খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ই জুলাই ২০২৬, ২:১৪ এএম

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনকে ঘিরে একের পর এক অনিয়ম ও অসংগতির অভিযোগ সামনে এসেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং তাদের কল্যাণের উদ্দেশ্যে নির্মিত সরকারি এই ভবনে বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধাদের কার্যক্রমের চেয়ে একটি বেসরকারি স্কুল ও একটি বেসরকারি সংস্থার কার্যক্রমই বেশি দৃশ্যমান। অভিযোগ রয়েছে, ভাড়ার চুক্তিতে সীমিত অংশ ব্যবহারের অনুমতি থাকলেও বাস্তবে নিচতলা থেকে তৃতীয় তলা পর্যন্ত ভবনের বড় অংশই স্কুল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। একই সঙ্গে দ্বিতীয় তলার চারটি কক্ষ দীর্ঘ প্রায় তিন বছর ধরে ব্যবহার করছে “ইচ্ছে” নামে একটি বেসরকারি সংস্থা। ফলে সরকারি সম্পদের ব্যবহার, ভাড়ার শর্ত, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক তদারকি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনের মূল সাইনবোর্ডের নিচেই বড় আকারে “স্কুল অব নিউক্লিয়াস”-এর সাইনবোর্ড টানানো রয়েছে। ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতেই একাধিক শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চলতে দেখা যায়। বিভিন্ন কক্ষে বেঞ্চ, হোয়াইট বোর্ড, ডাস্টার, মার্কারসহ শিক্ষা কার্যক্রমের সব উপকরণ রয়েছে। করিডোর ও সিঁড়িজুড়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। দ্বিতীয় তলায় অভিভাবকদের অপেক্ষার স্থান এবং তৃতীয় তলাতেও শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ব্যবহারের স্পষ্ট আলামত দেখা যায়।
অন্যদিকে, দ্বিতীয় তলার চারটি কক্ষ দীর্ঘ প্রায় তিন বছর ধরে ব্যবহার করছে “ইচ্ছে” নামে একটি বেসরকারি সংস্থা। সংস্থাটির সম্পাদক ২০২২ সালের একটি চুক্তিপত্র দেখালেও সেখানে চুক্তির মেয়াদ উল্লেখ নেই। নতুন বা নবায়নকৃত কোনো চুক্তিপত্রও তিনি দেখাতে পারেননি। ফলে বর্তমানে কোন বৈধতার ভিত্তিতে সংস্থাটি সরকারি ভবন ব্যবহার করছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ প্রতিবেদকের হাতে আসা “স্কুল অব নিউক্লিয়াস”-এর ভাড়ার চুক্তিপত্রে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানের পরিচালক আবু হুরায়রার সঙ্গে ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই চুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৮ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত তিন বছরের জন্য ভবনের প্রথম তলা এবং দ্বিতীয় তলার পশ্চিম পাশের মাত্র দুটি কক্ষ মাসিক ১২ হাজার টাকা ভাড়ায় ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে নিচতলা থেকে তৃতীয় তলা পর্যন্ত বিভিন্ন কক্ষে স্কুলের কার্যক্রম পরিচালিত হতে দেখা গেছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, চুক্তির বাইরে অতিরিক্ত অংশ ব্যবহারের অনুমতি কে দিয়েছে এবং এ বিষয়ে কোনো সংশোধিত চুক্তি বা লিখিত অনুমোদন রয়েছে কি না।
চুক্তিপত্র পর্যালোচনায় আরও কয়েকটি অসংগতি ধরা পড়েছে। প্রথম পাতায় প্রথম পক্ষের পরিচয় এবং শেষ পাতায় প্রথম পক্ষের পরিচয়ের মধ্যে মিল নেই। কোথাও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সভাপতি ও সদস্য-সচিবের নাম উল্লেখ রয়েছে, আবার কোথাও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রথম পক্ষ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এছাড়া দ্বিতীয় পক্ষের স্বাক্ষরের নিচে উল্লেখিত তারিখ এবং চুক্তিপত্রের শেষাংশে উল্লেখিত তারিখও ভিন্ন। সরকারি একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিপত্রে এমন অসামঞ্জস্য নথিটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কার্যকর হওয়ার আগে তিন মাসের অগ্রিম ভাড়া, অর্থাৎ ৩৬ হাজার টাকা পরিশোধ করার কথা। কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ ২৮ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত যে ব্যাংক লেনদেনের কাগজপত্র দেখিয়েছেন, তাতে ছয় মাসের ভাড়া পরিশোধের তথ্য মিললেও বাধ্যতামূলক তিন মাসের অগ্রিম ভাড়া জমার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রচলিত নীতিমালায় ভাড়া প্রতিবছর নবায়নের বিধান থাকলেও এখানে একবারেই তিন বছরের জন্য চুক্তি করা হয়েছে। এ বিষয়টিও নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
স্কুল কর্তৃপক্ষের দেখানো ট্রানজেকশন স্লিপ অনুযায়ী, ভাড়ার অর্থ ৩০১৬৩০১০১৪… নম্বরের “উপজেলা এক্সিকিউটিভ অফিসার এন্ড এডমিনিস্ট্রেশন” শিরোনামের ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে। একইভাবে “ইচ্ছে” সংস্থাও ওই একই হিসাবে ভাড়ার টাকা জমা দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রে দেখা যায়।
অন্যদিকে, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স অ্যাডহক কমিটির সদস্য-সচিব পরিচয় দেওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ভাড়ার অর্থ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও অ্যাডহক কমিটির যৌথ ব্যাংক হিসাবে জমা হয়। তার এই বক্তব্যের সঙ্গে স্কুল কর্তৃপক্ষের দেখানো ব্যাংক হিসাবের তথ্যের অমিল থাকায় প্রকৃতপক্ষে ভাড়ার অর্থ কোন হিসাবে জমা হচ্ছে এবং কীভাবে তা ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে, সে বিষয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বর্তমানে দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার জানান, কয়েক দিন আগেও তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। পরে এটি তার নজরে আসে। তিনি বলেন, “ভাড়ার শর্ত অনুযায়ী ভবন ব্যবহার করা হচ্ছে কি না এবং কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” উল্লেখ্য, তিনি ২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক মাস পরও বিষয়টি তার অজানা থাকার বিষয়টি প্রশাসনিক তদারকি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।
স্কুল অব নিউক্লিয়াসের প্রতিষ্ঠাতা জীবন হোসেন বলেন, “আমরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমেই ভবনটি ভাড়া নিয়েছি এবং প্রতি মাসে ব্যাংকের মাধ্যমে ভাড়ার টাকা জমা দিচ্ছি।” তবে চুক্তিতে সীমিত অংশের অনুমতি থাকা সত্ত্বেও ভবনের বড় অংশে স্কুল পরিচালনার বিষয়ে তিনি কোনো ব্যাখ্যা দেননি। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. নাসির উদ্দিন বলেন, নিচতলা এবং দ্বিতীয় তলার কিছু অংশ ভাড়া দেওয়া হয়েছে। পুরো ভবন ভাড়া দেওয়া হয়নি। তৃতীয় তলা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংরক্ষিত থাকার কথা। সেখানে স্কুলের কার্যক্রম চলছে কি না, তা আমার জানা নেই।
কুমারখালী উপজেলায় অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সমাজসেবা কর্মকর্তা জহুরুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আমার জানা ছিল না। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানিয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখার অনুরোধ জানাব।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত নির্দেশনা অনুযায়ী, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনের মূল উদ্দেশ্য হলো বীর মুক্তিযোদ্ধাদের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা, সভা-সমাবেশ, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করা। নির্দিষ্ট অংশ ভাড়া দেওয়ার সুযোগ থাকলেও সেই ভাড়ার অর্থ ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ, ইউটিলিটি ব্যয় এবং অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় ব্যয় করার সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে।
তবে কুমারখালীর ক্ষেত্রে ভাড়া বাবদ আদায় হওয়া অর্থ বিধি অনুযায়ী ব্যয় হচ্ছে কি না, তার কোনো সুস্পষ্ট তথ্য সংশ্লিষ্ট দপ্তর দিতে পারেনি। বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার এবং অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সমাজসেবা কর্মকর্তা জহুরুল ইসলাম—দুজনই বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত অবগত নন বলে জানিয়েছেন। অন্যদিকে, যে ব্যাংক হিসাবে ভাড়ার অর্থ জমা হচ্ছে, সেটি মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের ভাড়া ব্যবস্থাপনার জন্য নির্ধারিত বা অনুমোদিত হিসাব কি না, সে বিষয়েও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ফলে ভাড়া থেকে প্রাপ্ত অর্থের ব্যবস্থাপনা, তদারকি ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের দাবি, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্মিত সরকারি ভবনে এখন মুক্তিযোদ্ধাদের কার্যক্রম প্রায় অনুপস্থিত। এর পরিবর্তে ভবনটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাদের মতে, ভাড়ার চুক্তির অসংগতি, অতিরিক্ত কক্ষ ব্যবহারের বৈধতা, কক্ষ বরাদ্দের ভিত্তি, ভাড়ার অর্থের হিসাব এবং প্রশাসনিক তদারকির বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্মিত ভবনটি যেন তার মূল উদ্দেশ্য অনুযায়ী ব্যবহৃত হয়, সে বিষয়েও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য