কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুষ্টিয়া একদিন লালন নগরী হবে: সংস্কৃতিমন্ত্রী

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া একদিন ‘লালন নগরী’ হবে বলে মন্তব্য করেছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি বলেন, এখানে পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটবে। গড়াই-মধুমতী নদীতে আবার নৌকা চলবে। সরকার সেই লক্ষ্যে কাজ করছে।

 

গতকাল শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকেলে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালন আখড়াবাড়িতে বাউল সাধক ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবসের তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী। প্রধান অতিথি হিসেবে তিনি অনুষ্ঠানের উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

 

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি মো. তৌহিদ বিন-হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। মুখ্য আলোচক ছিলেন প্রাবন্ধিক অধ্যাপক ড. রশিদুল নবী।

 

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সার্বিক সহযোগিতায় এবং কুষ্টিয়া লালন একাডেমির আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ উৎসব ঘিরে ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়াবাড়িতে জড়ো হয়েছেন দেশ-বিদেশের সাধু-গুরু, বাউল ও ভক্তরা। আখড়াবাড়ি পরিণত হয়েছে তাদের মিলনমেলায়।

 

অনুষ্ঠানে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, তিন-চার সপ্তাহ আগে প্রধানমন্ত্রী সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে এসে লালন উৎসব আয়োজন নিয়ে জানতে চান। এ সময় তিনি স্কুলভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমে শিশুদের লালন সম্পর্কে জানানো যায় কি না, সে বিষয়ে খোঁজ নেন। প্রধানমন্ত্রী চান, লালনের শিক্ষা স্কুলেও পৌঁছে যাক।

 

লালনের দর্শনের গুরুত্ব তুলে ধরে জাহেদ উর রহমান বলেন, বর্তমান বিশ্বে নানা ধরনের পরিচয়কেন্দ্রিক সংঘাত তৈরি হয়েছে। মানুষ সাদা না কালো, মুসলিম না হিন্দু কিংবা ইহুদি না মুসলিম—এ ধরনের পরিচয়কে কেন্দ্র করে সংঘাতে জড়াচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে লালনের দর্শন অনন্য ও গুরুত্বপূর্ণ।

 

‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’—লালনের এই বাণী ধারণ করে মানবতার শিক্ষা ও সত্যের সন্ধানে ভক্তরা আখড়াবাড়িতে আসছেন। প্রচলিত প্রথা ও সাধু রীতি অনুসারে তিন দিনব্যাপী এ উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে।

 

শনিবার সন্ধ্যায় বাল্যসেবার মধ্য দিয়ে বাউল ভক্তদের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। আজ রোববার সকালে রাখালসেবা ও দুপুরে পুণ্যসেবা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। 

 

সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় আলোচনা অনুষ্ঠান হবে। প্রধান অতিথি থাকবেন খুলনা বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল্লাহ হারুন। অতিথি হিসেবে থাকবেন বিশিষ্ট কবি, লেখক ও চিত্রকর ফরহাদ মজহার। প্রধান আলোচক প্রাবন্ধিক প্রফেসর ড. শেখ খালিদ হাসান।

 

এদিন বিশেষ অতিথিদের মধ্যে রয়েছেন ডিআইজি খুলনা রেঞ্জের মো. রেজাউল করিম, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মো. আমিনুল ইসলাম, কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিনসহ অন্যরা। আলোচনা করবেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক প্রফেসর ড. রশিদুজ্জামান। 

 

আগামীকাল সোমবার (১৯ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় সমাপনী আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। প্রধান অতিথি থাকবেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জনাব অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, এমপি। প্রধান আলোচক প্রাবন্ধিক প্রফেসর ড. আহমেদ শফিকুল হাসমী।

 

উৎসব শুরুর প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকেই আখড়াবাড়িতে আসতে শুরু করেন বাউল সাধকরা। তারা মাজারের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে গেয়ে চলেছেন লালন সাঁইয়ের আধ্যাত্মিক বাণী ও দর্শনভিত্তিক গান। উৎসব ঘিরে কুষ্টিয়ায় তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ।

 

১৭ অক্টোবর শনিবার শুরু হওয়া এ আয়োজন চলবে ১৯ অক্টোবর সোমবার পর্যন্ত। উৎসব সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা। প্রায় ৮০০ পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা পুলিশ ও এসআরবি সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন।

 

আলোচনা অনুষ্ঠান শেষে সন্ধ্যায় লালন মঞ্চে সাংস্কৃতিক পর্ব শুরু হয়। এতে ক্লোজআপ ওয়ান তারকা ও লালনসংগীত শিল্পী বিউটিসহ বিভিন্ন শিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠন সংগীত পরিবেশন করে। দ্বিতীয় দিন লালনসংগীত শিল্পী সালমা ও লালন একাডেমির স্থানীয় শিল্পীদের সংগীত পরিবেশনের কথা রয়েছে।

 

উল্লেখ্য, ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর ছেঁউড়িয়ার এই আখড়াবাড়িতেই দেহত্যাগ করেন বাউলসম্রাট ফকির লালন সাঁই। তার রেখে যাওয়া গান ও দর্শন আজও মানুষকে আত্মপরিচয়, মানবতা এবং পরম সত্যের অনুসন্ধানে অনুপ্রাণিত করে। ‘মিলন হবে কত দিনে’, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’ কিংবা ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’— এমন অসংখ্য গানে তিনি মানুষের দেহ, মন, আত্মা, গুরু ও পরম সত্তার সম্পর্ককে তুলে ধরেছেন গভীর দার্শনিক ব্যঞ্জনায়।

 

সাধু-বাউলদের কাছে তাই তিরোধান দিবসের এই আয়োজন নিছক কোনো স্মরণানুষ্ঠান নয়। এটি গুরুর বাণী স্মরণ, সাধনার অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং আত্মার প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধির একটি উপলক্ষ।

 

গানে গানে, ভাবের আদান-প্রদানে ও সাধুসঙ্গে তারা খুঁজে ফেরেন জীবনের গভীরতর অর্থ। বাহ্যিক জগতের কোলাহল পেরিয়ে নিজের ভেতরের মানুষকে চিনতে পারাই তাদের সাধনার অন্যতম লক্ষ্য।

 

লালনের দর্শনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো- জাতপাত, ধর্ম-বর্ণ ও সামাজিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে মানুষের মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠা করা। প্রচলিত পরিচয়ের দেয়াল ভেঙে মানুষের অন্তর্নিহিত সত্তাকে উপলব্ধি করার আহ্বান তার গানে বারবার উঠে এসেছে। এই দর্শনে মানুষকে চেনার জন্য তার বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে অন্তরের পরিচয় ও মানবিক মূল্যবোধ অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

 

লালন অনুসারীদের মতে, হানাহানি, অসহিষ্ণুতা ও সাম্প্রদায়িক বিভেদের এই সময়ে সাঁইজির মানবতাবাদী দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা আরও বেড়েছে। তার বাণী যথাযথভাবে ধারণ ও চর্চা করা গেলে মানুষের মধ্যে সহনশীলতা, সম্প্রীতি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জোরদার হতে পারে। মনের মানুষের সন্ধান আসলে নিজের ভেতরের সংকীর্ণতা অতিক্রম করে বৃহত্তর মানবিক সত্তাকে উপলব্ধি করারও এক সাধনা।

 

এ প্রসঙ্গে লালন গবেষক হৃদয় সাহা বলেন, লালনের আধ্যাত্মিক গান আত্মশুদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের রূপরেখা। বর্তমান সময়ে হানাহানি ও অসহিষ্ণুতা দূর করতে লালনের মানবতাবাদী দর্শন তরুণ প্রজন্মের মাঝে সঠিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কেবল উৎসবের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তার দর্শন নিয়ে গভীর গবেষণা ও চর্চা আরও বাড়াতে হবে।

 

স্মরণোৎসব ঘিরে মরা কালীগঙ্গা নদীর তীরে আখড়াবাড়ির পাশে তৈরি করা হয়েছে বিশাল মঞ্চ। বসেছে গ্রামীণ মেলা। বাহারি পণ্যের পসরা সাজিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। শনিবার সন্ধ্যা থেকে মঞ্চে পরিবেশিত হবে লালনসংগীত ও আলোচনা সভা। সাধুসঙ্গ ও মরমি গানের পাশাপাশি মেলাকে ঘিরেও দর্শনার্থীদের মধ্যে রয়েছে বাড়তি আগ্রহ। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ভালো বেচাকেনার প্রত্যাশা করছেন ব্যবসায়ীরা।

 

তবে উৎসবের বাহ্যিক আয়োজনের বাইরেও লালনের গান, জীবনদর্শন ও আধ্যাত্মিক সাধনার চর্চা এ আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। দেশ-বিদেশে তার গান সমাদৃত হলেও লালনের দর্শন সংরক্ষণ, গবেষণা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে যথাযথভাবে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ব্যক্তিরা।

 

উৎসব নির্বিঘ্ন করতে আখড়াবাড়ি ও আশপাশের এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা, যানবাহন চলাচল এবং সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রস্তুতি নিয়েছে প্রশাসন। শুক্রবার বিকেলে মাজার প্রাঙ্গণ ও মেলার স্থান পরিদর্শন করেন কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসক।

 

জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি তৌহিদ বিন হাসান বলেন, লালনের এই তিরোধান দিবসের স্মরণোৎসব শুধু কুষ্টিয়ার নয়, এটি বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি, মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি আয়োজন। এ উপলক্ষে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধু, ভক্ত ও দর্শনার্থীরা লালনধামে সমবেত হন।

 

তিনি আরও বলেন, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠে কাজ করবে।

 

তিন দিনের এই স্মরণোৎসবে একতারা-দোতারার সুরে, মরমি গানে ও সাধুসঙ্গের আবহে মুখর হয়ে উঠবে ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়াবাড়ি। তবে এই মিলনমেলার গভীর তাৎপর্য কেবল উৎসবের আনন্দে নয়, বরং মানুষের নিজের ভেতরের মানুষকে খুঁজে ফেরার চিরন্তন আকাঙ্ক্ষায়। সাঁইজির গানে যে আত্মজিজ্ঞাসা, সাম্য ও মানবতার বাণী ধ্বনিত হয়েছে, সেই বাণী ধারণ করেই ভক্তদের প্রত্যাশা— মানুষে মানুষে বিভেদ ভুলে মানবিকতার বন্ধনে আবদ্ধ হবে সমাজ।

Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর