বিশেষ প্রতিনিধি ॥ একদিকে বোমাতঙ্ক, অন্যদিকে বিদায়ের বিষাদ, এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় শেষ হয়েছে মরমি সাধক ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা। তবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনাসভা ও গ্রামীণ মেলা গতকাল সোমবার (১৯ অক্টোবর) গভীর রাত পর্যন্ত।
এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অবস) ফয়সাল মাহমুদ। আজ (গতকাল) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মুঠোফোনে তিনি বলেন, ‘রাতে কুমারখালী থানার ওসি জানতে পারেন আখড়াবাড়ির ভেতর বোমা আছে। এরপর সেটি কর্ডন করে রাখা হয়। এটা টাইম বোমা ছিল। যেকোনো সময় বিস্ফোরণ ঘটতে পারত। আল্লাহ বাঁচিয়েছেন। সকালে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল এসে সেটা নিষ্ক্রিয় করেছে। আখড়াবাড়ির নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। পুরো আখড়াবাড়ি তল্লাশি চালানো হয়েছে।’
আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। হয়তো কেউ আতঙ্ক ছড়াতে এমনটি করেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। দুপুর ১২টা থেকে আখড়াবাড়ি প্রবেশে ব্যাপক তল্লাশি চালানো হবে। পুলিশের পাশাপাশি দুই প্লাটুন বিজিবি কাজ করবে। আখড়াবাড়ি প্রবেশের সবগুলো সড়ক ও মোড়ে মোড়ে তল্লাশি চলবে। পুরো আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণেও তল্লাশি চালানো হবে।
এঘটনায় গতকাল দুপুর ১২টার দিকে বিস্ফোরক আইনে পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। মামলায় কোনো সংখ্যা উল্লেখ ছাড়াই অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।
রাত সাড়ে ৮টার দিকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ( ওসি) জামাল উদ্দিন।
গত শনিবার থেকে আখড়াবাড়িতে লালন শাহর তিরোধান দিবসের তিন দিনের আয়োজন চলছে। গতকাল ছিল দ্বিতীয় দিন। আজ সোমবার রাত পর্যন্ত সেখানে অনুষ্ঠান চলবে। বোমা উদ্ধারের পর সেখানে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশের নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি বিজিবির দুই প্লাটুন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। কে বা কারা, কী উদ্দেশ্যে এসব বস্তু আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণে রেখে গেছে, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গতকাল দিবাগত রাত দেড়টার দিকে আখড়াবাড়ির মূল ফটক পার হয়ে ডান দিকে একটি নারকেলগাছের নিচে সাদা ব্যাগে মোড়ানো সন্দেহজনক বস্তু পড়ে থাকতে দেখা যায়। পাশেই ছিল পুলিশ বক্স। বিষয়টি জানার পরপরই সতর্ক অবস্থান নেয় পুলিশ। নিরাপত্তার স্বার্থে রাতেই আখড়াবাড়ির ভেতরে অবস্থানরত সাধু-ফকিরদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে খবর দেওয়া হলে সকালে ঢাকা থেকে পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। দলটি সন্দেহজনক ব্যাগটি তল্লাশি করে একটি টাইম বোমা ও দুই লিটার পেট্রল উদ্ধার করে। পরে বোমাটি নিষ্ক্রিয় করা হয়।
গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) অধিবাস সেবার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী স্মরণোৎসবের সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয় গতকাল রোববার (১৮ অক্টোবর) দুপুরে পূর্ণ সেবার মধ্য দিয়ে। পূর্ণ সেবা শেষ হবার পর অনেক সাধু নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরতে শুরু করেন।
তবে সোমবার আখড়াবাড়ির প্রধান ফটকের কাছে টাইম বোমা উদ্ধারের ঘটনায় সাধু-বাউল ও ভক্ত-অনুরাগীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সরেজমিনে দেখা যায়, অনেক সাধু তড়িঘড়ি করে মাজার প্রাঙ্গণ ত্যাগ করছেন।
বোমা প্রসঙ্গে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রোববার দিবাগত রাতে লালন আখড়াবাড়ির প্রধান ফটকের কাছে একটি সাদা ব্যাগে মোড়ানো সন্দেহজনক বস্তু দেখতে পাওয়া যায়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ব্যাগটি পরীক্ষা করে টাইম বোমা ও ২ বোতল পেট্রোল উদ্ধার করে। এ ঘটনায় আখড়াবাড়ি ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। সোমবার সকালে পুলিশের বিশেষায়িত এসআরইউ ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার হওয়া বোমা নিষ্ক্রিয় করে।
ঘটনার পর সাধু-বাউল ও ভক্তদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। আখড়াবাড়িতে আগত অনেকেই এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন বলেন, এমন ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
এদিকে বোমা আতঙ্কের মধ্যেও থেমে থাকেনি লালন সাঁইয়ের সাধনা ও মরমি গানের আয়োজন। সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও, আখড়াবাড়ির মূল মঞ্চে লালনসংগীতের আসর এবং আখড়াবাড়িসংলগ্ন কালী নদীর তীরে বসা গ্রামীণ মেলা সোমবার গভীর রাত পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে। উৎসবকে ঘিরে মেলা প্রাঙ্গণে এখনো দর্শনার্থীদের উপস্থিতি রয়েছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় আখড়াবাড়ি ও আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নজরদারি বাড়িয়েছে।
কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন জানান, আখড়াবাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া বোমাটি নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুষ্টিয়া অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মিজানুর রহমান বলেন, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। হয়তো কেউ আতঙ্ক ছড়াতে এমনটি করেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। দুপুর ১২টা থেকে আখড়াবাড়ি প্রবেশে ব্যাপক তল্লাশি চালানো হবে। পুলিশের পাশাপাশি দুই প্লাটুন বিজিবি কাজ করবে। আখড়াবাড়ি প্রবেশের সবগুলো সড়ক ও মোড়ে মোড়ে তল্লাশি চলবে। পুরো আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণেও তল্লাশি চালানো হবে।
উল্লেখ্য, ১৩৬ বছর আগে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় দেহত্যাগ করেন ফকির লালন সাঁই। তার মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক দর্শন আজও সাধু-ফকির ও অনুসারীদের অনুপ্রেরণা জোগায়। বোমাতঙ্ক ও বিদায়ের বিষাদ ছাপিয়ে লালনের সেই মানবতার বাণীই আবারও উচ্চারিত হচ্ছে আখড়াবাড়িতে। সাধু-বাউলদের প্রত্যাশা, নিরাপদ থাকবে সাঁইজির ধাম, নির্বিঘ্নে চলবে সাধনা ও মরমি গানের চর্চা।









