কেন্দ্র বাতিল করে তদন্ত শুরু
বিশেষ প্রতিবেদক ॥ জালিয়াতির অভিযোগে কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজের অনার্স পরীক্ষা কেন্দ্র বাতিল করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। একই সঙ্গে ওই কলেজের পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা কুমারখালী সরকারি কলেজ কেন্দ্রে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যেই নির্ধারিত পরীক্ষা কেন্দ্রে উপস্থিত না হয়ে নিজ কলেজের একটি কক্ষে বসে অনার্স প্রথম বর্ষের পরীক্ষা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে। আরও চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, নিজ কলেজে পরীক্ষা দেওয়া ওই শিক্ষার্থীর ওএমআর শিট পরে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্তদের ব্যবহৃত ‘ইনভিজিলেটর অ্যাপ’ দিয়ে স্ক্যান করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় সিস্টেমে জমা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩ আগস্ট কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ কেন্দ্রে অনার্স প্রথম বর্ষের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষা শেষে কেন্দ্রের ম্যানুয়াল উপস্থিতির হিসাবের সঙ্গে ইনভিজিলেটর অ্যাপে স্ক্যান করা পরীক্ষার্থীর সংখ্যার মধ্যে গরমিল ধরা পড়ে। ম্যানুয়াল উপস্থিতির হিসাবে একজন পরীক্ষার্থী কম থাকলেও অ্যাপের তথ্য অনুযায়ী ওই শিক্ষার্থীকে উপস্থিত দেখানো হয়। বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে সংশ্লিষ্টরা তথ্য যাচাই-বাছাই শুরু করেন।
যাচাইয়ে জানা যায়, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দেওয়ার কথা থাকা ওই শিক্ষার্থী সেদিন সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজের প্রতিষ্ঠান কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজের ৩০৫ নম্বর কক্ষের তৃতীয় সারির একটি বেঞ্চে বসে পরীক্ষা দেন। পরে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো একজনের ইনভিজিলেটর অ্যাপের আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ওই শিক্ষার্থীর ওএমআর শিট স্ক্যান করে কেন্দ্রের সিস্টেমে জমা দেওয়া হয়।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর প্রশ্ন উঠেছে, নির্ধারিত কেন্দ্রের বাইরে একজন শিক্ষার্থী কীভাবে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পেলেন এবং পরীক্ষা শেষে অন্য কেন্দ্রের ইনভিজিলেটর অ্যাপ ব্যবহার করে তার ওএমআর কীভাবে স্ক্যান ও জমা হলো। অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করতে গিয়ে ইসলামিয়া কলেজের ওই কক্ষে দায়িত্ব পালন করা ইতিহাস ও ম্যানেজমেন্ট বিভাগের দুই শিক্ষকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পাশাপাশি কলেজটির বিএম শাখার এক কর্মকর্তার দিকেও অভিযোগের আঙুল উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।
কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. আব্দুল লতিফ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ওই শিক্ষার্থী তাদের কেন্দ্রে উপস্থিত না হওয়ায় তাকে অনুপস্থিত দেখানো হয়েছিল। কিন্তু ইনভিজিলেটর অ্যাপে তাকে উপস্থিত দেখানো হচ্ছিল। পরে বিষয়টি ইসলামিয়া কলেজের অধ্যক্ষকে জানানো হয়। একই সঙ্গে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কেও সরাসরি অবহিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হয়েছে। কুষ্টিয়া মডেল থানায় দায়ের করা অভিযোগের কপিসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ছবি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছে পাঠানো হয়েছে।
অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর প্রতিষ্ঠান কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজের অধ্যক্ষ টিপু সুলতান ঘটনার বিষয়ে বলেন, কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজের অনার্স পরীক্ষা কেন্দ্র জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাতিল করেছে। তারা কেন্দ্রটি বহাল রাখার জন্য চেষ্টা করছেন।
পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য আগে থেকেই কেন্দ্র নির্ধারণ করা থাকে। পরীক্ষার্থীদের নির্ধারিত কেন্দ্রেই উপস্থিত হয়ে পরীক্ষা দেওয়ার নিয়ম। পরীক্ষার দিন উপস্থিতি গ্রহণ, প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র সরবরাহ, পরীক্ষা শেষে উত্তরপত্র সংগ্রহ এবং ওএমআর শিট স্ক্যানসহ প্রতিটি ধাপ নির্ধারিত নিয়মে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হওয়ার কথা।
তাদের মতে, একজন শিক্ষার্থী নির্ধারিত কেন্দ্রের বাইরে পরীক্ষা দিয়েছেন এবং তার ওএমআর অন্য একটি কেন্দ্রের ইনভিজিলেটর অ্যাপ ব্যবহার করে জমা হয়েছে—এমন অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নজরে এসেছে এবং নিয়ম অনুযায়ী প্রক্রিয়া চলছে। অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে শুধু ওই শিক্ষার্থী নয়, তাকে সহযোগিতা করে থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের এক শিক্ষক বলেন, একজন পরীক্ষার্থীকে নির্ধারিত কেন্দ্রের বাইরে বসিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হলে বিষয়টি একাধিক ব্যক্তির জানার কথা। কারণ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, উত্তরপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। পরীক্ষা শেষে ওএমআর স্ক্যানের বিষয়টিও কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্তদের নজরদারির মধ্যে থাকার কথা। একজন শিক্ষার্থী এক জায়গায় পরীক্ষা দিলেন, অথচ তার ওএমআর অন্য জায়গার ইনভিজিলেটর অ্যাপ দিয়ে জমা হলো—এটি কীভাবে সম্ভব হয়েছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
তিনি আরও বলেন, একজন শিক্ষার্থীর পক্ষে এককভাবে এমন একটি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। কোথায় পরীক্ষা দিতে হবে, কক্ষে বসার ব্যবস্থা কে করবেন, পরীক্ষা চলাকালে কে তদারকি করবেন এবং পরে ওএমআর কীভাবে স্ক্যান হবে—প্রতিটি ধাপেই কারও না কারও সহযোগিতা প্রয়োজন। তাই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে এর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত ছিলেন কি না, তা তদন্ত করে বের করা জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ঘটনার প্রকৃত চিত্র উদঘাটনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনভিজিলেটর অ্যাপের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ আলামত হতে পারে। কোন আইডি ব্যবহার করে ওএমআর স্ক্যান করা হয়েছে, কখন স্ক্যান করা হয়েছে, কোন ডিভাইস থেকে স্ক্যানটি করা হয়েছে এবং ওই সময়ে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টে কে লগইন করেছিলেন—এসব তথ্য যাচাই করা গেলে ঘটনার অনেকটাই পরিষ্কার হতে পারে।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীর উত্তরপত্র, উপস্থিতি শিট, কেন্দ্রের পরীক্ষার্থী তালিকা, ইসলামিয়া কলেজে ওই দিন পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে কোনো নথি, ছবি বা অন্যান্য প্রমাণ রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. এনামুল করিম বলেন, বিষয়টি তাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী প্রক্রিয়া চলছে। ইতোমধ্যে কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজকে অনার্স পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে বাতিল করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা কুমারখালী সরকারি কলেজ কেন্দ্রে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ওই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বলেন, বিষয়টি তদন্ত করতে হবে। তদন্তের পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এদিকে, নির্ধারিত পরীক্ষা কেন্দ্রের বাইরে বসে পরীক্ষা দেওয়া এবং অন্য কেন্দ্রের ইনভিজিলেটর অ্যাপ ব্যবহার করে ওএমআর জমা দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে শিক্ষা মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ঘটনাটি নিছক একজন শিক্ষার্থীর অনিয়ম, নাকি এর পেছনে একটি সংঘবদ্ধ প্রক্রিয়া ছিল—তা এখন তদন্তের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করছে।
তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।








