খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ই জুলাই ২০২৬, ৩:৪২ এএম

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ সারাদেশে চাল সরবরাহের অন্যতম প্রধান উৎস ও ‘চালের রাজধানী’ খ্যাত কুষ্টিয়ার খাজানগর, বটতৈল, কবুরহাট, আইলচারা ও পোড়াদহ এলাকার অটো রাইস মিলগুলোর অনিয়ন্ত্রিত দূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নিয়েছে জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর। সম্প্রতি কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জাকির হোসেনের সভাপতিত্বে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে রাইস মিলের দূষণরোধে করণীয় বিষয়ক এক জরুরি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় মিল মালিক, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে ১১ সদস্যের একটি শক্তিশালী উচ্চপর্যায়ের তদারকি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তদারকি কমিটি সূত্রে জানা যায়, কুষ্টিয়ার খাজানগরসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার রাইস মিলগুলো দেশের চালের চাহিদা পূরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, দীর্ঘদিন ধরে এসব মিলের ছাই, কালো ধোঁয়া, তুষের কুঁড়ো এবং ফুটন্ত গরম পানি ও কেমিক্যাল মিশ্রিত তরল বর্জ্য আশপাশের পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে। সভায় কুষ্টিয়ার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ এমদাদুল হক, পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে রাইস মিলগুলোর দূষণের কারণ এবং তা নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট কিছু কার্যকর ব্যবস্থার কথা তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে- চিমনিতে ইটিপি স্থাপন, ছাই থেকে জৈব সার তৈরি করা, নেট বা জাল ব্যবহার করে ধানের আলকুশি বা তুষের কণা নিয়ন্ত্রণ এবং গরম পানির যথাযথ নিষ্কাশন ও ব্যবস্থাপনা।
মতবিনিময় সভায় খাজানগরের অন্যতম বৃহৎ চাল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘মিয়াভাই অটো রাইস মিল’-এর স্বত্বাধিকারী মোঃ জয়নাল আবেদীন প্রধান অকপটে পরিবেশ দূষণের বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, “খাজানগরের টোটাল পরিবেশ দূষণ নিয়ে ইতিমধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচারের পর আমরা রাইস মিল মালিক সমিতি দূষণ নিয়ন্ত্রণে একসঙ্গে বসেছি এবং সবাই একমত হয়েছি। তবে আমাদের কিছু যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে খাজানগর এলাকায় হঠাৎ দূষণের মাত্রা আকস্মিক বেড়ে গেছে।” এই যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তিনি প্রশাসনের কাছে ২ মাস সময় প্রার্থনা করেন।
অন্যদিকে, ‘রশিদ এগ্রো ফুড প্রোডাক্টস’-এর স্বত্বাধিকারী আব্দুর রশিদ পরিবেশ অধিদপ্তরের নবায়ন ফি বৃদ্ধি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি দাবি করেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের নবায়ন ফি পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় মিল মালিকদের পক্ষে তা বহন করা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। তিনি পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে আরও বেশি প্রশাসনিক ও কারিগরি সহযোগিতার অনুরোধ জানান। ’শামীম এগ্রো ফুড প্রোডাক্টস’ ও ‘প্রগতি এগ্রো ফুড’-এর স্বত্বাধিকারী হাজী মোঃ জামসের আলী পরিবেশ সুরক্ষায় মডেল উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে বলেন, শহরের মধ্যে অবস্থিত ‘হাই এগ্রো’ নামক একটি পরিবেশবান্ধব প্রতিষ্ঠান তাঁরা পরিদর্শন করেছেন এবং সেটির মতো আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি তাঁরা নিজেদের মিলেও অনুকরণ করবেন।
তবে তিনি অভিযোগ করে বলেন, খাজানগর এলাকার কঠিন বর্জ্য ও সাধারণ গৃহস্থালি বর্জ্য জিকের ক্যানেলে ফেলে ক্যানেল ভরাট করা হলেও সব দোষ চাপানো হয় অটো রাইস মিল মালিকদের ওপর। কুষ্টিয়ার জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোঃ আল-ওয়াজিউর রহমানের প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে সভায় সর্বসম্মতিক্রমে একটি শক্তিশালী মনিটরিং কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রককে সভাপতি এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালককে সদস্য সচিব করে গঠিত এই কমিটিতে সদস্য হিসেবে থাকছেন-কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (খামারবাড়ি) উপ-পরিচালকের প্রতিনিধি,কুষ্টিয়া সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর প্রতিনিধি কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর প্রতিনিধি, বটতৈল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ মিজানুর রহমান, মিয়াভাই অটো রাইস মিলের স্বত্বাধিকারী মোঃ জয়নাল আবেদীন প্রধান, শামীম এগ্রো ফুড প্রোডাক্টসের স্বত্বাধিকারী হাজী মোঃ জামসের আলী, গোল্ডেন স্পেশালাইজড অটো রাইস মিলের স্বত্বাধিকারী জিহাদুজ্জামান জিকু,সামীর এগ্রোর স্বত্বাধিকারী শামীম খালেক ও চিশতিয়া অটো রাইস মিলের স্বত্বাধিকারী মোঃ আনোয়ার হোসেন।
কমিটির চার দফা প্রধান কার্যপরিধির মধ্যে রয়েছে -অভিযুক্ত ও সক্রিয় রাইস মিলগুলোর পরিবেশ ছাড়পত্র ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সরেজমিনে যাচাই করা। রাইস মিলগুলো কর্তৃক নির্গত তরল বর্জ্য এবং গরম পানি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে পড়ছে বা নিষ্কাশিত হচ্ছে, তার চূড়ান্ত স্থানটি চিহ্নিত করা। রাইস মিলগুলো কর্তৃক রাস্তাঘাটের ওপর অবৈধভাবে তুষ বা মালামাল রেখে সড়কের অপব্যবহার রোধ করা। প্রয়োজনে পরিবেশ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট যেকোনো বিশেষজ্ঞ বা ব্যক্তিকে কমিটিতে কো-অপ্ট (অন্তর্ভুক্ত) করা। কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জাকির হোসেন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ এমদাদুল হক যৌথভাবে জানান, দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় রাইস মিলের অবদান যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি পরিবেশ ধ্বংস করে কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান চলতে দেওয়া হবে না। নবগঠিত কমিটি দ্রুতই খাজানগরসহ অন্যান্য শিল্প এলাকায় মাঠে নামবে। যারা পরিবেশ আইন অমান্য করবে এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী ইটিপি বা যথাযথ ডাস্ট কন্ট্রোল সিস্টেম স্থাপন করবে না, তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ মিলগুলো সিলগালা করে দেওয়া হবে। কুষ্টিয়ার সচেতন মহল প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং দ্রুত এই তদারকি কমিটির কার্যকর দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখতে চান।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য