বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র এবং এদেশের অনানুষ্ঠানিক ‘সাংস্কৃতিক রাজধানী’ হিসেবে খ্যাত কুষ্টিয়া জেলা। নদী, পলি আর লোকজ সুরের মেলবন্ধনে গড়া এই জনপদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এখানকার মানুষ। কুষ্টিয়ার মানুষ যেমন অতিথি পরায়ণ, তেমনই প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক। একটি জেলার উন্নয়ন, শিল্পায়ন, ভাষা এবং সংস্কৃতির প্রকৃত চালিকাশক্তি হলো তার জনমিতি বা জনসংখ্যা। কুষ্টিয়া জেলার জনসংখ্যা সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য এবং এর ভেতরের সামাজিক ও ভৌগোলিক বিন্যাসের এক মানবিক রূপরেখা নিচে তুলে ধরা হলো।
Table of Contents
Toggleজনমিতির চালচিত্র ও ধর্মীয় সম্প্রীতি
সর্বশেষ প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কুষ্টিয়া জেলার মোট জনসংখ্যা ২৩,৬৬,৮১১ জন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর লিঙ্গভিত্তিক অনুপাত পর্যালোচনা করলে এক চমৎকার ভারসাম্য লক্ষ্য করা যায়। মোট জনসংখ্যার মধ্যে পুরুষ ও নারীর অনুপাত প্রায় সমান; যেখানে পুরুষ জনসংখ্যা ৫০.৮৬% এবং নারী জনসংখ্যা ৪৯.১৪%। লিঙ্গভিত্তিক এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান জেলার শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং শিল্প খাতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ।
ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতির ক্ষেত্রে কুষ্টিয়া সারা দেশের জন্য একটি রোল মডেল। বাউল সম্রাট লালন শাহের অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী দর্শনের প্রভাব এখানকার মানুষের রক্তে ও মজ্জায় মিশে আছে। পরিসংখ্যানগতভাবে, কুষ্টিয়া জেলার মোট জনসংখ্যার ৯৫.৭২% মুসলিম, ৪.২২% হিন্দু এবং বাকি ০.০৬% অন্যান্য ধর্মাবলম্বী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ। যুগের পর যুগ ধরে এই জেলায় বিভিন্ন ধর্মের মানুষ পরম সহনশীলতা ও উৎসবমুখর পরিবেশে একসাথে বসবাস করে আসছেন, যা এই জনপদকে দাঙ্গা বা সামাজিক অস্থিরতা থেকে মুক্ত রেখেছে।
ভৌগোলিক আয়তন ও জলবায়ুর আঙিনায় জনবসতি
কুষ্টিয়া জেলার মোট ভৌগোলিক আয়তন ১,৬২১.১৫ বর্গকিলোমিটার। এই সুনির্দিষ্ট ভূখণ্ডে প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনবসতির ঘনত্ব বেশ ঘন ও সুবিন্যস্ত। জেলার ভৌগোলিক সীমানার উত্তর প্রান্তে রয়েছে রাজশাহী, নাটোর ও পাবনা জেলা; দক্ষিণ প্রান্তে চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহ জেলা; পূর্ব প্রান্তে রাজবাড়ী এবং পশ্চিম প্রান্তে মেহেরপুর জেলা ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের আন্তর্জাতিক সীমানা।
এই সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক বলয়ে মানুষের জীবনযাত্রা ও বসতি স্থাপনে এখানকার আবহাওয়া ও নদী অববাহিকা বড় ভূমিকা রাখে। পদ্মা, গড়াই, মাথাভাঙ্গা, কালীগঙ্গা এবং কুমার নদের উর্বর পলি অববাহিকায় গড়ে উঠেছে কুষ্টিয়ার প্রধান প্রধান জনবসতি। এখানকার বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১,৪৬৭ মিলিমিটার এবং তাপমাত্রা গ্রীষ্মকালে সর্বোচ্চ ৩৭.৮° সেলসিয়াস থেকে শীতকালে সর্বনিম্ন ১১.২° সেলসিয়াসে ওঠানামা করে। এইতিহ্যগতভাবে এই নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া এখানকার মানুষদের কঠোর পরিশ্রমী এবং কৃষি ও শিল্পকাজে অত্যন্ত কর্মক্ষম করে তুলেছে।
নগরজীবন, প্রমিত ভাষা ও ঐতিহাসিক আভিজাত্য
কুষ্টিয়া শহর হলো এই জেলার প্রধান প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক সদর দপ্তর। কুষ্টিয়া পৌরসভা কেবল একটি শহরই নয়, এটি আয়তনের দিক থেকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পৌরসভা এবং দেশের ১৩তম বৃহত্তম শহর। এই শহরের নাগরিকদের একটি বড় অহংকার হলো তাদের মুখের ভাষা। কুষ্টিয়া জেলার মানুষের কথ্য বা মুখের ভাষাকে সমগ্র বাংলাদেশে বাংলা ভাষার সবচেয়ে প্রমিত, মার্জিত ও শুদ্ধ রূপ হিসেবে গণ্য করা হয়। গণমাধ্যম থেকে শুরু করে প্রমিত উচ্চারণের ব্যাকরণে কুষ্টিয়ার ভাষার টানকে আদর্শ মনে করা হয়।
ইতিহাসের পাতায় কুষ্টিয়ার মানুষের রয়েছে এক লড়াকু পরিচয়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় সূচনা ও প্রথম দিককার প্রতিরোধ যুদ্ধ এই জেলা থেকেই দানা বেঁধে উঠেছিল। এছাড়া ব্রিটিশ আমল থেকেই এখানকার মানুষ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিতে অগ্রগামী। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর জীবনের এক সোনালী সময় কুষ্টিয়ার শিলাইদহে কাটিয়েছিলেন, যেখানে প্রকৃতির সাথে এখানকার সহজ-সরল মানুষের জীবনযাত্রা তাঁর নোবেলজয়ী সাহিত্য সৃষ্টিতে গভীর অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। তেমনি ঔপন্যাসিক মীর মশাররফ হোসেনের কালজয়ী সাহিত্যকর্মও এই মাটির মানুষের জীবনবোধ থেকে উঠে এসেছে।
শিল্প ও শিক্ষার আলোয় স্পন্দিত জনসংখ্যা
কুষ্টিয়ার এই বিপুল জনসংখ্যা আজ কেবল সংখ্যার হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তারা এক দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। উচ্চশিক্ষার আলো ছড়াতে এখানে রয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম এবং দেশের একমাত্র সরকারি ইসলামি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ’। এই বিদ্যাপীঠ জেলার তরুণ সমাজকে আধুনিক ও নৈতিক শিক্ষায় দীক্ষিত করছে। পাশাপাশি সংস্কৃতিচর্চাকে ধরে রাখতে এখানে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ও আধুনিক ‘জেলা শিল্পকলা একাডেমি’।
অর্থনৈতিকভাবে এই অঞ্চলের মানুষ অত্যন্ত স্বাবলম্বী। কুষ্টিয়া শহর ছাড়াও কুমারখালী এবং ভেড়ামারা পৌরসভা এলাকায় গড়ে ওঠা লাভজনক বিসিক (BSCIC) শিল্পনগরী জেলার হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তাছাড়া কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় অবস্থিত বাংলাদেশের বৃহত্তম তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহে এক বিশাল ভূমিকা পালন করছে।
একতারার সুফি দর্শনকে বুকে ধারণ করে, প্রমিত ভাষার আভিজাত্য নিয়ে এবং আধুনিক শিল্প ও শিক্ষার আলোয় আলোকিত কুষ্টিয়া জেলার এই ২৩ লক্ষাধিক মানুষ আজ দেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।









