খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ই জানুয়ারি ২০১৫, ২:১০ পিএম

বাংলাদেশের মানচিত্রে কুষ্টিয়া জেলাকে অনেকেই চিনে থাকেন লালন সাঁইজির বাউল দর্শন, শিলাইদহের রবীন্দ্র-স্মৃতি কিংবা এদেশের ‘সাংস্কৃতিক রাজধানী’ হিসেবে। তবে এই সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি কুষ্টিয়ার মাটি ও মানুষ যুগ যুগ ধরে জ্ঞানচর্চা এবং শিক্ষার আলো বিস্তারে এক অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করে আসছে। ঔপনিবেশিক আমলের প্রাচীন পাঠশালা ও উচ্চ বিদ্যালয় থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়—সবকিছুর এক সুবিন্যস্ত এবং অনন্য চারণভূমি এই কুষ্টিয়া। জেলার এই শিক্ষা ব্যবস্থার পরিকাঠামো এবং এর ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর গল্প এর মাটির মতোই গভীর ও স্পন্দনশীল।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে কুষ্টিয়া এক অনন্য গৌরবময় স্থান দখল করে আছে। ১৯৭৯ সালের ২২ নভেম্বর কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহের সীমান্তবর্তী শান্ত-সবুজ প্রান্তর শান্তিডাঙ্গায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ’। এটি স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রথম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে এই বিশাল আন্তর্জাতিক মানের বিদ্যাপীঠে ধর্মতত্ত্ব ও ইসলামী আইনের পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রকৌশল, ব্যবসায় প্রশাসন, আইন, সামাজিক বিজ্ঞান ও মানবিকের মতো আধুনিক বিষয়গুলোতে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও গবেষক জ্ঞানচর্চায় মগ্ন রয়েছেন।
উচ্চশিক্ষার এই ধারায় আধুনিককালে যোগ হয়েছে কুষ্টিয়ার প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ‘রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়’। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানবতাবাদী দর্শন ও শিক্ষার আধুনিক চিন্তাকে ধারণ করে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি এই অঞ্চলের বেসরকারি স্তরে মানসম্মত শিক্ষা বিস্তারে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
কুষ্টিয়া জেলায় আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার ভিত্তি দিন দিন আরও সুদৃঢ় হচ্ছে। চিকিৎসা খাতে মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য এই জেলায় কাজ করছে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। চিকিৎসা শিক্ষার প্রসারে এখানে গড়ে উঠেছে সরকারি মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল (ম্যাটস)। এছাড়া বেসরকারি উদ্যোগে চিকিৎসা সহকারীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে জেলায় আরও ৫টি বেসরকারি ‘ম্যাটস’ বা চিকিৎসা সহকারী প্রশিক্ষণ স্কুল নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—আলো মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল, ডা. লিজা-ডা. রতন মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল, স্পেশালাইজড মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল, লালন শাহ মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল এবং পদ্মা গড়াই মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল।
একই সাথে কারিগরি ও প্রকৌশল শিক্ষার প্রসারে জেলায় ১টি সুপ্রতিষ্ঠিত ‘সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট’ রয়েছে, যা এই অঞ্চলের তরুণদের দক্ষ কারিগরি শক্তিতে রূপান্তর করছে। এর পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাকে আরও ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে ১০টি বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, যার মধ্যে অন্যতম ও সুপরিচিত হলো ‘দর্পণ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট’। এছাড়াও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে জেলায় ২টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) এবং আইনি পেশার বিকাশের জন্য ১টি ঐতিহ্যবাহী আইন কলেজ বা ল কলেজ সক্রিয় রয়েছে।
মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে কুষ্টিয়ার তরুণদের উচ্চশিক্ষার প্রাথমিক ভিত্তি গড়ে তোলে জেলার মোট ৯টি নামকরা সরকারি কলেজ। এই তালিকায় রয়েছে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠ ‘কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ’ (যা ১৯৪৭ সালে ভারতভাগের ঠিক আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল), কুষ্টিয়া সরকারি মহিলা কলেজ, কুষ্টিয়া সরকারি সিটি কলেজ এবং ভেড়ামারা সরকারি মহিলা কলেজ। উপজেলার স্তরে রয়েছে আমলা সরকারি কলেজ (স্থাপিত ১৯৭২), কুমারখালী সরকারি কলেজ (স্থাপিত ১৯৭০) এবং খোকসা কলেজ। এর পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার মেলবন্ধনে রয়েছে হোসেনাবাদ টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ এবং কুষ্টিয়া সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ।
সরকারি এই ৯টি কলেজের পাশাপাশি জেলায় উচ্চশিক্ষার দুয়ার খুলে রেখেছে আরও ৩০টি বেসরকারি কলেজ, যার মধ্যে দৌলতপুর অনার্স কলেজ (স্থাপিত ১৯৮৫) এবং কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজ (স্থাপিত ১৯৬৮) অন্যতম।
কুষ্টিয়ার শিক্ষার মূল শক্তি লুকিয়ে আছে এর শত বছরের পুরোনো স্কুলগুলোর ভেতরে, যেখান থেকে পড়াশোনা করে বহু গুণী মানুষ বিশ্বমঞ্চে অবদান রেখেছেন। এই জেলায় ৩টি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় এবং ১৭৩টি বেসরকারি উচ্চ বিদ্যালয় রয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে ৩৮টি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
কুমারখালী এম এন পাইলট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়: ১৮৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়টি কুষ্টিয়া জেলার অন্যতম প্রাচীনতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এটি এই অঞ্চলে আধুনিক শিক্ষার আলো ছড়ানোর প্রথম দিকের এক ঐতিহাসিক সাক্ষী।
কুমারখালী সরকারি বালিকা বিদ্যালয় ও কুষ্টিয়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়: নারী শিক্ষার প্রসারে কুমারখালী সরকারি বালিকা বিদ্যালয়টি ১৮৬৩ সালে এবং কুষ্টিয়া শহরের সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়টি ১৮৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়, যা সে যুগে নারী জাগরণে এক যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছিল।
কুষ্টিয়া জিলা স্কুল ও কুষ্টিয়া হাই স্কুল: ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত কুষ্টিয়া জিলা স্কুলটি জেলার ছাত্রদের জন্য অন্যতম প্রধান ও শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ হিসেবে পরিচিত। এর পাশাপাশি শহরের ঐতিহ্যবাহী কুষ্টিয়া হাই স্কুল জেলার শিক্ষার প্রসারে দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকা রাখছে।
অন্যান্য গৌরবময় স্কুল: ১৮৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক হরিনারায়ণপুর হাইস্কুল, ১৮৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত আমলা সদরপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় এবং ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত সিরাডিরাজুল হক মুসলিম (বহুমুখী) উচ্চ বিদ্যালয় ও মহিষকুণ্ডি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এই অঞ্চলের শিক্ষার প্রসারে একেকটি বাতিঘর হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রাথমিক শিক্ষার বুনিয়াদ গড়তে কুষ্টিয়া জেলায় রয়েছে ৩৩০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২৭৫টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ৩৯০টি কিন্ডারগার্টেন। এর মধ্যে ১৮৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘মিশন প্রাথমিক বিদ্যালয়’ অন্যতম এক প্রাচীন প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র।
সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কুষ্টিয়ায় ধর্মীয় নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার প্রসারে কাজ করে যাচ্ছে ৩৭টি ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসা। এর মধ্যে ১৯৫৫ সালে কুষ্টিয়া শহরের বড়বাজারের রক্সিগোলি এলাকায় প্রতিষ্ঠিত ‘কুওয়াতুল ইসলাম কামিল (এম.এ) মাদরাসা’ অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ও ঐতিহ্যবাহী একটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যা কামিল বা স্নাতকোত্তর স্তর পর্যন্ত ইসলামি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, কুষ্টিয়া তার পিছিয়ে পড়া বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষার অধিকার থেকেও মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। সমাজের এই বিশেষ শিশুদের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে এবং তাদের দক্ষ ও স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে জেলায় ১টি বিশেষায়িত ‘প্রতিবন্ধীদের বিদ্যালয়’ অত্যন্ত মমতার সাথে পরিচালিত হচ্ছে। আর শিক্ষকদের পেশাগত মানোন্নয়ন ও আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতিতে দক্ষ করতে জেলায় সক্রিয় রয়েছে ২টি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
কুষ্টিয়া জেলার এই সুবিন্যস্ত শিক্ষাকাঠামো কেবল কিছু ভবনের সমষ্টি নয়; এটি হলো এই বাউল মাটির মেহনতি ও প্রগতিশীল মানুষের জ্ঞানলিপ্সার এক জীবন্ত দলিল, যা প্রতি বছর লাখো তরুণকে আলোর পথ দেখিয়ে চলেছে।
মন্তব্য