খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২ই আগস্ট ২০২৬, ১:৪৮ এএম

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রাচীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা বিশ্বাস কমিউনিটি চক্ষু হাসপাতালের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসা, অস্ত্রোপচারে অনিয়ম, নিম্নমানের লেন্স ব্যবহার, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল সংকট এবং রোগীদের সঙ্গে প্রতারণার একের পর এক অভিযোগ সামনে আসায় এলাকাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
একাধিক ভুক্তভোগী পরিবার অভিযোগ করেছে, হাসপাতালটির চিকিৎসা গ্রহণের পর তাদের স্বজনদের চোখের অবস্থা মারাত্মকভাবে অবনতি হয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে গত ২৯ জুলাই। রশনি নামে ১০ বছর বয়সী এক শিশুর চোখে আঞ্জনির চিকিৎসা নিতে গেলে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ ওঠে। পরিবারের দাবি, হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নেওয়ার পর শিশুটির চোখের অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে।
পরে তাকে কুষ্টিয়ার একটি বিশেষায়িত চক্ষু হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানকার চিকিৎসক ঢাকায় উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দেন। অসহায় পরিবারটি বিষয়টি নিয়ে কুমারখালীতে ফিরে স্থানীয়দের জানালে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী বিশ্বাস কমিউনিটি চক্ষু হাসপাতালের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। একপর্যায়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে কুমারখালী উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রাসেল উদ্দিন বাবু ঘটনাস্থলে পৌঁছে হাসপাতালের পরিচালক মো. সুরুজ বিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলেন।
এ সময় তিনি শিশুটির চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বহনের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। পরে পরিচালক শিশুটির চিকিৎসার সব দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস দিলে পরিস্থিতি শান্ত হয় এবং বিক্ষুব্ধ জনতা সেখান থেকে চলে যায়। শুধু শিশুটির ঘটনাই নয়, হাসপাতালটির বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন একাধিক রোগী ও তাদের স্বজনরা।
ডালিয়া খাতুন নামে এক নারী অভিযোগ করেন, ছানি অপারেশনের সময় একজন স্বীকৃত অ্যানেস্থেসিওলজিস্টের পরিবর্তে হাসপাতালের পরিচালক নিজেই তার চোখে অবশ করার ইনজেকশন প্রয়োগ করেন। অপারেশনের পরপরই তার চোখে তীব্র ব্যথা, রক্তক্ষরণ শুরু হয়। পরে ভুল পাওয়ারের লেন্স বসানোর কারণে বর্তমানে তার চোখ প্রায় অকেজো হয়ে পড়েছে বলে দাবি করেন তিনি। ডালিয়া খাতুন জানান, চিকিৎসা সংক্রান্ত কাগজপত্র, লেন্সের রসিদসহ প্রয়োজনীয় প্রমাণাদি নিয়ে তিনি প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করবেন।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন কুমারখালীর বাসিন্দা লিটু। তিনি জানান, তার বোন জামাইয়ের ছানি অপারেশনের পর অবস্থার অবনতি হলে বাধ্য হয়ে ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসা করাতে হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, হাসপাতালটিতে নিয়মিতভাবে রোগীদের চোখে নিম্নমানের লেন্স বসানো হয়। এছাড়া প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ছাড়াই অস্ত্রোপচার চালানো হচ্ছে। ১০ শয্যার অনুমোদনপ্রাপ্ত হাসপাতালটিতে কাগজে-কলমে একাধিক চিকিৎসকের নাম থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ সময় একজন চিকিৎসকের মাধ্যমেই চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালটির নতুন ভবন উদ্বোধনের সময় গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ওপর বাঁশের তোরণ নির্মাণ করা হলেও দীর্ঘদিন তা অপসারণ করা হয়নি। স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সংলগ্ন দেয়ালে অনুমতি ছাড়াই হাসপাতালের বড় বড় বিজ্ঞাপন টাঙানোসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও তুলেছেন এলাকাবাসী। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এসব অভিযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
তবে হাসপাতালের পরিচালক মো. সুরুজ বিশ্বাস সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, আমি কোনো চিকিৎসক নই। আমি কাউকে অ্যানেস্থেসিয়া দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমাদের হাসপাতালে ছানি অপারেশন করেন ডা. মোয়াজ্জেম হোসেন মিলন এবং অ্যানেস্থেসিয়ার দায়িত্ব পালন করেন ডা. খালেদ সাইফুল্লাহ। শিশু রশনির বিষয়ে তিনি বলেন, শিশুটির চোখে আঞ্জনি ছিল। সেটি ফেটে যাওয়ায় রক্ত বের হয়েছিল। পরে চিকিৎসক তাকে পুনরায় দেখেছেন। বিষয়টি নিয়ে পরিবারের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। সাময়িক সমস্যা হলেও কয়েক দিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে।
চিকিৎসক সংকটের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন, হাসপাতালে তিনজন চিকিৎসক ও ছয়জন ডিপ্লোমা নার্স কর্মরত রয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন চিকিৎসক বর্তমানে ছুটিতে আছেন। এদিকে অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট ডা. খালেদ সাইফুল্লাহ বলেন, আজই প্রথম তাদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ওই হাসপাতালে পরিচালিত কোনো অস্ত্রোপচার বা অ্যানেস্থেসিয়ার সঙ্গে আমি কোনোভাবেই যুক্ত ছিলাম না।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডা. শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, এ পর্যন্ত আমাদের কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত কমিটি গঠন করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসায় কুমারখালীবাসীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এলাকাবাসীর দাবি, বিশ্বাস কমিউনিটি চক্ষু হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম, জনবল, অপারেশন থিয়েটারের মান, ব্যবহৃত লেন্সের গুণগত মান এবং লাইসেন্সের শর্ত যথাযথভাবে প্রতিপালন করা হচ্ছে কি না—তা দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তাদের মতে, মানুষের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অঙ্গ চোখের চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা বা অনিয়ম মেনে নেওয়া যায় না।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য