৩২৮, তারিখ ৩১ জানুয়ারি, ২০২৪। পরের দিন দুপুর পর্যন্ত আমার স্বামীর মোবাইল নম্বর খোলা ছিল। কিন্তু পুলিশ গুরুত্ব দেয়নি, গুরুত্ব দিলে আমার স্বামীকে জীবিত উদ্ধার করতে পারতো। আজ (গতকাল শনিবার) সকালে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। আমার স্বামীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখন (গতকাল) পর্যন্ত ৫ জনকে আট করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। আটক ৫ জনের মধ্যে তিন জনের নাম জানা গেলেও বাকি ২ জনের নাম এখন জানা যায়নি। আটককৃতরা হলো কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত সাবেক সহসভাপতি এস কে সজীব ওরফে সজীব আহমেদ (২৫), জনি আহমেদ (২২) ও সজল আহমেদসহ (২৪)।  এ ঘটনায় মামলার পস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। মিলন হোসেনের লাশের ৯ টুকরা উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন অভিযানে থাকা কুষ্টিয়ার মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাহেব আলী। গ্রেপ্তার হওয়া এস কে সজীব ওরফে সজীব আহমেদ শৃঙ্খলা পরিপন্থি কার্যকলাপে জড়িত থাকার কারণে ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। বর্তমানে তিনি স্বেচ্ছাসেবক লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তিনি কুষ্টিয়া আড়ুয়াপাড়ার এক সময়ের মাদক ব্যবসায়ী মিলন শেখ ওরফে ডাল মিলনের ছেলে। তবে বর্তমানে তিনি হাউজিং ডি-ব্লকে বসবাস করেন। কুষ্টিয়া শহরের অধিকাংশ কিশোর গ্যাংয়ের গ্র“পের নিয়ন্ত্রণ তার ছিলো বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। এছাড়াও সে কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ হাফিজ চ্যালেঞ্জের উপরে তার ক্যাডার বাহিনী নিয়ে হামলা করেছিলো। যা সেই সময়ে নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয়েছিলো এবং সেই সময় ঐ ঘটনায় কুষ্টিয়া মডেল থানায় মামলাও হয়েছিলো। স্থানীয় লোকজন জানান, এস কে সজীব কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি ছিলেন। কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভাঙচুর ও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মারধরের অভিযোগে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। সেই মামলায় কারাগারে ছিলেন তিনি। এ ছাড়া তাঁর নামে চাঁদাবাজিসহ বেশ কিছু মামলাও রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাউজিং এলাকার কয়েক জন বাসিন্দা জানান, সজীবের নামে অনেক অভিযোগ রয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে একটি কিশোর গ্যাং পরিচালিত হয়। মিলন নামে যাকে হত্যা করা হয়েছে, তিনিও তাঁদের মতোই ছিলেন। তাঁদের কাজ ছিল ছেলে-মেয়েদের ব্ল্যাকমেল করে চাঁদা দাবি করা। কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গের লক্ষণ বলেন, মিলনকে ৮ টুকরো করে হত্যা করা হয়েছে। মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে এনেছি। কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) পলাশ কান্তি নাথ জানান, গত ৩১ জানুয়ারি সকালে মিলন বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন। ওই দিন সন্ধ্যায় তাঁর স্ত্রী মুমো খাতুন কুষ্টিয়া মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডির পরিপ্রেেিত তদন্ত শুরু করে পুলিশ। মোবাইল ফোনের কল লিস্টের সূত্র ধরে প্রথমে মিলনের এক বন্ধুকে আটক করা হয়। তাঁর স্বীকারোক্তিতে জানা গেছে, আরেক বন্ধু সজীবের নেতৃত্বে মিলনকে হত্যা করা হয়েছে। শুক্রবার (২ জানুয়ারী) বিকেলে অভিযান চালিয়ে সজীবসহ আরও চারজনকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা মিলনকে হত্যা করে লাশ টুকরো করে নদীর চরে পুঁতে রাখার বিষয়টি স্বীকার করেন। এরপার গতকাল শনিবার (৩ জানুয়ারি) রাত ২টার দিকে আটক ব্যক্তিদের নিয়ে হাটশ হরিপুর ইউনিয়নের কান্তিনগর বোয়ালদহ পদ্মা নদীর চরে পুলিশ অভিযানে যায় বলে জানান পুলিশ সুপার। তিনি বলেন, ‘রাতভর অভিযান চালিয়ে নদীর চরের ছয়টি স্থান থেকে মিলনের খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র বাঁধবাজার এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।’ পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিরা সবাই একে অপরের পরিচিত। মিলন বাড়ি থেকে অনলাইনে কাজ করতেন। নিখোঁজের দিন তাঁকে মুঠোফোনে ডেকে হাউজিং এলাকার একটি বাড়িতে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। ওই রাতে তাঁকে হত্যা করা হয়। এরপর লাশ গুম করার সুবিধার্থে ধারালো অস্ত্র দিয়ে লাশ টুকরা টুকরা করা হয়। চারটি মোটরসাইকেলে সাতজন সাতটি পলিথিন ব্যাগের ভেতর লাশের নয় টুকরা অংশ নিয়ে বের হন। নদীর পাড় থেকে হেঁটে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে পদ্মার মধ্যে বালুর ভেতর চারটি স্থানে লাশের টুকরাগুলো পুঁতে রাখেন তাঁরা। এই পুরো হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি এস কে সজিব। কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি, পুলিশ পরিদর্শক) শেখ মোহাম্মদ সোহেল রানা জানান, বুধবার নিহত মিলনের স্ত্রী মিমি খাতুনের করা সাধারণ ডায়েরির সূত্র ধরে সজল ও সজিব নামে দুই যুবককে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তারা হত্যাকাণ্ডে জড়িত বলে স্বীকার করেছেন। তারা কীভাবে এবং কেনো এ মিলনকে হত্যা করেছেন সে বিষয়েও একটি প্রাথমিক ধারণা পাওয়া গেছে। আটক যুবকদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতেই শনিবার মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করে পদ্মা নদীর চর থেকে মিলনের খন্ড খন্ড মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে সেগুলো মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় ৫ জনকে আটক করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। বিস্তারিত পরে জানানো হবে।