কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

সাফল্যের আড়ালে সংকটে ভুগছে কুষ্টিয়া জিলা স্কুল

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, ভালো ফলাফল এবং জাতীয় পর্যায়ে নানা অর্জনের কারণে কুষ্টিয়া জিলা স্কুল এখনো জেলার অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এসএসসি পরীক্ষায় ধারাবাহিক ভালো ফলাফলের পাশাপাশি বিজ্ঞান, বিতর্ক, বিএনসিসি, স্কাউট ও রেড ক্রিসেন্টের কার্যক্রমেও বিদ্যালয়টি সুনাম অক্ষুন্ন রেখেছে। সম্প্রতি বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী শ্রবণপ্রতিবন্ধীদের জন্য এমন একটি ডিভাইস তৈরি করে, যা মানুষের কথা লিখিত ভাষায় প্রকাশ করতে পারে।

এ উদ্ভাবনের জন্য তারা জাতীয় পর্যায়ে স্টার্ট-আপ ও বিজ্ঞান প্রতিযোগিতায় পুরস্কারও পেয়েছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে কুষ্টিয়া জিলা স্কুল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার হয়েছিল। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের শেষের দিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি কোম্পানি কুষ্টিয়ায় প্রবেশ করে এবং কুষ্টিয়া জিলা স্কুলকে তাদের মূল ঘাঁটি বা সদর দফতর হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু ৩০ মার্চ মুক্তিবাহিনী এবং কুষ্টিয়া জিলা স্কুলে সে সময়কার এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা কুষ্টিয়া শহর এবং জিলা স্কুলকে শত্রুমুক্ত করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

চারদিক থেকে পাক বাহিনীর ওপর আক্রমণ শুরু হয়। তীব্র প্রতিরোধ এবং আক্রমণের মুখে পাক সেনাদের বড় একটি অংশ পিছু হটে জিলা স্কুলের ভেতরে গিয়ে আশ্রয় নেয়। কুষ্টিয়ার অন্যান্য এলাকা শত্রুমুক্ত হলেও বেশ কিছুদিন জিলা স্কুল চত্বরে পাকিস্তানি সেনারা অবরুদ্ধ হয়ে থাকে। পরে এপ্রিল মাসের ২ তারিখের দিকে মুক্তি বাহিনীর চূড়ান্ত আক্রমণে অনেক পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয় এবং প্রচুর অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম উদ্ধার হয়।

কুষ্টিয়া জিলা স্কুলকে শত্রুমুক্ত করতে স্কুলের সে সময়কার শিক্ষার্থী বাহাউদ্দিনসহ অনেকেরই অবদান ছিল। কুষ্টিয়া জিলা স্কুল জেলার একটি ঐতিহ্যবাহী ও শীর্ষস্থানীয় সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়, যা ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৬২ সালে বোর্ডের অনুমোদন লাভ করে। এটি এই অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারে এবং দক্ষ শিক্ষার্থী তৈরিতে সুদীর্ঘকাল ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কুষ্টিয়া সার্কিট হাউজের পাশে প্রায় ৮ একর জমির ওপর এটি অবস্থিত।

তৃতীয় শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত দুই শিফটে পাঠদান করা হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে দুটি শিফট মিলিয়ে ১৯০৮ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এছাড়াও ৫২ জন শিক্ষক এবং ৩ জন প্রশাসনিক কর্মকর্তা রয়েছেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই যশোর বোর্ডের অধীনে এসএসসি ও অন্যান্য সমাপনী পরীক্ষায় বিদ্যালয়টি নিয়মিত সেরা স্থান অধিকার করে আসছে। গ্রেডিং পদ্ধতি চালুর পরও এটি ধারাবাহিকভাবে বোর্ডের সেরা দশটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্যতম অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হচ্ছে। কুষ্টিয়া জিলা স্কুলের সাবেক খ্যাতিমান শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশিষ্ট গবেষক, বাংলা একাডেমির পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক, শিক্ষাবিদ ড. আবুল আহসান চৌধুরী, দুই ভাই প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ড. আবুল বারকাত ও তার ভাই প্রফেসর ড. আবুল হুসসাম, একজন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী, যিনি দীর্ঘদিন গবেষণা করে কম খরচে ভূ-গর্ভস্থ আর্সেনিকযুক্ত পানি পরিশোধনের পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন।

বর্তমানে ভার্জিনিয়ার ফেয়ারফ্যাক্সেও জর্জ মেসন বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে অধ্যাপনা করছেন। ভূ-গর্ভস্থ আর্সেনিক যুক্ত পানি পরিশোধন যন্ত্র ‘সনো ফিল্টার’ আবিষ্কারের জন্য গ্লোবাল হিরো অব দি এনভায়রনমেন্ট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। এছাড়াও কুষ্টিয়া জিলা স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী এসআই টুটুল, লেখক, সংগীতজ্ঞ এবং প্রকৌশলী ড. নওরিন হাসান চমক, বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের উইকেট রক্ষক ও ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ এনামুল হক বিজয়, বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী শহীদ আবরার ফাহাদ অন্যতম।

স্কুল প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে ১৯৬৩ সাল থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে মাধ্যমিক পরীক্ষায় যশোর বোর্ডের মধ্যে ১ থেকে ২০ জন স্থান প্রাপ্তদের তালিকায় স্থান ধরে রেখেছিল এই স্কুলের শিক্ষার্থীরা। ২০২১ সালে এসএসসি পরীক্ষায় এই স্কুল থেকে ২৯৩ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে। ২৯১ জন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় এবং জিপিএ ফাইভ লাভ করে ১৭৪ জন শিক্ষার্থী। ২০২২ সালে সালের এসএসসি পরীক্ষায় এই স্কুল থেকে ২৯১ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে, ২৯১ জন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় এবং জিপিএ ফাইভ লাভ করে ২৪৩ জন শিক্ষার্থী। ২০২৩ সালে এসএসসি পরীক্ষায় এই স্কুল থেকে ২৯৯ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। ২৯৮ জন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় এবং জিপিএ ফাইভ লাভ করে ২৪৩ জন শিক্ষার্থী।

২০২৪ সালে এসএসসি পরীক্ষায় এই স্কুল থেকে ২৬১ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। ২৬১ জন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় এবং জিপিএ ফাইভ লাভ করে ২১২ জন শিক্ষার্থী। ২০২৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় এই স্কুল থেকে ২৭৮ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। ২৭৭ জন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় এবং জিপিএ ফাইভ লাভ করে ২১৯ জন শিক্ষার্থী। সর্বশেষ ২০২৬ সালে ২৮৮ জন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে পাস করে ২৮৪ জন। এর মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৫৬জন। এছাড়াও সহশিক্ষা কার্যক্রম পড়াশোনার পাশাপাশি বিজ্ঞান মেলা, বিতর্ক, খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে চলেছে।

‘আমাদের সময় আমরা বিকেল হলেই স্কুলের খেলার মাঠে চলে আসতাম। কিন্তু এখনতো আর খেলাধুলা হয় না। আমাদের ছেলে-মেয়েরা সব মোবাইল-কম্পিউটারে আসক্ত। মোবাইল-কম্পিউটারে গেম খেলা নিয়ে বেশি মাতামাতি করছে। চাপ নিচ্ছে যে জিপিএ-৫ পেতেই হবে। কিন্তু আমাদের সময় শিক্ষক এবং অভিভাবকদের একটাই কথা ছিল- ভালো ফলাফল করো। আমাদের সময় শিক্ষক এবং অভিভাবক উভয়ই ফলাফলে যেমন গুরুত্ব দিতেন, তেমনি সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতেন। আর এখনকার অভিভাবকরা চান যেকোনো মূল্যে তার সন্তানকে গোল্ডেন এ প্লাস পেতেই হবে।’

কুষ্টিয়া জিলা স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র বিশিষ্ট গবেষক, বাংলা একাডেমির পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক ও শিক্ষাবিদ ড. আবুল আহসান চৌধুরী তার স্কুল জীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এ কথাগুলো বলেন। স্কুলের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, কুষ্টিয়া জিলা স্কুলের বলা যায় একেবারে শুরুর দিকে ১৯৬৫ সালে আমি ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই। সেসময় স্কুলের পরিবেশ কেমন ছিল সেটা বলে বোঝানো যাবে না। সেই পরিবেশতো বহু আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আমাদের সেই সময়ে শৃঙ্খলাটা এত কঠোর ছিল যে ক্লাস আওয়ারে কোনো ছাত্র ক্লাসরুমের বাইরে যেতে পারত না। যাওয়ার হুকুম ছিল না।

স্কুল জীবনের আরকেটি স্মৃতি উল্লেখ করে ড. আবুল আহসান চৌধুরী বলেন, আমার বাবা চেয়েছিলেন আমি বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করি। আমাকে প্রকৌশলী বানাতে চেয়েছিলেন। আমি তখন দশম শ্রেণির ছাত্র। সেসময় সৈয়দ শাহ মনিরুল হক ছিলেন আমাদের প্রধান শিক্ষক। স্কুল চলাকালীন একদিন আমি করিডোর দিয়ে যাচ্ছিলাম। স্যার আমাকে করিডোরে আটকালেন। মনিরুল হক স্যারের হাতে সবসময় একটা বেত থাকত। আমাকে বেত দিয়ে শপাং করে একটা মারলেন। বললেন তোমাকে আমি পরীক্ষা দিতে দেব না। তোমাকে বিজ্ঞান ছেড়ে মানবিক (কলা) বিভাগ নিয়ে পড়তে হবে।

বিজ্ঞান পড়তে আমারো ভালো লাগত না। কিন্তু ততদিনে দশম শ্রেণিতে বিজ্ঞান নিয়ে পড়ার তিন-চার মাস হয়ে গেছে। স্যারের কথামতো এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগ পরিবর্তন করে মানবিক নিলাম। ১৯৬৯ সালে এসএসসি পরীক্ষায় কুষ্টিয়া জিলা স্কুল থেকে আমি সম্মিলিত মেধা তালিকায় ১২তম স্থান অধিকার করলাম। উদাহরণটা এজন্য দিলাম যে একজন ভালো ডাক্তার যেমন রোগীকে দেখলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলে রোগীর রোগ সম্পর্কে ধারণা দিতে পারেন তেমনি একজন সত্যিকারের শিক্ষক একজন ছাত্র কী পড়াশোনা করবে কোন বিভাগ নিয়ে পড়াশোনা করলে ভালো হবে তা নির্ধারণ করে দিতে পারার ক্ষমতা রাখেন।

সৈয়দ শাহ মনিরুল হক ছিলেন তেমনই একজন শিক্ষক। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার সমালোচনা করে তিনি বলেন, আশ্চর্য হওয়ার বিষয় হচ্ছে, স্কুল থেকে মানবিক বিভাগ তুলে দেওয়া হয়েছে। এটা কি হতে পারে? এর চাইতে বড় অবক্ষয় আর কী হতে পারে! কুষ্টিয়া জিলা স্কুলের স্মৃতিচারণ করেন আরেক সাবেক শিক্ষার্থী ড. নওরিন হাসান চমক, যিনি চমক হাসান নামেই বেশি পরিচিত। চমক হাসান একাধারে লেখক, সংগীতজ্ঞ এবং প্রকৌশলী। মূলত খুব সহজ ও মজার ছলে গণিত ও বিজ্ঞানকে সবার মাঝে তুলে ধরার জন্য বেশ পরিচিত। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন সায়েন্টিফিক করপোরেশনে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

তিনি বলেন, এখনকার একটা ছেলে আসলে দৈনিক কত ঘণ্টা পড়ালেখায় সময় ব্যয় করছে এটারও একটা হেলদি লিমিট আছে। মানে ধরেন একটা ছেলে যদি সারাদিন এটার পেছনে ব্যয় করে- এটা যে খুব ভালো কিছু, তা না। হয়ত সারাদিন সে স্কুল করছে তারপর বাকি একটা বড় অংশ সে কোচিং করছে। এটা করলে সে নিজে যে জিনিসগুলোকে ধারণ করবে, জিনিসগুলো বুঝবে, নিজের মতো করে পড়বে ওই সময় আর থাকে না। আমাদের সময় ওটা ছিল। আমার এখন মনে হচ্ছে যে এখন প্রত্যেকটা মুহূর্ত সবাই দৌড়াচ্ছে। এই দৌড়ানোটা আসলে জ্ঞান অর্জন বা জ্ঞান ধারণ করার জন্য ভালো না।

স্কুল জীবনের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে চমক হাসান বলেন, আমি কুষ্টিয়া মিশন স্কুলের ছাত্র ছিলাম। ওখান থেকে ১৯৯৭ সালে কুষ্টিয়া জিলা স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর আমার কাছে মনে হয়েছে জিলা স্কুল মিশন স্কুলের তুলনায় অত ভালো ছিল না। কিন্তু ওভারঅল আমার মনে হয় যে ওই এলাকার তখনো হাই স্কুলগুলোর মধ্যে কুষ্টিয়া জিলা স্কুল বেস্ট ছিল। ভালো স্টুডেন্ট যারা তারা সবাই ওখানে ছিল, তো ওটার ফলে একটা ভালো কালচার ছিল। তিনি বলেন, পড়ালেখা জিনিসটার সংজ্ঞা বদলে গেছে। আমরা কেন পড়ালেখা করছি। আমাদের সময় নিজেদের ভেতর থেকে একটা জিনিস জেনে বুঝে পড়ার একটা বিষয় কাজ করত। আমরা ওই জিনিসগুলো বোঝার চেষ্টা করতাম।

পরবর্তীতে যেটা হয়ে গেল যে যেভাবেই হোক জিপিএ ফাইভ পেতেই হবে। ওটা পাওয়ার জন্য আমাদের সবকিছু বুঝে পড়ার দরকার নাই- এরকম একটা সিচুয়েশন হয়ে গেল। মানে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা খুব ধীরে ধীরে চেঞ্জ হলো। এটার একটা বড় ইফেক্ট পড়েছে। একইসঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোচিংয়ের দৌরাত্ম্য বেড়েছে অনেক। আমাদের সময়ে পড়ালেখার পাশাপাশি যে জিনিসগুলো সেগুলো থাকাটাও একটা পজিটিভ ব্যাপার ছিল। আমাদের সময় শিশু একাডেমি ছিল।

বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে আমরা খুব অ্যাকটিভ ছিলাম। ওই সময় স্কুলে একটা বিতর্কের সংগঠন ছিল আমাদের। এই সংগঠনগুলোতে থাকার কারণে ওই জায়গাগুলোতে একটা ভালো পরিবেশ তৈরি হতো। ফলে আমাদের মাঝে একটা জিনিস কাজ করত- শুধুমাত্র ওই ক্লাসের পড়ার বাইরেও আমাদের অনেক কিছু জানতে হবে। এই জায়গাগুলোতে অ্যাক্টিভ হতে হবে। ওইটা থাকলে পড়ালেখাতেও একটা ইম্প্যাক্ট পড়ে। ধারাবাহিক এই সাফল্যের আড়ালে নানাবিধ বাস্তব সমস্যার কারণে অনেকটাই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে ১৯৬১ সালে স্থাপিত জেলার ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তি, ল্যাব এবং পর্যাপ্ত সময়ের অভাবে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৫২ জন শিক্ষক ও তিনজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা রয়েছেন। প্রতিটি শ্রেণিতে এখন ৫৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।

আগে এ সংখ্যা ছিল ৬০। শিক্ষক সংকট না থাকলেও ডাবল শিফটের কারণে পাঠদানের সময় আগের থেকে কমাতে হয়েছে। প্রথম ক্লাস ও টিফিনের পরের একটি ক্লাস ৪৫ মিনিট হলেও বাকি ক্লাসগুলো ৩০ থেকে ৩৫ মিনিটের মধ্যে শেষ করতে হচ্ছে। এতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুরো পাঠ শেষ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শিক্ষক বলেন, আগের মতো শাসনের পরিবেশ নেই। অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে উপস্থিতির চেয়ে কোচিংয়ের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে ক্লাসে মনোযোগ কমে যাচ্ছে। আবার অল্প সময়ের মধ্যে সিলেবাস শেষ করতে গিয়ে শিক্ষকরাও চাপের মধ্যে থাকছেন।

বিদ্যালয়ে দুটি কম্পিউটার ল্যাব রয়েছে। এর মধ্যে একটি সচল, অন্যটি প্রায় ব্যবহার হয় না। সচল ল্যাবটিও ২০০৭ সালে তৈরি। আগের দিনের সেই পেন্টিয়াম-২ ও পেন্টিয়াম-৩ কম্পিউটারের অনেকগুলো এখনো ব্যবহার করা হচ্ছে। মাত্র ২০টি কোর আই-৩ কম্পিউটার রয়েছে। শিক্ষকদের মতে, বর্তমান যুগের তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে এসব কম্পিউটার সামগ্রী যথেষ্ট নয়। এখন শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন আধুনিক মানের কম্পিউটার ও যন্ত্রাংশ। বিদ্যালয়ে আলাদা মাল্টিমিডিয়া কোনো ক্লাসরুম নেই। সাধারণ শ্রেণিকক্ষেই স্মার্ট বোর্ড ব্যবহার করে ক্লাস নেওয়া হয়। অধিকাংশ শ্রেণিকক্ষে স্মার্ট বোর্ড থাকলেও আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব, কোডিং ক্লাব বা রোবোটিক্স ল্যাব নেই। জেলা অ্যাম্বাসেডররা মাঝে মাঝে এসে কোডিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেন।

বিদ্যালয়ে আধুনিক বিজ্ঞান ল্যাব থাকলেও শিক্ষকরা বলছেন, পাবলিক পরীক্ষায় ব্যবহারিক দক্ষতা যাচাই না করে প্রায় সব শিক্ষার্থীকে পূর্ণ নম্বর দেওয়া হয়। এতে শিক্ষার্থীদের ল্যাবে সময় দিয়ে হাতে কলমে শেখার প্রয়োজনীয়তা এবং গুরুত্ব দিন দিন কমে যাচ্ছে। বিদ্যালয় সূত্র জানায়, সরকারি বরাদ্দ এলেও অফিসের প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা, কম্পিউটার মেরামত ও লাইব্রেরির জন্য বই কেনার কাজ পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে করা হয়। জেলা শিক্ষা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। যে কারণে তৃতীয় চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ করা যাচ্ছে না। বিদ্যালয়ের বিএনসিসি, স্কাউট ও রেড ক্রিসেন্টের সদস্যরা বিভিন্ন সরকারি ও সামাজিক অনুষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন।

তবে তাদের যাতায়াত, খাবার ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম মেরামতের খরচ বিদ্যালয়কেই বহন করতে হয়। শিক্ষকরা বলছেন, কুষ্টিয়া জিলা স্কুলের ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব, উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, কোডিং ও রোবোটিক্স কার্যক্রম এবং ব্যবহারিক শিক্ষার আরও উন্নয়ন জরুরি। তা না হলে ভবিষ্যতে জিলা স্কুলগুলোর ধারাবাহিক সাফল্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি চলছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে। বিদ্যালয়ের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মুন্সি কামরুজ্জামান ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর থেকে দায়িত্ব পালন করছেন।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মুন্সি কামরুজ্জামান বলেন, বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী, বিশেষ করে ক্লিনারের তীব্র সংকট রয়েছে। এছাড়া নাইটগার্ডের পদ শূন্য। বিদ্যালয়ে একটি লাইব্রেরি থাকলেও সেখানে কোনো লাইব্রেরিয়ান বা সহকারী লাইব্রেরিয়ান নেই। তিনি আরও বলেন, বিদ্যালয়ে কম্পিউটার ল্যাব থাকলেও কম্পিউটার ল্যাব পরিচালনার জন্য কোনো পদ সৃষ্টি করা হয়নি। ফলে অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়ে এসব ক্লাস পরিচালনা করতে হচ্ছে। এতে তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

প্রধান শিক্ষক বলেন, এসব বিষয়ে সরকারের নজর দেওয়া জরুরি। তার দাবি, বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোতে এসব পদে জনবল নিয়োগের সুযোগ থাকলেও সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টি ও নিয়োগ না থাকায় তারা বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোর তুলনায় কিছুটা হলেও পিছিয়ে পড়ছে। অভিযোগ রয়েছে অধিকাংশ শিক্ষক বিদ্যালয়ে ক্লাস নেওয়ার চাইতে প্রাইভেট পড়ানো বা কোচিং সেন্টারে বেশি সময় দিয়ে থাকেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, বিদ্যালয়ে একাধিক শিক্ষক রয়েছে যারা তাদের কাছে প্রাইভেট না পড়লে বা তাদের কোচিং সেন্টারে ভর্তি না হলে স্কুলের পরীক্ষায় নম্বর কম দিয়ে থাকেন।

শিক্ষকদের বেপরোয়া কোচিং বাণিজ্যের কারণে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার দিনদিন কমছে। স্কুলে পড়ালেখার পরিবর্তে শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট এবং কোচিংয়ের প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়ছে। অভিভাবকদের অনেকেরই অভিযোগ কুষ্টিয়া জিলা স্কুলের পড়ালেখার মান দীর্ঘদিন ধরে আর আগের মতো নেই। নামমাত্র ক্লাস হয়। ফলে বাধ্য হয়েই শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট টিউটর অথবা কোচিং সেন্টারে পাঠাতে হয়। স্কুলের ভালো ফলাফলের জন্য অভিভাবকরা স্কুলের চাইতে শিক্ষার্থীদের নিজেদের প্রচেষ্টাকেই বেশি মূল্য দিচ্ছেন। জেলা শিক্ষা অফিসার আবু তৈয়ব মো. ইউনুছ আলী বলেন, স্কুলের তৃতীয় চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ আমাদের হাতে নেই, মাউশি থেকে এগুলো হয়ে আসে আমরা মাত্র চাহিদা দিতে পারি।

স্কুলে কোচিং বাণিজ্যের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২০১২ সালের পরিপত্র অনুযায়ী পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ কোচিং কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশনা রয়েছে। এর উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মান উন্নয়ন করা। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সরকারি স্কুলগুলো বেসরকারি বা আধা-সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় কিছুটা অবহেলিত অবস্থায় রয়েছে। তবে আশা করি, ভবিষ্যতে এসব সমস্যার সমাধান হবে। জিলা স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন-হাসান বলেন, জিলা স্কুল কুষ্টিয়ার বড় স্কুলগুলোর মধ্যে অন্যতম। প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার মান উন্নয়নসহ বিদ্যমান যে সকল সমস্যা রয়েছে সেগুলি যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করে সমাধানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর