কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স
প্রকাশ: ৯ই আগস্ট ২০২৬, ২:২৫ এএম

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজের সাবেক সভাপতি ও কুষ্টিয়া জেলা বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ শামসুর রহমান বাবুর বিরুদ্ধে কলেজের নিজস্ব তহবিল থেকে কোটি কোটি টাকা উত্তোলন, ‘রহিমা আফছার একাডেমিক ভবন’ নির্মাণে অনিয়ম, দরপত্র প্রক্রিয়ায় কারসাজি, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন মো. আব্দুল্লাহ বিন ইফতেখার। অভিযোগের সঙ্গে অর্থ উত্তোলনের স্বাক্ষরিত রেজিস্টারের ফটোকপি এবং ভবনের ছবিও সংযুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন মুহাম্মদ শামসুর রহমান বাবু। তাঁর দাবি, তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন এবং ভবন নির্মাণ কিংবা ঠিকাদার নির্বাচনের সঙ্গে সরাসরি তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, মুহাম্মদ শামসুর রহমান বাবু ২০১৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রথম দফায় এবং ২০২২ সালের ১০ মার্চ থেকে ২০২৪ সালের ৯ মার্চ পর্যন্ত দ্বিতীয় দফায় কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। দুই দফায় মোট ছয় বছর তিনি কলেজটির পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন।
অভিযোগকারীর দাবি, দীর্ঘ এ সময়ে কলেজের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, উন্নয়নকাজ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে একাধিক অনিয়ম হয়েছে। এসব অভিযোগের প্রকৃত সত্য উদঘাটনে কলেজের ব্যাংক হিসাব, চেক, রেজিস্টার, ভাউচার, টেন্ডার নথি এবং নির্মাণসংক্রান্ত সব কাগজপত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
অভিযোগপত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কলেজের ‘রহিমা আফছার একাডেমিক ভবন’ নির্মাণকে ঘিরে। অভিযোগকারীর দাবি, ভবন নির্মাণের জন্য কলেজের নিজস্ব তহবিল থেকে ৭ কোটি ৫৪ লাখ ৩৭ হাজার ৫৪৪ টাকা ৯৮ পয়সা উত্তোলন করা হয়েছে। এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে নির্মাণের প্রাক্কলন, অনুমোদন, দরপত্র, ঠিকাদার নির্বাচন, কাজের অগ্রগতি এবং বিল পরিশোধের পুরো প্রক্রিয়া যাচাই করা জরুরি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, ভবন নির্মাণের আগেই প্রয়োজনীয় প্ল্যান অনুমোদনের বিষয়টি যথাযথভাবে সম্পন্ন করা হয়নি। এ ছাড়া নির্মাণকাজের দরপত্র আহ্বান ও ঠিকাদার নির্বাচনের ক্ষেত্রেও নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, নির্মাণকাজের দরপত্র প্রক্রিয়ায় সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ না দিয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি দরদাতাকে কাজ দেওয়া হয়েছে।
এতে প্রশ্ন উঠেছে—কী প্রক্রিয়ায় ঠিকাদার নির্বাচন করা হয়েছিল, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত কী ছিল এবং সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে কী কারণ দেখানো হয়েছিল? অভিযোগকারীর দাবি, এসব নথি যাচাই করলেই টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রকৃতপক্ষে কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না, তা পরিষ্কার হবে।
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, তৎকালীন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফের বাবা-মায়ের নামে ভবনটি নির্মাণ করা হয়। ভবনটির নির্মাণকাজ পছন্দের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেছেন মো. আব্দুল্লাহ বিন ইফতেখার। তবে এ অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন মুহাম্মদ শামসুর রহমান বাবু।
তিনি বলেন, টেন্ডারের মাধ্যমে ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছে। এখানে আমার কিছু করার নেই। সর্বনিম্ন দরদাতাই কাজ পেয়েছে। তবে ভবনটির ঠিকাদার মাহবুব-উল আলম হানিফের চাচাতো ভাই এবং কুষ্টিয়া সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতা—এ তথ্য বাবু স্বীকার করেছেন।
ভবন নির্মাণের সঙ্গে নিজের সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই দাবি করে মুহাম্মদ শামসুর রহমান বাবু বলেন, কলেজের নির্মাণ কমিটির সভাপতি ছিলেন নাসির মৃধা।
তাঁর ভাষ্য, “নির্মাণের জন্য যে ব্যয় হয়েছে, আমাকে যখন যেটা বলা হয়েছে, আমি সেগুলো চেকের মাধ্যমে পরিশোধ করেছি। নির্মাণকাজের সঙ্গে সরাসরি আমার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। চেকে স্বাক্ষর থাকার পরও সরাসরি সম্পৃক্ত না থাকা প্রসঙ্গে পুনরায় জানতে চাইলে প্রসঙ্গটি তিনি কৌশলে এড়িয়ে যান।
তবে অভিযোগকারীর প্রশ্ন, কলেজের সভাপতি হিসেবে বিপুল অঙ্কের অর্থের চেক পরিশোধের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ও দায়িত্বের পরিধি কতটুকু ছিল এবং এসব অর্থের বিপরীতে যথাযথ বিল-ভাউচার ও কাজের পরিমাপ যাচাই করা হয়েছিল কি না সেটা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
অভিযোগে শুধু ভবন নির্মাণের অর্থ নয়, সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে কলেজের তহবিল থেকে বিভিন্ন সময়ে অর্থ উত্তোলন করে আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, কোন খাতে কত টাকা উত্তোলন করা হয়েছে, কার অনুমোদনে করা হয়েছে এবং সেই অর্থ বাস্তবে কী কাজে ব্যয় হয়েছে—তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ ও যাচাই করা দরকার।
এ জন্য কলেজের হিসাবরক্ষণ বিভাগ, ব্যাংক হিসাব, চেক রেজিস্টার, ক্যাশবুক, বিল-ভাউচার, সভার কার্যবিবরণী এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
মুহাম্মদ শামসুর রহমান বাবু দাবি করেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের আগেই তিনি কলেজের সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। তাছাড়া বেশ কয়েক বছর আগে তিনি বঙ্গবন্ধু পরিষদ কুষ্টিয়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদকেরও পদ ছেড়েছেন বলে জানান। তবে তাঁর এসব দাবির পক্ষে কোনো পদত্যাগপত্র বা সংশ্লিষ্ট নথি দেখাতে পারেননি তিনি।
এ কারণে তাঁর পদত্যাগের তারিখ, পদত্যাগপত্র গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী সময়ে কলেজ পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রমে তাঁর ভূমিকা ছিল কি না—এসব বিষয়ও যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
এদিকে সভাপতির দায়িত্বে থাকাকালে নিজ বাড়ির একটি কক্ষ থেকে এক নারীর সঙ্গে তাকে স্থানীয়রা আটক করেছিলেন—এমন অভিযোগের বিষয়েও মুহাম্মদ শামসুর রহমান বাবুর বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়।
তিনি এ অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলেন, এটা কখনোই সত্য নয়। ওই মেয়েটি কলেজের ভর্তি ফি মওকুফের বিষয়ে আমার কাছে এসেছিল। বিষয়টি নিয়ে যে অভিযোগ করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
তবে ভর্তি ফি মওকুফের মতো কলেজ-সংক্রান্ত প্রশাসনিক বিষয় নিয়ে ওই নারী তাঁর অফিসে না গিয়ে বাসায় কেন গিয়েছিলেন—এ প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি তিনি।
অভিযোগকারী মো. আব্দুল্লাহ বিন ইফতেখার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে পুরো বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তার এই অভিযোগটি গত ৩ আগষ্ট জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে নথিভুক্ত হয়েছে।
বিশেষ করে— কলেজের তহবিল থেকে উত্তোলন করা ৭ কোটি ৫৪ লাখ ৩৭ হাজার ৫৪৪ টাকা ৯৮ পয়সা কোথায় ব্যয় হয়েছে, ‘রহিমা আফছার একাডেমিক ভবন’ নির্মাণের প্রকৃত ব্যয় কত, নির্মাণের আগে যথাযথ প্ল্যান ও অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না, টেন্ডার প্রক্রিয়া বিধি অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছিল কি না, সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দেওয়ার কারণ কী, ঠিকাদার নির্বাচনে কোনো প্রভাব বা পক্ষপাত ছিল কি না, কলেজের তহবিল থেকে অন্য কোনো অর্থ অনিয়মের মাধ্যমে উত্তোলন বা ব্যয় করা হয়েছে কি না। এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে বের করার দাবি জানানো হয়েছে।
কলেজের মতো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে কোটি কোটি টাকা ব্যয় এবং একটি বড় ভবন নির্মাণকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে বিপুল অঙ্কের অর্থ উত্তোলন, টেন্ডার প্রক্রিয়া, ঠিকাদার নির্বাচন এবং নির্মাণের অনুমোদন সংক্রান্ত নথি যাচাই না হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্য নির্ধারণ করা কঠিন।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত মুহাম্মদ শামসুর রহমান বাবু সব অভিযোগ অস্বীকার করে নিজের দায়িত্বশীলতার দাবি করেছেন এবং বলেছেন, তিনি কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নন।
ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা, অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং অভিযোগগুলোর ভিত্তি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে। তদন্তে কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য